কোমা থেকে ফিফার মঞ্চে, জামালের নতুন স্বপ্ন!
জামাল ভূঁইয়া
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৫৪
রুপালি পর্দার চিত্রনাট্যকেও বোধ হয় হার মানায় এই জীবন। যে ছেলেটির স্কুলজীবনে বুক চিরে চলে গিয়েছিল ঘাতকের বুলেট; যে নিয়তি তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল মৃত্যুর হিমশীতল কোমার গহ্বরে– সেই ছেলেই আজ বেঁচে থাকার সমার্থক! ডেনমার্কের বিলাসী জীবন ছেড়ে ১৩ বছর আগে যেদিন তিনি ঢাকার কাদামাখা সবুজ ঘাসে পা রেখেছিলেন, অনেকেই ভ্রু কুঁচকে ছিলেন। ‘প্রবাসী’ তকমা গায়ে নিয়ে লাল-সবুজের জার্সিতে কতদূরই বা যাবেন! আজ এক যুগ পরের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে জামাল ভূঁইয়া শুধু ৯৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের রাজকীয় মুকুট মাথায় পরা দেশের ইতিহাসের সফলতম ফুটবলারই নন; তিনি বাংলাদেশ ফুটবলের এক নতুন বিপ্লবের বাতিঘর। তাঁর হাত ধরেই আজ হামজা, শমিত, ফারহানদের মতো ৯ জন প্রবাসীর রক্তে স্পন্দিত হচ্ছে এক নতুন বাংলাদেশ।
সাফের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে যিনি আজ আসিয়ানের মঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়ার স্বপ্ন দেখেন। ফিফার মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে যখন এই অপরাজেয় লড়াকু জোর গলায় বলেন, ‘একদিন বাংলাদেশও বিশ্বকাপ খেলবে’, তখন তাকে স্রেফ উন্মাদনা ভাবার ভুল করা যায় না। ফিফার মিডিয়ার সামনে মন খুলে জীবনের সেই অলিগলির গল্প শোনালেন ফুটবলের এই চিরসবুজ সেনাপতি।
সেদিন গুলিগুলো যদি আর কয়েক মিলিমিটার এদিক-ওদিক হতো, তবে যিনি বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম আপন নাম হয়ে উঠেছেন, তাকে ফিফার সঙ্গে এই কথোপকথনে হয়তো পাওয়া যেত না। ‘আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কোপেনহেগেনে। সেখানেই প্রায় ২০ বছর আগে একদিন বিকেলে আমাকে গুলি করা হয়। ব্যাকপ্যাক পিঠে আমি স্কুলের কাছেই ছিলাম। তখন একটা ছেলে দৌড়ে এসে আমাদের সেখান থেকে চলে যেতে বলে। আমি ভাবছিলাম, সে কীসের কথা বলছে। এর কয়েক মুহূর্ত পরেই গুলির শব্দ হয় এবং আমার গায়ে চারটি গুলি লাগে। আমি তিন দিন কোমায় ছিলাম এবং সুস্থ হতে হাসপাতালে আরও কয়েক মাস কাটাতে হয়েছিল। এটি আমার জন্য সত্যিই এক করুণ পরিস্থিতি ছিল। কারণ, সে সময় আমি বেশ ভালো ছন্দে ছিলাম এবং এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে চমৎকার খেলছিলাম। কোমা থেকে যখন আমার জ্ঞান ফেরে, তখন নার্সকে বলেছিলাম যে আমার কোচকে ফোন করে জানাতে হবে কালকের ম্যাচে আমি খেলতে পারব না। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমি আজ কী বার মনে করছি? আমি তাঁকে বলেছিলাম– হ্যাঁ, আজ শুক্রবার। তখন তিনি বললেন– না, আজ সোমবার এবং আমাকে একটি সংবাদপত্র দেখিয়ে বললেন আসলে কী ঘটেছে।’
ফিফা আসিয়ান কাপে আজ মালয়েশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে ফিফার কাছে শৈশবের সেই ভয়াবহ মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করেন জামাল ভূঁইয়া। ডেনমার্ক, বাংলাদেশ, ভারত ও আর্জেন্টিনার ক্লাবে খেলার পর ৩৬ বছর বয়সী এই ফুটবলার এখন লাল-সবুজের হয়ে শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার কাছাকাছি। জাতীয় দল যখনই তাঁকে ডেকেছে, যেখানেই থাকুন না কেন, জামাল ভূঁইয়া সব সময় সাড়া দিয়েছেন। ফিফাকে তিনি জানান, যতদিন তাঁর শরীর সায় দেবে, ততদিন এই দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। ‘অবশ্যই, প্রতিটি জিনিসেরই একটা শেষ আছে। তবে এই মুহূর্তে আমি এখনও অনুভব করি, আমার শরীর ভালো অবস্থায় আছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের প্রতি আমার এক বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে।’
ফিফার এই নতুন টুর্নামেন্টটি বাংলাদেশের জন্য প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর বিপক্ষে নিজেদের মেধা যাচাইয়ের একটি বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। ‘অবশ্যই এই টুর্নামেন্টে ভালো করার এবং ভালো পারফর্ম করার প্রত্যাশা আমাদের। জানি, গ্রুপে আমরা সর্বনিম্ন র্যাঙ্কিংয়ের দল; যেখানে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং তারপর আমরা রয়েছি। তবে আমাদের নিজেদের এবং দেশের কিছু প্রত্যাশা রয়েছে। আমরা ৩ বা ৪ পয়েন্ট অর্জনের লক্ষ্য রাখছি। আর ফুটবলে শেষ পর্যন্ত কী ঘটে, তা তো আগে থেকে বলা যায় না, তাই না? এরপর অবশ্যই আমাদের সবার স্বপ্ন আছে এবং আমরা সবাই চাই আমাদের দেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করুক। কারণ, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। এই পর্যায়ে পৌঁছাতে আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে– একটি ভালো লিগ প্রয়োজন এবং হয়তো আরও বেশি খেলোয়াড়কে বিদেশের লিগে খেলতে হবে। তবে স্বপ্নটা সবসময়ই আছে।’ মনের লুকায়িত স্বপ্নটি আর চাপা রাখেননি জামাল।
- বিষয় :
- ফিফা
- জামাল ভূঁইয়া
- ফুটবল
- বাংলাদেশ