ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রত্নতত্ত্ব

তুরস্কে হ্রদের পানি শুকিয়ে বের হয়ে আসছে সম্পদ

তুরস্কে হ্রদের পানি শুকিয়ে  বের হয়ে আসছে সম্পদ
×

যখন পানির নিচে ছিল সেন্ট নিওফাইটসের ব্যাসিলিকা -সংগৃহীত

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

মুস্তাফা শাহিন বেশির ভাগ সময়ই পানির নিচে কাটাতেন। তুরস্কের প্রথম আন্ডারওয়াটার আর্কিওলজি বা পানির নিচের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। দেশের বিভিন্ন হ্রদে ডুব দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন খুঁজে বের করাই ছিল তাঁর কাজ। ২০১৪ সালে তিনি ইজনিক হ্রদের পানির নিচে সেন্ট নিওফাইটসের ব্যাসিলিকা খুঁজে পান। ধারণা করা হয়, সেটিই মূল নিকিয়া কাউন্সিলের সভাস্থল হতে পারে। ব্যাসিলিকা মূলত প্রাচীন রোমান স্থাপত্যরীতিতে তৈরি এক ধরনের বিশাল ভবন। 

ওই আবিষ্কারকে আর্কিওলজি ম্যাগাজিন এবং আর্কিওলজিক্যাল ইনস্টিটিউট অব আমেরিকা সেই বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছিল। তবে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদন বলছে, মুস্তাফা এখন আর পানিতে ডুব দেন না। ব্যাসিলিকাটির প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে তাঁর কাজ এখন তাঁকে হ্রদের পানির বাইরে রাখছে। কারণ, সেন্ট নিওফাইটস আর ইজনিক হ্রদের পানির নিচে নেই। সেটি এখন শুকনো মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

তুরস্ক সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক হারে শুকাতে শুরু করেছে। ইজনিক হ্রদও সেরকম। একসময় পানি থাকলেও এখন এটি শুষ্ক। তুরস্কে বর্তমানে প্রায় ৭৫ শতাংশ হ্রদ বিলীন হওয়ার পথে। জাতিসংঘের মতে, এই প্রবণতা শুধু তুরস্কের নয়। তবে তুরস্কের পরিস্থিতি বিশেষভাবে সংকটপূর্ণ। দেশটির ৮৮ শতাংশ এলাকা মরুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। 

এদিকে, হ্রদ ও জলাধারগুলোর পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও সামনে চলে আসতে শুরু করেছে। ইস্তাম্বুলের কাছে সাপানজা হ্রদে প্রাচীন নৌঘাট ও একটি ছোট চ্যাপেল থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আদিয়ামান ও লেক ভ্যানের কাছে নব্য প্রস্তর যুগের পাথরের স্থাপনার মতো নিদর্শন পানির নিচ থেকে বের হয়ে আসছে।
ফলে প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য পানির এই সংকট একই সঙ্গে ভালো ও খারাপ– দুই ধরনের পরিস্থিতি বয়ে এনেছে। আদিয়ামান জাদুঘরের প্রধান মেহমেত আলকান বলেন, কৃষিকাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে বিষয়টি দুঃখজনক। আবার নতুন আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে এটি আনন্দেরও। 

তবে নিদর্শন পেলেই হচ্ছে না, সেগুলো সংরক্ষণ করতেও বিশেষজ্ঞদের নতুন সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সেন্ট নিওফাইটসের ক্ষেত্রে শাহিন বলেন, ‘পানির নিচে খনন করার পরিবর্তে আমরা এখন মাটিতে খনন শুরু করেছি।’ তাঁর মতে, এটি খুবই খারাপ বিষয়। কারণ, পানি থেকে বেরিয়ে আসার পর খননকাজ অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক গুল ইউরুন মাভিনিল বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মাইক্রোক্লাইমেট বা স্থানীয় ক্ষুদ্র জলবায়ুর আকস্মিক পরিবর্তন। হাজার বছর ধরে অক্সিজেন থেকে বিচ্ছিন্ন পানির নিচের পরিবেশে সংরক্ষিত পাথর এবং বিশেষ করে কাঠের কাঠামো বাতাস ও সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসার পর দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে। অত্যন্ত আর্দ্র পরিবেশ থেকে শুষ্ক পরিবেশে চলে আসার ফলে ফাটল ও পচন শুরু হয়। একই সঙ্গে স্থানগুলো অরক্ষিত হয়ে যায় এবং লুটপাটের ঝুঁকিতে পড়ে।’

তুরস্কে পানির নিচের প্রত্নতত্ত্ব কোনো নতুন বিষয় নয়। অন্তত ১৯৬০-এর দশক থেকেই এটি দেশটির প্রত্নতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটির দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতির কারণে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পানির নিচে চলে গেছে।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদন বলছে, এখন যেখানে ইজনিক, সেখানে প্রাচীনকালে নিকিয়া নগরী ছিল। খ্রিষ্টধর্মের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। আর যে ব্যাসিলিকাটি পাওয়া গেছে, সেটির অবস্থান ছিল শহরের প্রাচীরের বাইরে। ওই এলাকায় গির্জার মতো ১৪টি স্থাপনা পাওয়া গেছে।
ঐতিহাসিক নথিতে দেখা যায়, নিকিয়ায় বেশ কয়েকটি ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। ১০৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে ব্যাসিলিকাটি শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যায়। ব্যাসিলিকাটি আবার পানির ওপর উঠে আসার পর প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেটি সংরক্ষণে দ্রুত কাজ শুরু করেছেন। 
 

আরও পড়ুন

×