নিঃসঙ্গ মেধাবী
আবুল কাসেম ফজলুল হক [৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৪৪–৫ জুলাই ২০২৬]
রেজাউদ্দিন স্টালিন
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। তখন স্যার ‘লোকায়ত’ নামে কাগজটি করতেন। আমার কাছে তিনি একগুচ্ছ কবিতা চেয়েছিলেন। প্রথম দেখায়ই তিনি আমাকে নিজের ছাত্রের মতো ভালোবাসলেন এবং তিনি বললেন তোমার কবিতার যে স্ট্রেন্থ এবং যে দ্রোহ আছে– তোমার কবিতা আমি পড়েছি, তোমার কবিতা আমাকে দাও। আমি খুব আনন্দিত হলাম। পরে আমি ‘লোকায়ত’ পত্রিকার জন্য কয়েকটি কবিতা দেই এবং তা মাস দুয়েকের মধ্যে ছাপা হয়। এর পর থেকে স্যারের সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক এবং স্যারের বুদ্ধিবৃত্তিক লেখাগুলো এবং দেশ পরিচালনার জন্য যে দিকনির্দেশনা তিনি দিয়েছেন, সেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি বিবেচনা করি।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেটা– সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল ধারাটা কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে তাঁর যে প্রাজ্ঞচিন্তা, সেটি আমাকে সব সময় প্রাণিত করেছে। আমরা যে প্রগতির চিন্তা করি একটা সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য, একটা গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য, জনগণের যে লড়াই, কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের যে লড়াই, সে লড়াইয়ের সঙ্গে তাঁর চিন্তার যে ঐক্য, সেটি আমাকে সব সময় উদ্বুদ্ধ করে, আমার কাজকর্মে। আমার প্রতিটি জন্মদিনে তিনি প্রধান অতিথি থাকেন। শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করেও তিনি না এলে আমার খারাপ লাগে। তিনি টু দ্য পয়েন্ট আমার কবিতা আলোচনা করেন। লিখিত আলোচনা করেন। সেটা খুব গুরুত্ব দিয়ে কাগজে এবং বইয়ে ছাপা হয়েছে।
আবুল কাসেম ফজলুল হক বিগত সতেরো বছরে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির যে ব্যাপক প্রভাব তৈরি হয়েছে, মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে যে যুদ্ধ তৈরি হয়েছে, সেই যুদ্ধে তিনি আমাদের পক্ষের এই দেশের সংস্কৃতির পক্ষের এক লড়াকু মানুষ। সত্য উচ্চারণের কারণে তিনি অনেকের বিরাগভাজন, তা আমি জানি। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে আমি লক্ষ্য করেছি সব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্যারকে অসম্ভব ভালোবাসেন। তিনি কখনও সত্য উচ্চারণে পিছপা হননি। আমি হতে কখনও দেখিনি। নব্বইয়ের যে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আমরা করলাম, জাতীয় কবিতা পরিষদ আমরা গঠন করেছিলাম, এখানেও তাঁর সমর্থন ছিল।
পরবর্তীকালে আমরা লক্ষ্য করি যে সমস্ত ছাত্র-গণমানুষের সংস্কৃতি লালন– নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করেও তাদের তিনি উদ্বুদ্ধ করেন এবং এগিয়ে যেতে প্রেরণা দেন। তাঁর সন্তান দীপনের মৃত্যুর পর তিনি যে কী পরিমাণ কষ্ট পেয়েছিলেন, কষ্টে যে তাঁর বুক ভার হয়ে থাকত। তখন তাঁর সাথে কথা বলতে খারাপ লাগত কিন্তু আমি কোনোদিন স্যারকে ব্যথিত চিত্তে তা উচ্চারণ করতে দেখিনি। তিনি তাঁর সন্তান-পরিবারের চাইতেও দেশকে আগে প্রাধান্য দিতেন। দেশের কথা উঠলেই তিনি বলতেন, যে দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই, সেখানে চিন্তামুক্তির আন্দোলন দরকার। যে আন্দোলন রেনেসাঁর ভেতর দিয়ে শুরু হয়ে ভাষা আন্দালনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল এই বাংলায়, সেটি স্তিমিত হয়ে আসছে। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা যখন সামান্য লোভের কাছে বশীভূত হন তখনও আমি দেখেছি স্যারকে কোনো কিছু দিয়ে কোনো কিছুর বিনিময়ে তাঁর চিন্তা থেকে সরে যাননি।
তিনি তাঁর পায়ের নিচে যে দার্শনিক পাটাতন তৈরি করেছেন তা থেকে তাঁকে কেউ সরাতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আছেন, তিনি তাদের অগ্রগণ্য হিসেবে আমাদের কাছে বিবেচিত। তিনি প্রকৃতপক্ষে আমাদের অভিভাবক। আজকে আমাদের সংস্কৃতি অভিভাবকশূন্য। স্যার যে আমাদের মধ্যে আছেন, সেটা সত্যি আমাদের সৌভাগ্য। আমি লক্ষ্য করি নির্বাচনে কী রকম ইশতেহার হওয়া উচিত, নির্বাচনের আগে মানুষের কী দাবি থাকা উচিত, কীভাবে আমাদের আমলাতন্ত্রের সংস্কার হবে, কীভাবে আমাদের দেশ প্রতিরক্ষার ব্যাপারে কাজ করবে, কীভাবে আমাদের পার্লামেন্ট সক্রিয় থাকবে, রাজনৈতিক দলগুলো একটা মতৈক্যে পৌঁছে কীভাবে আন্দোলনের ভেতর দিয়ে দেশকে গণতন্ত্রের জন্য মুক্ত করবে সে কথা তিনি বলেছেন এবং লেখনীর মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন।
দীপনের নামে যে পাঠাগারটি তৈরি হয়েছিল কাঁটাবনের নিউ এলিফ্যান্ট রোডে, সেখানে আমি যেতাম, স্যার সেখানে আসতেন, কথা হতো। স্যার নিজের চিন্তার কথা ভাবনার কথা অকপটে বলতে পারতেন। কিছুটা সক্রেটিসীয় পদ্ধতিতে তিনি সত্য আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। তিনি জানতেন জীবনের কঠিন সময়গুলো পার করতে গেলে সত্য মেনে নিতে হয়। তিনি মেনে নিয়েছেন। তাঁকে কোনোদিন অভিযোগ করতে শুনিনি কারও বিরুদ্ধে। তিনি অভিযোগ করতেন না, সত্যটা বলতেন। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। আজকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে একটি পত্রিকা চালানো আমাদের দেশে খুব দুরূহ। যেখানে সাহিত্যের কোনো পৃষ্ঠপোষকতাই নেই। নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে একটা পত্রিকা চালানো এটা সাহিত্য আন্দোলনের বড় উদাহরণ। আমি লক্ষ্য করি স্যারের একাধিক গ্রন্থ আছে– বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে, আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে। আমরা যে ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা নির্যাতিত এবং আমাদের যে ত্রিশের ইউরোপীয় ভাবনা, সেই ভাবনা থেকে বাংলা কবিতাকে মুক্ত করার এ দেশীয় ঐতিহ্য উত্তরাধিকারকে সম্পৃক্ত করে, এ দেশের পুরাণকে ব্যবহার করে কবিতাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন, সেটা তিনি সব সময় বিশ্বাস করতেন। তিনি কখনও ক্ষয়িষ্ণু চিন্তা করেন না। যাকে আমরা বিচ্ছিন্নতাবাদী বলি ওই অর্থে নাস্তিক্যবাদ, যেটা দর্শনের সঙ্গে যুক্ত না। ভোল পাল্টানো বুদ্ধিজীবীদের নানারকম ক্রিয়াকলাপ এসব থেকে তিনি মুক্ত। বাংলা কবিতায় যারা বড় কবি, তাদের তিনি সমালোচনা করতে ছাড়েননি। জীবনানন্দ দাশকে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী কবি হিসেবে চিন্তা করেছেন এবং তিনি সেটা লিখেছেন। জীবনানন্দ দাশকে তিনি কখনও গণমানুষের কবি হিসেবে বিবেচনাই করেননি। সেক্ষেত্রে সুকান্তকে অনেক বড় কবি হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তিনি আমার এক জন্মদিনে বললেন যে রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতা কখনও আপস করেনি। সরকারি চাকরি করেও তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে গণমানুষের পক্ষ নিয়েছেন, যা আমাদের কাছে খুব আনন্দের। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন কবির উদাহরণ দিয়ে দিয়ে আমার কবিতাকে মূল্যায়ন করেছেন। আমি সব সময় তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।
তিনি স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন কিনা আমরা জানি না। যদি না পেয়ে থাকেন স্বাধীনতা পদক অতিদ্রুত তাঁকে দেওয়া উচিত। আমি দাবি করছি সরকারের কাছে। এটা তাঁর প্রাপ্য। তিনি কখনও মুখ ফুটে কারও কাছে কিছু চাননি। পুরস্কার কিংবা রাষ্ট্রের কোনো বড় আসনে বসা– এগুলো চাননি কখনও। জুলাই আন্দোলনের পরে তাঁকে বাংলা একাডেমির সভাপতি করা হয়েছে সেজন্য কর্তৃপক্ষের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি দেখেছি যে কোনো দুর্বিপাক দুর্যোগে মানুষের কী হবে, দেশের কী হবে, আমাদের সমাজ কীভাবে দাঁড়াবে? দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ল কি-না, আমাদের রাজনীতিবিদরা ভুল করছে কি-না। এগুলো তিনি খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। এবং তিনি তা উপস্থাপন করতেন। মওলানা ভাসানীর কাজগুলো তিনি খুব মূল্যায়ন করেছেন। তিনি শেখ মুজিবের কাজকেও মূল্যায়ন করতেন সমালোচনার মধ্য দিয়ে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের যে ইন্টারেস্ট এবং তারা যে ঔপনিবেশিক আগ্রাসন চালিয়েছে– এসব বিষয়ে স্যারের সচেতন বক্তব্য ছিল। আমাদের কবিতা কেমন হবে, আমাদের গদ্য কেমন হবে, আমাদের সাহিত্য শিল্পচর্চা কেমন হবে, আমরা কীভাবে দাঁড়াব, সেসব বিষয়ে তাঁর কথার কোনো তুলনা নেই। তিনি সজ্জন এবং মুক্তপ্রাণের মানুষ। এই লোকটিকে আমরা যোগ্য সমাদর এখনও করতে পারিনি। যদিও সমাদর করার সময় ফুরিয়ে যায়নি। আমি মনে করি, এখনই তাঁকে যোগ্য সমাদর করতে হবে। তাঁকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দিতে হবে। বাংলা একাডেমি থেকে তাঁর সমস্ত রচনা বের করতে হবে। আমাদের অন্য যেসব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আছে, সেখানেও তাঁকে যোগ্য মর্যাদার আসনে দেখতে চাই। স্যার এখনও তাঁর আত্মজীবনী লেখেননি। আত্মজীবনী যদি লেখেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং যে সমস্ত আন্দোলন হয়েছে, আজকের দিনের জুলাই অভ্যুত্থান– এসব বিষয় নির্ভুলভাবে উঠে আসবে। আমি খুব আশাবাদী, স্যার সেটা করতে পারবেন।
আমাদের শিল্পকলার যে মূল জায়গা এস এম সুলতান, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমেদ, আব্দুস সাত্তার, মনীরুল ইসলাম– যারা চেষ্টা করেছেন সেই শিল্পকলার ধারাটিকেও নানাভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। সেটাকে রিলেট করেছেন আমাদের সাহিত্যের সঙ্গে, আমাদের কবিতার সঙ্গে। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নন কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তার যে মূলভাবধারা মূল ভাবনা, তার দরজা খোলার জন্য সব সময় আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তাঁর মধ্যে সব সময় দার্শনিকতামগ্ন ও সৎবোধ কাজ করত। এলিনিয়েটেড দর্শনকে তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি তাঁর চিন্তার সঙ্গে মার্কসীয় চিন্তার যেভাবে মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, সেটা কিন্তু বড় কাজ। তাঁর পত্রিকা লোকায়ত নাম দেখেই বোঝা যায় তিনি লোকো মানুষের প্রতিনিধি। তিনি এ দেশের গ্রামবাংলার শ্রমিক খেটে খাওয়া মানুষের বুদ্ধিজীবী। তিনি নারীমুক্তির স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। বেগম সুফিয়া কামাল, বেগম রোকেয়া– তারা ছাড়া যখন কেউই নারীকে নিয়ে কথা বলত না। আমাদের সময়কালের যারা নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত, তারা বিশেষ করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাকে নিয়ে তার যে ভাবনা নজরুলের জন্য তার যে প্রাণদায়ী লেখা নজরুল ভাবধারার প্রসারণ ঘটানো– সে ব্যাপারে তাকে অসাধারণভাবে কথা বলতে শুনেছি। আজকে আমরা একুশ শতকে দাঁড়িয়ে বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে যদি এ পর্যন্ত ধরি তাহলে আমরা দেখব আমাদের আবুল কাসেম ফজলুল হক, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, দার্শনিক আবুল কাসেম ফজলুল হক, লেখক আবুল কাসেম ফজলুল হক, সম্পাদক আবুল কাসেম ফজলুল হক, রাজনীতিক আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং চিন্তাবিদ আবুল কাসেম ফজলুল হকের মধ্যে কিন্তু একটা ঐক্য আছে, একটা সেতু আছে। সেতু পার হয়ে আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে নতুন মাত্রায় বিভূষিত করতে পারব। আজকে এ কথাগুলো প্রাণখুলে বলতে পারছি এজন্য যে স্যারকে নিয়ে একটা লেখা খুবই দরকার ছিল, আমি সময়ের অভাবে সেটা করতে পারিনি। স্যারের সব বই পড়া হয়নি এখনও। আমি স্যারের সম্পাদকীয়গুলো পড়তাম, সেগুলো নিয়ে স্যারের সাথে আলাপ করতাম। শিল্পকলার মহাপরিচালক হিসেবে যোগদানের পর স্যারকে ফোন করেছিলাম বাসার একজন লোক ফোন ধরে বলল উনি অসুস্থ। আমি আর বিরক্ত করিনি। আমি চাই শিল্পকলার জন্য তাঁর যে চিন্তাভাবনা, শিল্পকলা থেকে তাঁকে একটা পুরস্কার দেওয়া। একুশ শতকের এই সময় দাঁড়িয়ে স্যারের সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করি। দীর্ঘায়ু কামনা করছি। তাঁর যে সাহিত্য চিন্তা কখনও যেন ভুলে না যাই। তাঁর প্রতি যেন সশ্রদ্ধ থাকি। তাঁর যোগ্য মূল্যায়ন যেন আমরা করতে পারি।
লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি
- বিষয় :
- মেধাক্রম