ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উদ্যোক্তা

তিস্তার চরে রঙিন সুতার চাকা

তিস্তার চরে রঙিন সুতার চাকা
×

কুড়িগ্রামের উলিপুরে তিস্তাপারের একটি কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকরা সমকাল

 মোন্নাফ আলী, উলিপুর (কুড়িগ্রাম) 

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৮ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

তিস্তার পারে একসময় যাদের জীবন কাটত নদীভাঙনের আতঙ্ক আর তীব্র অভাবে, তাদের হাতে ঘুরছে রঙিন সুতার চাকা। অন্যের বাড়িতে ‘আধ সের চালের’ বিনিময়ে দিনমজুরি খাটা নারীরা এখন নিজেদের ভাগ্য বদলাচ্ছেন। কুড়িগ্রামের উলিপুরের চরাঞ্চলে গড়ে ওঠা একটি ক্ষুদ্র দড়ির কারখানায় কাজ করে এখন তারা প্রতি মাসে পাচ্ছেন ছয় হাজার টাকা। 
সহায়-সম্বলহীন এই নারীদের লড়াই চরাঞ্চলের পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতেই তৈরি করেছে ইতিবাচক বদলের হাওয়া। 

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের গল্পটি আগে ছিল কেবলই ভিটামাটি হারানো আর অভাবের। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়া গ্রামীণ নারীরা জীবন ধারণের জন্য চরম বৈষম্যের শিকার হতেন। স্থানীয় শ্রমিক লাকী বেগম, ওসনা বেগম ও জোসনা বেগম জানান, কাজের খোঁজে আগে তাদের অন্যের দুয়ারে ধরনা দিতে হতো। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর মিলত নামমাত্র মজুরি বা আধা সের চাল। 
সেই অনিশ্চয়তা কাটতে শুরু করেছে উলিপুরের চরে গড়ে ওঠা ‘নজির হোসেন রঙিন দড়ি কারখানা’র হাত ধরে। ভিটামাটি হারা ১২ নারী শ্রমিক এখন এই কারখানায় কাজ করছেন। লাকী বেগম বলেন, ‘নদীভাঙা এলাকায় কোনো কাম নাই। আগে মানষের বাড়িত কাম করে খায়া-দাওয়া ও আধ সের চাল দিত। বাড়ির খায়া কারখানায় কাজ করি ছয় হাজার টাকা পাই। তা দিয়ে সংসার চালাই, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাই।’ কারখানাটি বড় হলে তাদের আয় আরও বাড়বে বলে আশা তাঁর। 

দুই ভাইয়ের পথচলা 
এই দড়ি কারখানার নেপথ্যে রয়েছেন চর রাজবল্লভ গ্রামের দুই ভাই নজির হোসেন ও নূর আলম। তিস্তার ভাঙনে পৈতৃক ভিটামাটি হারিয়ে ২০০১ সালে দুই ভাই পাড়ি জমিয়েছিলেন মুন্সীগঞ্জে। সেখানে দড়ির কারখানায় ২০ বছর কাজ করেন। অন্যের অধীনে না খেটে নিজ গ্রামে কর্মসংস্থান তৈরির স্বপ্ন নিয়ে ২০২৩ সালে তারা বাড়ি ফেরেন। জমাজমি ও গরু বিক্রি এবং এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আড়াই লাখ টাকায় শুরু করেন রঙিন দড়ি তৈরির কারখানা। গ্রামের আগ্রহী নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কারখানায় নিয়োগ দেন। 
বর্তমানে তাদের ১৫টি মেশিনে মাসে ৪৫ মণ এবং বছরে ৫৪০ মণ দড়ি উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি কেজি দড়ি ২৫০ টাকা হিসাবে বছরে ৫০ লাখ টাকার দড়ি তৈরি হয়। সুতা দিয়ে তৈরি রঙিন দড়িগুলো কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাটের বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। 

অর্থায়ন সংকটে থমকে যাওয়ার ঝুঁকি 
চরাঞ্চলে নতুন আশার আলো জ্বালালেও পুঁজির সংকটে ভুগছেন এই উদ্যোক্তারা। বাজারে সুতা দিয়ে তৈরি রঙিন দড়ির চাহিদা থাকলেও টাকার অভাবে নতুন মেশিন কিনতে পারছেন না তারা। নজির হোসেন জানান, বিসিক বা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ দিচ্ছে না। কেবল কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ মিলেছে, যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। আরও ২০ থেকে ৩০টি মেশিন বসাতে পারলে ৫০ জনেরও বেশি নারীর কর্মসংস্থান করা সম্ভব হতো। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও কারখানার সংযোগ সড়কটি কাঁচা হওয়ায় পণ্য পরিবহনে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। 

চর ঘিরে অর্থনীতির নতুন আশা 
তিস্তা মহাপরিকল্পনা ঘিরে এই অঞ্চলে নানা অবকাঠামো গড়ে ওঠার পাশাপাশি এই ক্ষুদ্র কারখানাগুলো চরাঞ্চলের অর্থনীতিকে আশা দেখাচ্ছে। উন্নয়নকর্মীদের মতে, চরাঞ্চলের সহজলভ্য শ্রমশক্তি কাজে লাগিয়ে এমন শিল্পগুলো নদীভাঙা মানুষদের নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছে। 
কুড়িগ্রাম বিসিকের উপব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ জোনায়েদ জানান, কারখানাটি সরেজমিন পরিদর্শন করে আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম আরিফ পরিদর্শনপূর্বক সংযোগ সড়ক মেরামত ও কারখানাটিকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। 

আরও পড়ুন

×