ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক্সপ্লেইনার

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে পান্ডা কূটনীতির শুরু যেভাবে

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে পান্ডা কূটনীতির শুরু যেভাবে
×

সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পান্ডা পাঠাচ্ছে চীন। ছবি: এএফপি/কোলাজ

আনাদোলু ও সিএনএন

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:২০

যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা চিড়িয়াখানায় দুটি বড় পান্ডা পাঠাচ্ছে চীন। এরমধ্য দিয়ে সেগুলো দুই দেশের কূটনৈতিক ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হচ্ছে। পান্ডা দুটির নাম পিং পিং ও ফু শুয়াং।

সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরের সময় পান্ডা পাঠানোর ঘোষণা দেন চীনের নেতা শি জিনপিং। তিনি বলেন, ‘পান্ডা দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের দূত হিসেবে কাজ করছে।’ তিনি বাণিজ্য, ভূরাজনীতি ও প্রযুক্তিখাতের প্রতিযোগিতার মধ্যে পান্ডাকে সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।

পান্ডার মূল খাবার বাঁশ। এমন একটি লোমশ প্রাণী কীভাবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতির প্রতীকে পরিণত হলো?

যেভাবে শুরু হয়েছিল
গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৪৯ সালে। এর আগে থেকেও দেশটিতে কূটনৈতিক উপহার হিসেবে পান্ডা ব্যবহারের প্রচলন ছিল। কিছু বিবরণ অনুযায়ী, পান্ডা কূটনীতির শুরু সপ্তম শতকে। তাং রাজবংশের সময় সম্রাজ্ঞী উ জেতিয়ান জাপানে পান্ডা পাঠিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

এই প্রথা নতুন করে শুরু হয় ২০ শতকে। ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির আর্কাইভ অনুযায়ী, ১৯৪১ সালে চীন থেকে নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানায় প্যান-ডি ও প্যান-ডাহ নামে দুটি পান্ডা উপহার দেওয়া হয়। জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চীনকে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে পান্ডা দুটি দিয়েছিলেন চীনের তৎকালীন ফার্স্ট লেডি চিয়াং কাই-শেক।

পরবর্তী কয়েক দশকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও উত্তর কোরিয়াসহ বন্ধু রাষ্ট্রগুলোতে পান্ডা পাঠাতে থাকে। যা কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বেইজিংকে বিশেষ সুবিধা এনে দেয়। কারণ বড় বন্য পান্ডা কেবল চীনেই পাওয়া যায়। ফলে চীনের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছার একটি বিশেষ নিদর্শন হয়ে ওঠে প্রাণীটি।

সাধারণ মানুষের মাঝেও পান্ডা বেশ জনপ্রিয়। ফলে অন্য দেশে যখন পাঠানো হয়, তখন সেখানকার মানুষের মাঝেও চীনকে নিয়ে আগ্রহ জন্মে। তাই প্রাণীটি শুধু সরকারি উপহার নয়, এটি চীনের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের একটি মাধ্যম।

১৯৭২ সালের যুগান্তকারী ঘটনা
চীন-যুক্তরাষ্ট্র পান্ডা কূটনীতির আলোচিত ঘটনাটি ১৯৭২ সালের। তখন বেইজিং সফর করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। এরমধ্য দিয়ে দুই দশকের বেশি সময়ের দূরত্ব কমতে শুরু করে।

সফরের সময় মার্কিন ফার্স্ট লেডি প্যাট বেইজিংয়ের একটি চিড়িয়াখানা পরিদর্শনে যান। সেখানে একটি পান্ডা তাঁর পছন্দ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই আমেরিকান জনগণকে দুটি পান্ডা দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

নিক্সনের ওই সফরের পর ওয়াশিংটনের স্মিথসোনিয়ান জাতীয় চিড়িয়াখানায় ‘লিং-লিং’ ও ‘শিং-শিং’ নামে দুটি পান্ডা পাঠায় চীন। যা দর্শনার্থীদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলে। প্রথমদিনেই ২০ হাজারের বেশি মানুষ পান্ডা দেখতে যায়। কয়েকদিন পর সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শুধু পান্ডা দেখতে চিড়িয়াখানাটিতে ভিড় করেছিলেন প্রায় ৭৫ হাজার দর্শনার্থী।

চীনা পান্ডা যখন মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে, তখন ওয়াশিংটনও পাল্টা উদ্যোগ নেয়। তারা বেইজিংয়ে দুটি মাস্ক অক্স (ষাঁড়ের মতো দেখতে আর্কটিক অঞ্চলের প্রাণী) পাঠায়। এগুলোর নাম ছিল মিল্টন ও মাতিল্ডা। কিন্তু চীনের মানুষের মধ্যে খুব একটা সাড়া ফেলতে পারেনি। 

উপহার থেকে ঋণ
১৯৮০-এর দশকে চীন পান্ডা উপহার দেওয়ার প্রথা থেকে সরে আসে। এর পরিবর্তে দেশটি পান্ডা ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করে। অর্থাৎ, যে দেশকে পান্ডা দেওয়া হবে তারা সেটি কেবল নিজেদের চিড়িয়াখানায় সংরক্ষণ ও গবেষণা করতে পারবে।

সাধারণত এ ধরনের চুক্তির মেয়াদ হয় ১০ বছর। প্রতি জোড়া পান্ডার জন্য বছরে ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত অর্থও দিতে হতে পারে। অন্য দেশে অবস্থানের সময় কোনো পান্ডা বাচ্চা জন্ম দিলে সেটি চীনের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।

ঋণ দেওয়ার এই ব্যবস্থা পান্ডা কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করেছে। চীন এখন পান্ডার প্রজনন, গবেষণা ও আবাসস্থল সংরক্ষণে অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দেয়। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের চিড়িয়াখানাগুলো পান্ডার ১৭টি বাচ্চাকে লালন-পালন করেছে। এর মধ্যে সান দিয়েগোতে ছয়, ওয়াশিংটনে চার ও আটলান্টায় ছিল সাতটি।

পান্ডা ফিরিয়ে নেওয়ার অর্থ কী?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের অবনতি হলে পান্ডা ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনাটি সম্পর্কের উত্তেজনার দৃশ্যমান প্রতীক।

২০২৩ সালের নভেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ওয়াশিংটন চিড়িয়াখানা থেকে তিনটি পান্ডা ফেরত পাঠানো হয়। ওই মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন শি জিনপিং। তখন তিনি শুভেচ্ছার বার্তা হিসেবে বলেছিলেন, পান্ডা সংরক্ষণে সহযোগিতা করতে বেইজিং প্রস্তুত।

এরপর ২০২৪ সালের জুনে সান দিয়েগোতে নতুন এক জোড়া পান্ডা পাঠানো হয়। কিন্তু একই বছরের অক্টোবরে চারটি পান্ডা ফেরত পাঠায় আটলান্টার চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। এক সময় দেশটিতে ১৫টি চীনা পান্ডা ছিল। বর্তমানে এর সংখ্যা মাত্র চারটি। 

আটলান্টায় নতুন অধ্যায়
আটলান্টা চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চীনের প্রথম পান্ডা অংশীদারত্ব শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। যা ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। পিং পিং ও ফু শুয়াংয়ের মাধ্যমে আরেকটি অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।

চীনের ন্যাশনাল ফরেস্ট্রি অ্যান্ড গ্রাসল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, পিং পিংয়ের জন্ম ২০২০ সালের ১৭ মার্চ। এর চোখের চারপাশে বড় কালো দাগ আছে। সে গাছে চড়তে পারদর্শী। ফু শুয়াংয়ের জন্ম ২০২০ সালের ১৮ অক্টোবর। এর কপাল কিছুটা উঁচু এবং খুব সহজেই খাবার খুঁজে নিতে পারে।

ফু জিয়া নামে এক পান্ডা পরিচর্যাকারী চীনা গণমাধ্যমকে বলেছেন, পিং পিং সাহসী ও শান্ত স্বভাবের। অন্যদিকে, ফু শুয়াং মধু খুব পছন্দ করে।

এমন বৈশিষ্ট্যের পান্ডা দুটি শুল্ক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের বিরোধ হয়তো মেটাবে না। কিন্তু কিছুটা হলেও বন্ধুত্বের নিদর্শন তুলে ধরবে।

আরও পড়ুন

×