ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নীতিমালা, নিয়ন্ত্রণ কিছুই নেই

রিসোর্ট ব্যবসার চাপে সুন্দরবন

বর্তমানে রিসোর্ট রয়েছে ২১টি, নির্মিত হচ্ছে আরও ১০টি

রিসোর্ট ব্যবসার চাপে সুন্দরবন
×

সুন্দরবনে ডলফিনের অভয়ারণ্য ঢাংমারী খালের পাড়ে তৈরি হয়েছে সারি সারি রিসোর্ট। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে সিঁড়ি নামানো হয়েছে খালের পানিতে। সম্প্রতি তোলা -সমকাল

 হাসান হিমালয়, খুলনা

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় একের পর এক হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ এবং অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের করুণ পরিণতির বড় উদাহরণ দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। সৈকতে অবাধ যাতায়াত, উচ্চ শব্দে গান-বাজনা, বারবিকিউ পার্টি আর অনিয়ন্ত্রিত পর্যটকের কারণে দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ ঝুঁকির মুখে পড়ে। ধ্বংসের কিনারায় পৌঁছে টনক নড়ে সরকারের। দ্বীপ এখন নিয়ন্ত্রিত; বছরের ১০ মাসই সেন্টমার্টিনে পর্যটক নিষিদ্ধ।

সেই রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা এখন ব্যবসা খুলেছেন বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের পাশে। প্রথম দিকে শুধু খুলনার দাকোপের ঢাংমারীতে কিছু রিসোর্ট তৈরি হয়। ধীরে ধীরে তা মোংলার চিলা, বৈদ্যমারী, চাঁদপাই, সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে। সাত-আট বছর ধরে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠছে ২১টি রিসোর্ট ও কটেজ। জমি কিনে ও ইজারা নিয়ে নির্মাণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে আরও ১০টি।

সেন্টমার্টিনের মতোই ১৯৯৯ সালে সুন্দরবনের সীমানা থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ওই এলাকায় শিল্প ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণ আইনত নিষিদ্ধ। পরিবেশের ক্ষতি হবে না– এমন স্থাপনা নির্মাণের জন্যও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে রিসোর্ট মালিকদের কেউই সেই অনুমতি নেননি।

হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন অনুযায়ী রিসোর্ট চালু করতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকেও নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু একটি রিসোর্টেরও সেই নিবন্ধন নেই। স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’ করে রিসোর্টগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছে। দেশের জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর, অভিনেতা, শিক্ষক-গবেষক ও সাংবাদিকরা রিসোর্টগুলোর প্রচারণায় নিয়মিত অংশ নেন। এ কারণেও প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করে।

সম্প্রতি পর্যটক হিসেবে রিসোর্টে দুদিন অবস্থান ও আশপাশ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সুন্দরবনের ঠিক উল্টো পাশেই পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও ব্যক্তিমালিকানা জমিতে রিসোর্টগুলো তৈরি হচ্ছে। কোনো নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা না থাকায় যে যেভাবে পারছে গাছ কেটে, জলাভূমি ভরাট করে স্থাপনা তৈরি করছে। ‘ইকো’ বলা হলেও বেশির ভাগ স্থাপনার ভেতরে কংক্রিট, ওপরে বাঁশ-কাঠ ও গোলপাতা। চিলা, চাঁদপাই ও মুন্সীগঞ্জে কংক্রিটের স্থাপনা হচ্ছে বেশি। পর্যটকের আচরণে নীতিমালা না থাকায় রাতে সেখানে চলে গানের আসর ও বারবিকিউ পার্টি। বেড়াতে আসা পর্যটককে অবৈধভাবে বন ও বনের খালে ঘুরতে নিয়ে যান রিসোর্টের কর্মীরা। এমনকি জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বনে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও রিসোর্টগুলো খোলা থাকে এবং নিষিদ্ধ সময়েও পর্যটকরা বনে প্রবেশ করেন।

দেখা গেছে, ডলফিন অভয়ারণ্য ঘোষিত সুন্দরবনের ঢাংমারী খাল ঘিরে প্রায় ১০টি রিসোর্ট তৈরি হয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় মিঠাপানির গাঙ্গেয় ডলফিন (শুশুক) এবং ইরাবতী ডলফিনের এই বিচরণস্থল দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য ট্রলার ও নৌযান পর্যটককে আনা-নেওয়া করছে। ঢাংমারী খাল ও বনের ভেতরে ঘোরার সময়ও পর্যটককে হৈ-হুল্লোড় করতে দেখা যায়। প্রতিটি রিসোর্টে এসি ও জেনারেটর চলছে। পর্যটকের ব্যবহৃত পানি ফেলা হচ্ছে বনের খালে।

সুন্দরবনের ঘাগরামারী খালের পাশে নিকুঞ্জ ভ্যালি রিসোর্ট। বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া খালে প্রবেশ নিষেধ, তবে কেউ তা মানে না। সম্প্রতি তোলা	-সমকাল

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, সেন্টমার্টিনের চেয়েও অনেক বেশি স্পর্শকাতর ও জটিল বাস্তুসংস্থানের (ইকোসিস্টেম) অধিকারী সুন্দরবন। বনঘেঁষে একের পর এক রিসোর্ট এবং পর্যটকের অতিমাত্রায় আনাগোনা, তাদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে বনের বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ওই এলাকা ছেড়ে বন্যপ্রাণীরা চলে যাবে। পর্যটকের বর্জ্য খাল দিয়ে বনের ভেতরে প্রবেশ করায় প্রতিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, বনের ওপর রিসোর্টগুলোর নেতিবাচক প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। সেখানে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকরা অনুমতি ছাড়া বনে প্রবেশ করেন। অতিরিক্ত শব্দ ও আলো এবং পর্যটকের রেখে যাওয়া বর্জ্য বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর।

তিনি বলেন, রিসোর্টগুলো সুন্দরবনের সীমানার বাইরে ব্যক্তিমালিকানা জমিতে তৈরি হওয়ায় আমাদের তেমন করণীয় নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত এগুলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা।

বিনিয়োগকারীরা এখন বনমুখী
বন ঘেঁষে বাণিজ্যিক স্থাপনা প্রথম তৈরি শুরু হয় ২০০৯ সালে। ওই বছর বনজীবী ও বিদেশি দাতা সংস্থার প্রতিনিধি, গবেষক ও সরকারি কর্মকর্তাদের থাকার জন্য সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জে ‘টাইগার পয়েন্ট’ নামে রিসোর্ট তৈরি করে এনজিও সুশীলন। ২০১১ সালে নির্মাণ করা হয় ‘বর্ষা রিসোর্ট’। এগুলো বন থেকে কিছুটা দূরে তৈরি কংক্রিটের স্থাপনা।

সুন্দরবনকেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব প্রথম বাণিজ্যিক রিসোর্ট তৈরি হয় ২০১৬ সালে খুলনার দাকোপের ঢাংমারী গ্রামে। অনুমতি ছাড়াই রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল স্থানীয় বনজীবী ও বন-নির্ভরশীল মানুষের বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে তৈরি করে ‘গোল কানন’ নামে ইকো রিসোর্ট। মূলত ‘গোল কানন’ দেখেই ঢাংমারীর দিকে এগোতে থাকেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। দেশের অন্য স্থানে পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত ব্যবসায়ীরা যৌথ মালিকানায় রিসোর্ট তৈরি করছেন। তাদের অনেকেরই সেন্টমার্টিন, লামা, সাজেকে রিসোর্ট ও হাওরে পর্যটকবাহী নৌযান রয়েছে। তারা এখন সুন্দরবনে বিনিয়োগ করছেন। 

সেন্টমার্টিন দ্বীপে ‘মার্টিন ভিউ’ নামে রিসোর্ট ছিল জাকারিয়া শাওনের। পরে সেটি বন্ধ করে সুন্দরবনের ঢাংমারী খালের পাশে ‘জঙ্গলবাড়ি’ নামে রিসোর্ট তৈরি করেন তিনি। সমকালকে শাওন বলেন, নানা বিধিনিষেধের কারণে সেন্টমার্টিনের রিসোর্ট ভালো চলছে না। ওইটা ছেড়ে দিয়েছি। সে তুলনায় সুন্দরবন নিয়ে পর্যটকের আগ্রহ খারাপ না। আমরা আইন মেনে পরিবেশগত সমীক্ষা সম্পন্ন করেই রিসোর্ট করেছি। নিবন্ধনের জন্যও আবেদন করেছি। কিন্তু প্রশাসনের অনুমতি পাচ্ছি না।

সেন্টমার্টিন দ্বীপে ‘লুইপাস’ ও ‘দীপান্তর’ নামে দুটি রিসোর্ট এবং হাওরে ‘রূপকথা’ নামে হাউজবোট রয়েছে পারভেজ আহমেদসহ কয়েকজনের। ঢাংমারী খালের পাড়ে ‘বনবিবি’ নামে রিসোর্ট তৈরি করেছেন তারা। সমকালকে পারভেজ বলেন, বছরের ১০ মাস সেন্টমার্টিন বন্ধ থাকায় ওই এলাকায় ব্যবসা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেই তুলনায় সুন্দরবন সারাবছর খোলা থাকে।

২০২৪ সালে ইসলভড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুন্দরবনের পাশে ইকোকটেজ নিয়ে একটি বেজলাইন স্টাডি করে। ওই গবেষণায় যুক্ত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বনের চারপাশে ২০টি কটেজ নির্মাণ হয়। যার মধ্যে স্থানীয় ব্যক্তিদের মালিকানা রয়েছে মাত্র দুটি। সেন্টমার্টিন, বান্দরবানে রিসোর্ট রয়েছে– এমন ব্যক্তিরাই এখন সুন্দরবনে পর্যটন ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। 

নির্মাণ প্রক্রিয়ায় আরও ১০ রিসোর্ট
সুন্দরবনসংলগ্ন ঢাংমারী, বন লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ, চাঁদপাই এলাকা ঘুরে দেখার সময় নির্মাণাধীন তিনটি এবং স্থান চূড়ান্ত করে অপেক্ষায় থাকা সাতটি সাইনবোর্ড দেখা গেছে। ঘাগড়াকাঠি খালে নিকুঞ্জ ভ্যালি রিসোর্টের পাশে আরেকটি রিসোর্ট নির্মাণের সাইনবোর্ড দেখা যায়। সেখানে কারও নাম ছিল না।

নৌকার মাঝি জানান, ছয় মাস আগে গ্ৰামের কয়েকজনের কাছ থেকে জমি ইজারা নিয়ে সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের গ্ৰামের কেউ চেনে না। ওই গ্ৰামে নতুন রিসোর্টের জন্য জমি চূড়ান্ত করা দুটি সাইনবোর্ড দেখা গেছে।

নতুন রিসোর্ট নির্মাণের কার্যক্রম বেশি দেখা গেছে ঢাংমারী খালের পাশে। বেড়িবাঁধ দিয়ে ঘোরার সময় বাঁশ দিতে জমি ঘেরা দিতে দেখা যায় দুই যুবককে। সুদীপ নামের এক যুবক জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক রিসোর্ট বানানোর জন্য জমি কিনেছেন। সেই জমি ঘেরা দেওয়া হচ্ছে। বাঁধ ধরে এগিয়ে যেতে আরও একটি ঘেরা দেওয়া জমি দেখা গেছে।
বন বিভাগের ঢাংমারী ফরেস্ট অফিসের স্টেশন অফিসার বিশ্বাস জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ঢাংমারী খালের আশপাশে একাধিক নতুন রিসোর্ট হচ্ছে। বনের সীমানার বাইরে হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। 

চাঁদপাই ফরেস্ট অফিসের পাশেই নতুন কংক্রিটের একটি স্থাপনার কাজ চলতে দেখা গেছে। সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা জানান, ওই স্থানে রিসোর্ট তৈরি করছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।

নিয়ম মানেন না, কেউ বাধাও দেয় না
দেখা গেছে, রিসোর্টে বিভিন্ন স্থাপনা, ঘর, টয়লেট তৈরি হয়েছে কংক্রিট দিয়ে। এরপর সেগুলো পাইপ, গোলপাতা, কাঠসহ দেশি উপকরণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। বনলতা রিসোর্ট পরিদর্শনের সময় ঘাট নির্মাণের কাজ চলছিল। কাঠের আঘাতের প্রতিটি শব্দ বনের ভেতর তীব্রভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। দেখা গেছে, রিসোর্টগুলোতে প্রতি রাতেই পর্যটকের জন্য বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা হয়। এ সময় গান-বাজনা চলে। রাতে বনের পাড়ে বসে পর্যটকরাও সম্মিলিতভাবে গান ধরেন। 

প্রতি বিকেলেই পর্যটকদের বনে ও খালে ঘুরতে নিয়ে যান রিসোর্টের কর্মীরা। তাদের একজন জানান, বর্ষার পানির চাপ বেশি থাকায় বনের ভেতরে প্রবেশ করা যায় না। শীতকালে বেড়াতে গেলে বনের ভেতরেও ঘোরা যায়। 

গত ২ জানুয়ারি অবৈধভাবে সুন্দরবনের কেনুয়ার খালে ঘুরতে গেলে ‘গোল কানন’ রিসোর্টের পরিচালকসহ তিন পর্যটককে অপহরণ করে বনদস্যুরা। যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর ৪ জানুয়ারি তাদের তিনজনকে উদ্ধার করা হয়।

২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর খালে পর্যটকবাহী নৌকা ডুবে যায়। দুদিন পর ১০ নভেম্বর রিয়ানা আজাদ নামে বিমানবাহিনীর সাবেক এক পাইলটের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপরও অনুমতি ছাড়া নদী-খালে ঘোরা বন্ধ হয়নি। 

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের পুরোটাই সংরক্ষিত বন। এখানে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু রিসোর্টে আসা প্রায় সব পর্যটক অবৈধভাবে বনে ও খালে প্রবেশ করেন। তাদের বিরুদ্ধে নানা অনৈতিক কাজ করার অভিযোগও শোনা যায়।

পরিবেশ আইনে ইসিএ এলাকায় স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে অযাচিত গাছ কাটাও নিষেধ করা হয়েছে। দেখা গেছে, খালের পাড়ে অধিকাংশ রিসোর্ট তৈরি হয়েছে গাছ কেটে। কয়েকটি স্থানে পুকুরও ভরাট করা হয়েছে।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক পারভেজ আহম্মেদ জানান, সুন্দরবনের ইসিএ এলাকার মধ্যে অনুমোদন ছাড়া রিসোর্ট স্থাপনা ও পরিচালনা করায় ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট তাদের সতর্ক করে চিঠি দেওয়া হয়। এরপর তারা জবাব দেন। তাদের অবস্থান জানাতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

ওই এলাকায় রিসোর্ট পরিচালনার নিবন্ধন পেতে সাতটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। আবেদনগুলোর অগ্রগতি জানতে একাধিকবার জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট শাখায় গিয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি।

তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করলে জেলা প্রশাসনের তথ্য শাখা থেকে লিখিতভাবে জানানো হয়, খুলনায় নিবন্ধিত কোনো রিসোর্ট বা কটেজ নেই। সাতটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে, সেগুলো তদন্তাধীন।
সুন্দরবনের পাশে অনুমোদন ছাড়া রিসোর্ট পরিচালনার বিষয়ে করণীয় নিয়ে জানতে চাইলে লিখিত উত্তরে জেলা প্রশাসন জানায়, সুন্দরবন রক্ষার সঙ্গে পর্যটনের বিকাশকে জেলা প্রশাসন সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখে না। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রেখে এ অঞ্চলে পর্যটনের বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন। পর্যটকের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসন সুবিধা প্রয়োজন। তবে তা অবশ্যই বিদ্যমান আইন, পরিবেশগত বিধিবিধান ও ইসিএর নীতিমালা অনুসরণ করে করতে হবে।

প্রয়োজন নীতিমালা ও নজরদারি 
রিসোর্ট মালিকরা তাদের প্রচারণায় এই পর্যটন খাতকে ‘কমিউনিটি-বেজড ইকোট্যুরিজম’ হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করেন। তবে রিসোর্টগুলোতে স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা তেমন পাওয়া যায়নি। প্রতিটি রিসোর্টে গড়ে পাঁচ থেকে সাতজন স্থানীয় মানুষ কাজ করেন, যাদের বেশির ভাগই নিরাপত্তা, ধোয়ামোছা, খাবার পরিবেশন ও পর্যটককে সেবা দেওয়ার কাজ করেন। 
পর্যটকের কারণে রিসোর্টকেন্দ্রিক গ্রামগুলোতে কিছুটা অর্থনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। পর্যটকের খাদ্যসামগ্রী স্থানীয় গ্রাম থেকে সংগ্রহ ও পর্যটকের সঙ্গে কাজ করায় গ্রামের জীবনযাত্রায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। রিসোর্টকেন্দ্রিক এই উন্নয়নের চেয়ে বনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কতটা পড়ছে, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা হয়নি। সেন্টমার্টিন থেকে নেওয়া শিক্ষা সুন্দরবনে কাজে লাগানোর কোনো তৎপরতাও দৃশ্যমান নয়।

সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, সুন্দরবন ঘিরে পর্যটন ব্যবসার প্রসার করতে হবে। তবে অবশ্যই হতে হবে বন ও বন্যপ্রাণীদের বাঁচিয়ে। সেন্টমার্টিনের মতো ভুল সুন্দরবনে করা উচিত হবে না। তিনি বলেন, রিসোর্ট তৈরির আগে ও পরে বনের ওপর প্রভাব নিরূপণ করা প্রয়োজন। সেই প্রভাব দেখে নীতিমালা প্রণয়ন ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এটি হতে পারে সম্ভাবনায় উদ্যোগ। 

পর্যটন খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, নৌযানে পর্যটন ব্যবসা ছিল লাগামছাড়া। নীতিমালা তৈরি করে এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। এখন বনের ভেতর নির্দিষ্ট আয়তনের লঞ্চ ও নির্দিষ্ট সংখ্যার বাইরে পর্যটক প্রবেশ করতে পারে না। আগে থেকে অনুমতি নিয়ে বনে পর্যটকের প্রবেশ করতে হয়। বনের সব জায়গায় যাওয়া যায় না। কোন এলাকায় এক দিনে কতজন পর্যটক যেতে পারছেন, সেটিও নিয়ন্ত্রিত। রিসোর্টের ক্ষেত্রে একই ধরনের নীতিমালা করা প্রয়োজন। তাহলে যত্রতত্র রিসোর্ট কমবে এবং যেগুলো রয়েছে, সেগুলোও পরিবেশ সচেতনতা মেনে চলবে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, রিসোর্টগুলোর নেতিবাচক দিক যেমন রয়েছে, ইতিবাচক দিকও কম নয়। বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান হচ্ছে, অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে গ্রামগুলোর অর্থনীতি দিন দিন বড় হচ্ছে। 

আরও পড়ুন

×