বিশেষজ্ঞ অভিমত
সংকট দীর্ঘায়িত হলে চ্যালেঞ্জে পড়বে দেশ
রাশেদ মেহেদী
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০২ মার্চ ২০২২ | ০৯:২৭
ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক হামলার কারণে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এ যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে রাশিয়ার বিরোধ চরমে উঠলে একদিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং বাংলাদেশের মতো বিকাশমান অর্থনীতির দেশও এর বাইরে থাকবে না; অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব ও রাশিয়া উভয় দেশের কূটনৈতিক চাপ এ দেশের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। সমকালের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞরা এ মত দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ ইউক্রেন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কোনো পক্ষে অবস্থান না নিয়ে নিরপেক্ষ থাকবে। বাংলাদেশের বিশ্বাস ও প্রত্যাশা এই যে, দু'পক্ষের আলোচনার মধ্য দিয়েই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান আসবে।
তিনি বলেন, ইউক্রেন সংকটের কারণে বিশ্বে এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় অস্থিরতার সৃষ্টি হতে পারে।
সংকট অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। তবে রাশিয়ার অর্থায়নে বাস্তবায়িত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পে এর কোনো প্রভাব পড়বে না বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। অবশ্য তিনি এ-ও জানান, রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে এ যুদ্ধ কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, এখনও সে সম্পর্কে মন্তব্য করার সময় আসেনি।
কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ :সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্নেষক হুমায়ুন কবির বলেন, ইউক্রেন পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো দেশের সামনে নতুন এবং অহেতুক কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, তাদের মিত্র পশ্চিম ইউরোপের দেশ এবং রাশিয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব আবারও সত্তর দশকের মতো দুটি কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে ভাগ হতে চলেছে। এ অবস্থা শুধু বাংলাদেশের সামনে নয়, বাংলাদেশের মতো বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোর সামনেও চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে।
এ পরিস্থিতি প্রলম্বিত হলে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমারা বড় ধরনের কোনো ব্যবস্থা নিলে একটা বড় চ্যালেঞ্জ সামনে চলে আসবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো তখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে এক ধরনের চাপে ফেলতে পারে। যেহেতু বড় উন্নয়ন সহযোগী, সে কারণে তাদের চাপ বাংলাদেশের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। আবার রাশিয়ার সঙ্গেও বাংলাদেশের বড় প্রকল্প আছে, বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে। রাশিয়া যুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে পড়লে এসব মেগা প্রকল্প অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এবং রাশিয়ার প্রতি কড়া নিষেধাজ্ঞা এলে চীনও দেশটির পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে চীনের সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে ভাটা পড়তে পারে। ফলে অর্থনৈতিক কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ অনেক বড় হয়ে উঠবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটও বাংলাদেশের জন্য ক্রমাগত উদ্বেগের কারণ হয়ে যাচ্ছে। এই সংকট ঘিরেও ভূরাজনৈতিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি রয়েছে। ফলে কূটনৈতিকভাবে বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হলে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানও বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
হুমায়ুন কবির বলেন, রাশিয়া এ সময়ে একটি স্বাধীন দেশের সীমান্তে ঢুকে যেভাবে সামরিক হামলা করেছে, সেটা কখনোই মুক্ত বিশ্ব বলে পরিচিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপানও সমর্থন করবে না। ফলে তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেই। রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত বিশ্ব অপ্রয়োজনীয় কিন্তু বড় কূটনৈতিক সংকটের জন্ম দেবে।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ইউক্রেন পরিস্থিতি সম্পর্কে এরই মধ্যে বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী বাংলাদেশ কোনো পক্ষেই অবস্থান নেবে না এবং আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানকেই সমর্থন করবে। এর ফলে বাংলাদেশের সামনে খুব বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ আসবে বলে মনে হয় না। যে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে, সেটা মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী অবস্থান ধরে রাখাই যথেষ্ট।
তিনি আরও বলেন, ইউক্রেন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে ইউক্রেন সরকারের গত এক দশকের ভ্রান্ত নীতির কারণে। রাশিয়ার মতো একটি শক্তিধর দেশ তার প্রতিবেশীকে কোনোভাবেই ন্যাটো জোটে দেখতে চাইতে পারে না। কারণ, সেটা রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এই হুমকি মাথায় নিয়ে রাশিয়ার মতো দেশ চুপ থাকতে পারে না। তারপরও কোনোভাবেই কোথাও সামরিক হস্তক্ষেপ ও প্রাণহানি কাম্য নয়। প্রকৃতপক্ষে এখনকার সংকট যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে রাশিয়ার সংকট, রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের দ্বিপক্ষীয় সংকট। এ কারণে এতে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি হবে না।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ :ইউক্রেন সংকটের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ইউক্রেন সংকট সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশকে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। এখনই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। সংকট বাড়তে থাকলে জ্বালানির দাম আরও বাড়বে। ফলে এর একটা সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়বে। জ্বালানির খরচ বাড়বে, একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়বে, যাতায়াতের খরচ বাড়বে, ভর্তুকিও বাড়বে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, আবার বাংলাদেশ এখন এলএনজি আমদানি করছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এলএনজি আমদানিতেও বড় সংকট দেখা দেবে। কারণ, বিশ্ববাজারে গ্যাসের সংকট ও দাম দুটোই বেড়ে যাবে। অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া সার তৈরির ক্ষেত্রে হাইড্রোকার্বন প্রযুক্তির ভূমিকা আছে। এ কারণে যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রলম্বিত হলে একটা পর্যায়ে সারের বাজারেও সংকট তৈরি হবে। সারের দাম বাড়বে এবং সরকারকে এ ক্ষেত্রে ভর্তুকিও বেশি দিতে হবে। এমনিতেই বর্তমানে সারের ক্ষেত্রে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়। সেটা বাড়বে। এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে, চাহিদার কারণে বাংলাদেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে বিপুল পরিমাণ গম আমদানি করে। এ অবস্থায় গম আমদানির ক্ষেত্রেও একটা বড় সংকট হতে পারে।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ এবং ইউরোপের দেড় শতাংশ কমবে। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বৃহৎ ক্রেতা এসব দেশ আমদানি কমিয়ে দিলে রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আবার এসব দেশ বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী দেশ। ফলে উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এসব দেশে বাংলাদেশের যে শ্রমবাজার আছে, অর্থনৈতিক মন্দা দীর্ঘায়িত হলে সেটাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে সার্বিকভাবে ইউক্রেন সংকট বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সামনে বড় ধরনের সংকট নিয়ে আসতে পারে।