ওমানে আলোচনা স্থগিত ইরানের, হামলা চলছে হুতিদের
ছবি: রয়টার্স
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৬:১২
ইরান ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যে ওমানে যে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত করেছে তেহরান। এমন একটি সময় এ ঘটনা ঘটল, যখন ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। তবে আলোচনা স্থগিতের কারণ হিসেবে ইরান বলছে, সৌদি আরবের অনুরোধে তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
এর আগে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, তারা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে এক বৈঠকে অংশ নেবে এবং সেখানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়টি নিয়ে ওমানের সঙ্গে যে সমঝোতা হয়েছে, তা তুলে ধরবে। ইরান যুদ্ধের আগে ওই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পারাপার হতো।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসমায়েল বাঘায়ি গতকাল সোমবার সৌদি আরবের অনুরোধে বৈঠক পিছিয়ে দেওয়ার কথা জানান। এ ছাড়াও বাঘায়ি বলেন, ‘ইরান ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না।’ তিনি দাবি করেন, হুতিরা ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং নিজেদের স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়।’ এর আগে ইরান ‘নতুন নতুন ফ্রন্ট’ খোলার হুমকি দিয়েছিল, যার মধ্যে বাব এল-মান্দাবও ছিল।
হুতিদের হামলা চলছেই
ইয়েমেনের হুতিরা গতকাল সোমবার সৌদি আরবের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা হুতিরা গত সপ্তাহে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ও বাব এল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখন প্রায় বন্ধ বলা চলে। এ রকম প্রেক্ষাপটে বাব এল-মান্দেব এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বাব এল-মান্দেব এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে হুতিরা রিয়াদের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথে অবরোধ ঘোষণা করেছে।
হুতিরা সৌদি আরবের দিকে কয়েক ডজন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার তথ্যটি নিশ্চিত করেছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন বলছে, এর জেরে সৌদি আরব নিজ দেশের খামিস মুশাইত ও আবহায় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সতর্কতা জারি করে। খামিস মুশাইতের এক বাসিন্দা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, তিনি ‘তীব্র বিস্ফোরণের’ শব্দ শুনেছেন। বিস্ফোরণের পর আগুন অনেকক্ষণ ধরে জ্বলতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমরা একেবারেই ঘুমাতে পারিনি।’
ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের সমর্থন দিয়ে আসছে। তেহরান তাদের অস্ত্র ও প্রযুক্তি দিয়েও সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ের পেছনে ইরানের ভূমিকা কতটা, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
হুতিদের নতুন করে চালানো হামলার ফলে আবারও তেলের দাম বেড়ে গেছে। বর্তমানে সুয়েজ খাল হয়ে এবং আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়াই সৌদি তেল এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে পৌঁছানোর একমাত্র নিরাপদ পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাঁচ দিনে ৩০০ হামলা
ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ প্রায় চার বছর স্থবির অবস্থায় ছিল। তবে জুলাইয়ে ইরানি একটি ফ্লাইটকে কেন্দ্র করে রাজধানী সানায় উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পর যুদ্ধ আবার শুরু হয়। এর ফলে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হওয়া সর্বশেষ সংঘাতে পরিণত হয়েছে ইয়েমেন।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি গতকাল সোমবার জানান, তাদের সর্বশেষ হামলার লক্ষ্য ছিল খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটির যুদ্ধবিমান রাখার হ্যাঙ্গার, রাডার, রানওয়ে এবং গোলাবারুদের গুদাম। রিয়াদের চালানো বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। সারি অভিযোগ করেন, সৌদি আরব গত পাঁচ দিনে ইয়েমেনজুড়ে ‘৩০০টিরও বেশি বিমান হামলা’ চালিয়েছে।
গত রোববার ইয়েমেন সরকারের বাহিনী জানায়, তারা দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশে হুতি যোদ্ধাদের কাছ থেকে বেশ কয়েকটি অবস্থান পুনর্দখল করেছে এবং বিমান হামলাও চালিয়েছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবাকে তারা জানায়, এসব অভিযানে অন্তত ১০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
গত সপ্তাহে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, সৌদি আরবের কার্যত শাসক ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুদ্ধটিতে হস্তক্ষেপ করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলেন। তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
সৌদি যুবরাজের সঙ্গে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডারের বৈঠক
গতকাল সোমবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান জেদ্দায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেন। সৌদি সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানায়, বৈঠকে ‘অঞ্চলের সর্বশেষ পরিস্থিতি’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, জরুরি সমন্বয় বৈঠকে অংশ নিতে মার্কিন এই অ্যাডমিরাল সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।
এদিকে গত রোববার জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানায়, নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইয়ের কারণে আরববিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ ইয়েমেনে প্রায় ৮৬ হাজার মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। মাত্র এক দিনের মধ্যে এই সংখ্যা ১০ হাজার বেড়েছে।
ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সমাপ্তির পর দেশটির তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, এ ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারে ওয়াশিংটন। সেই সঙ্গে বর্তমান সময়ের মতো ইরানের চারপাশে নিজেদের প্রহরা জারি রাখার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। রোববার আয়ারল্যান্ডে আন্তর্জাতিক গলফ টুর্নামেন্ট উদ্বোধন করেন ট্রাম্প।
সেখানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের তেল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত না নিই, তাহলে শেষ পর্যন্ত (ইরান থেকে) বেরিয়ে আসব; কিন্তু যদি নিই তাহলে (ইরানে) আমাদের উপস্থিতি থাকবে।
- বিষয় :
- ইরান
- ওমান
- হুতি বিদ্রোহী