মানবতা
২২ বছর বিনামূল্যে চক্ষুসেবা
আলাউদ্দিন নগর তহিরন হাসপাতালে বিনামূল্যে চোখের চিকিৎসা নিতে রোগীর ভিড়। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে সম্প্রতি তোলা - সমকাল
মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী (কুষ্টিয়া)
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘গত বছর এক চোখের ছানি অপারেশন করছিলাম। এখানে টাকা-পয়সা লাগে না। সেবার মানও ভালো। আরেক চোখে ঝাপসা দেখছি। তাই আবার আসছি।’ কথাগুলো বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব আজাহার আলী। চোখের চিকিৎসা করাতে তিনি এসেছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার আলাউদ্দিন নগরের তহিরন নেছা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এখানে আজাহার আলীর মতো অনেকেই বিনামূল্যে চিকিৎসা করিয়েছেন। প্রায় ২২ বছর ধরে প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে চক্ষুসেবা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
গত রোববার হাসপাতালের সামনে দেখা যায়, কেউ লাঠি হাতে, কেউ আবার সন্তানের কাঁধে ভর দিয়ে এসেছেন। চোখে ঝাপসা দেখা, ব্যথা, ছানি কিংবা দীর্ঘদিনের নানা সমস্যায় চিকিৎসা নিতে হাসপাতাল চত্বরে ভিড় মানুষের। তাদের কেউ এসেছেন মাইকের প্রচার শুনে। আবার কেউ এসেছেন সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে খবর দেখে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০০৪ সাল থেকে চক্ষুসেবা দেওয়া হচ্ছে। এখানে প্রতিবছরের মতো এবারও দুই দিনব্যাপী বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও ছানি অপারেশন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এতে সহযোগিতা করছে আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন, দ্য ফ্রেড হলোজ ফাউন্ডেশন ও খুলনা বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। দুই দিনে প্রায় চার হাজার মানুষ সেবা নিয়েছেন। তার মধ্যে অন্তত দুই হাজার রোগীর ছানি অপারেশন করা হবে। এখানে ধনী-গরিব সব শ্রেণির মানুষই চিকিৎসা নিতে আসেন।
ফেসবুকে বিনামূল্যে চিকিৎসার খবর দেখে কুষ্টিয়ার জগতি থেকে এসেছেন গৃহিণী জেসমিন বেগম। তিনি বলেন, ‘ছানি কাটতে এক ক্লিনিক ৬০ হাজার টাকা চায়ছে। সবাই বলল আলাউদ্দিন নগরের বিনামূল্যের চিকিৎসা ভালো। সেজন্য আসছি। এখানে অনেক ভিড় দেখে মনে হচ্ছে চিকিৎসা ভালোই হয়।’
কুমারখালীর চাঁদপুর ইউনিয়নের মোহননগর পশ্চিমপাড়ার কৃষক ওহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মাইকে শুনে সকাল ৬টার দিকে এসেছি। ডাক্তার দেখানো, পরীক্ষা-নিরীক্ষা সব ফ্রি। একটা চশমাও দিয়েছে ফ্রি। যত্ন করে গাড়িতে খুলনা নিয়ে যায়, চিকিৎসা শেষে আবার কুমারখালী রেখে যায়।’ কুষ্টিয়ার উদিবাড়ি থেকে আসা মঞ্জুয়ারা খাতুন বলেন, ‘চোখে ছানি পড়েছে। বাইরের ডাক্তার ২৫-৩০ হাজার টাকা চায়ছে। কিন্তু এখানে সম্পূর্ণ ফ্রি।’
তহিরন নেছা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম জানান, অর্থের অভাবে যেন কোনো সুবিধাবঞ্চিত মানুষের চোখের আলো নিভে না যায়, সেজন্য আলাউদ্দিন আহমেদ বিনামূল্যে এমন ক্যাম্পেইন চালিয়ে আসছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে বিনামূল্যে চক্ষুসেবা দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ২২ হাজার ছানি অপারেশনের রোগী রয়েছেন। এ বছর প্রায় চার হাজার রোগীকে সেবাদানের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তার মধ্যে দুই হাজার রোগীর ছানি অপারেশন করা হবে।
চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগীদের নিবন্ধন, লাইনে শৃঙ্খলা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তায় কাজ করছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। এমন মানবিক কর্মসূচিতে যুক্ত থাকতে পেরে আনন্দিত রুমা খাতুন। খুলনা বিএনএসবি হাসপাতালের সহকারী সার্জন ডা. মো. বাপ্পী বলেন, প্রতিবছরের মতো বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও ছানি অপারেশনের ক্যাম্পেইন চলছে। এখানে বয়স্ক রোগীর সংখ্যাই বেশি।
আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক মোর্শেদ আলম জানান, ‘বাছাই করা রোগীদের খুলনা বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে অপারেশন করা হয়। থাকা, খাওয়া, যাতায়াত, চিকিৎসা সবই বিনামূল্যে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এমন আয়োজন করা হবে।’
আলাউদ্দিন আহমেদ কলেজের শিক্ষক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘দানবীর আলাউদ্দিন আহমেদ মানুষের কল্যাণে মহৎ কাজ করে চলেছেন। এ রকম আরও কয়েকজন এগিয়ে এলে কেউ আর চোখের জ্যোতি হারাবে না।’