ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চেরনোবিলের দিনরাত্রি

চেরনোবিলের দিনরাত্রি
×

সভেৎলানা আলেক্সিয়েভিচ

সভেৎলানা আলেক্সিয়েভিচ

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১১ | আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

সভেৎলানা আলেক্সিয়েভিচ ২০১৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর গ্রন্থ ‘ভয়েসেস ফ্রম চেরোনোবিল: দ্য ওরাল হিস্ট্রি অব আ নিউক্লিয়ার ডিজাস্টার’। পরিশিষ্ট অংশে তিনি ‘পরিশিষ্টের পরিবর্তে’ একটি ক্ষুদে আত্মকথা যুক্ত করেন। ইংরেজি থেকে নির্বাচিত অংশের ভাষান্তর জান্নাতুল রুহী
অতীতে আমি অন্য মানুষের দুর্ভোগের মধ্যেই বিচরণ করতাম। কিন্তু এখন অন্য সবার মতো সেগুলোর সাক্ষী হয়ে উঠেছি! আমার জীবনও এই ঘটনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর আমি এসব কিছু নিয়েই বসবাস করি।    
আমাদের ভূমিতে ৩৫০টি পারমাণবিক বোমা আছে। যদিও মানুষ এখন পারমাণবিক যুদ্ধ-পরবর্তী জীবন যাপন করছে। কিন্তু যুদ্ধটা যখন শুরু হয়েছিল, তারা তা বোধই করতে পারেননি।
আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, আবখাজিয়া, তাজিকিস্তান, চেচনিয়ার ভিন্ন ভিন্ন যুদ্ধ থেকে এখন মানুষ এখানে আসছে। এসব অঞ্চল থেকে হাজার হাজার রুশ শরণার্থী এই পরিত্যক্ত ভূমিতে আশ্রয় নিচ্ছে। এমনকি তারা এমন সব পরিত্যক্ত বাড়িতে এসে উঠেছে যেগুলো আসলে বিশেষ বাহিনী এসে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে যায়নি। আড়াই কোটিরও বেশি রুশ বংশোদ্ভূত রাশিয়ার বাইরে বসবাস করে। এ যেন একটা সম্পূর্ণ দেশের মতোই! আর পরিস্থিতিও এমন যে তাদের কারও কারও জন্য চেরনোবিল ছাড়া যাওয়ার আর কোনো জায়গাও নেই। মাটি, পানি, বাতাস যে তাদের মেরে ফেলতে পারে– এসব কথা তাদের কাছে রূপকথার গল্পের মতো শোনায়। তাদের নিজস্ব একটা খুবই পুরোনো গল্প আছে, আর সেটাতেই তারা বিশ্বাস করে। গল্পটা হলো, কীভাবে মানুষ বন্দুক দিয়ে একে অপরকে মেরে ফেলে।
আমি আগে ভাবতাম, আমি সব কিছুই বুঝতে পারি এবং প্রকাশও করতে পারি। অন্তত পুরোটা না হলেও প্রায় সবটাই। মনে পড়ে, আফগান যুদ্ধ নিয়ে আমার বই ‘জিঙ্কি বয়েজ’ লেখার সময় আমি আফগানিস্তানে গিয়েছিলাম। সেখানে তারা আমাকে আফগান যোদ্ধাদের কাছ থেকে দখল করা কিছু বিদেশি অস্ত্র দেখিয়েছিল। অস্ত্রগুলো দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সেগুলোর আকৃতি কতটা নিখুঁত! মানুষের চিন্তা কতটা নিখুঁতভাবে সেটা তৈরি করতে প্রকাশ করেছে। আমার পাশে একজন অফিসার দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি বললেন, ‘আপনি বলছেন এই ইতালীয় মাইনটা এত সুন্দর, দেখতে যেন ক্রিসমাসের সাজসজ্জার জিনিসের মতো। কিন্তু কেউ যদি এটার ওপর পা দেয়, তাহলে তার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, শুধু এক বালতি মাংসই পড়ে থাকবে। আর সেগুলো চামচ দিয়ে চেঁছে চেঁছে মাটি থেকে তুলতে হবে।’ যখন আমি এটা লিখতে বসলাম, প্রথমবারের মতো আমি ভাবলাম, ‘এটা কি আমার লেখা উচিত?’ আমি বড় হয়েছিলাম রুশ সাহিত্যের মধ্যে। আমার মনে হতো, লেখার মাধ্যমে অনেক দূর পর্যন্ত  যায়। তাই আমি সেই মাংসের কথাটা লিখে ফেলেছিলাম। কিন্তু ‘জোন’ সেটা একটা আলাদা জগৎ। এ যেন বাকি জগতের ভেতরে থাকা আরেকটা জগৎ। আর সাহিত্যের চেয়েও এটা অনেক বেশি শক্তিশালী।
তিন বছর ধরে ঘুরে ঘুরে আমি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে প্রশ্ন করেছি। আমি কথা বলেছি পারমাণবিক কেন্দ্রের শ্রমিক, বিজ্ঞানী, সাবেক পার্টি-আমলা, চিকিৎসক, সৈনিক, হেলিকপ্টার পাইলট, খনি-শ্রমিক, শরণার্থী, পুনর্বাসিত মানুষ সবার সঙ্গে। তাদের সবার ভাগ্য ছিল ভিন্ন। আবার আলাদা হওয়ার কারণে স্বভাবও ছিল আলাদা। কিন্তু তাদের জগতের প্রধান বিষয়বস্তু ছিল চেরনোবিল। এ ক্ষেত্রে তারা ছিলেন সাধারণ মানুষ। আর তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছিলেন। আমি প্রায়ই ভাবতাম একটা অস্পষ্ট অনুভূতি, গুজব বা দর্শনের চেয়ে সাধারণ তথ্য, যান্ত্রিক তথ্য সত্যের বেশি কাছাকাছি নয়। তথ্যের পুনরাবৃত্তি করে লাভ কী? সেগুলো তো আমাদের অনুভূতিগুলোকেই ঢেকে দিচ্ছে। এই অনুভূতিগুলোর পরিণত হওয়া, তথ্য ছাপিয়ে এই অনুভূতিগুলোর বিস্তৃতি লাভ করাটাই আমাকে বিমোহিত করে। আমি সেগুলোকেই অনুসন্ধান করে বের করার, এক জায়গায় করার, রক্ষা করার চেষ্টা করি।
এই মানুষগুলো ইতোমধ্যে সেই চিত্র দেখে ফেলেছিলেন, যা বাকি সবার কাছে এখনও অজানা। আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন ভবিষ্যৎকেই লিপিবদ্ধ করছি।
২
সভেৎলানার সংগৃহীত তৎকালীন পত্রপত্রিকার কিছু তথ্যমূলক অনুচ্ছেদ
ক. বেলারুশে কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নেই। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূখণ্ডে বিদ্যমান থাকা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে বেলারুশের সবচেয়ে কাছের কেন্দ্রগুলো পুরোনো সোভিয়েত-নকশার আরবিএমকে ধরনের (সোভিয়েত-নকশার একটি পারমাণবিক চুল্লির ধরন। এটা চেরনোবিলের ৪ নম্বর চুল্লিতে ব্যবহৃত হয়েছিল। আর এটার নকশাগত ত্রুটিই ১৯৮৬ সালের বিস্ফোরণের একটা বড় কারণ ছিল)। উত্তরে ইগনালিনস্ক কেন্দ্র, পূর্বে স্মোলেনস্ক কেন্দ্র, আর দক্ষিণে চেরনোবিল।
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল, রাত ১টা ২৩ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডে একের পর এক বিস্ফোরণে চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ নম্বর শক্তি ব্লকের ভবনটির চুল্লি ধ্বংস হয়ে যায়।  চেরনোবিলের এই বিপর্যয় বিশ শতকের সবচেয়ে বড় প্রাযুক্তিক দুর্যোগে পরিণত হয়।
ছোট্ট বেলারুশের (জনসংখ্যা এক কোটি) জন্য এটা ছিল একটা জাতীয় বিপর্যয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিরা বেলারুশের ৬১৯টি গ্রাম বাসিন্দাসহ ধ্বংস করে দিয়েছিল। চেরনোবিলের ফলে দেশটি হারিয়েছে ৪৮৫টি গ্রাম ও জনবসতি। এর মধ্যে ৭০টি চিরতরে মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। যুদ্ধের সময় প্রতি চারজন বেলারুশবাসীর একজন নিহত হয়েছিলেন। আজ প্রতি পাঁচজনের একজন বেলারুশবাসী দূষিত ভূমিতে বসবাস করেন। সংখ্যায় এটা দাঁড়ায় ২১ লাখ, যাদের মধ্যে সাত লাখই শিশু। বেলারুশের জনসংখ্যা হ্রাসের পেছনে যেসব জনতাত্ত্বিক কারণ দায়ী, তার মধ্যে তেজস্ক্রিয়তাই সবচেয়ে বড় কারণ। চেরনোবিলের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গোমেল ও মোগিলিয়েভ অঞ্চলে মানুষের মৃত্যুহার জন্মহারের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি।


এই দুর্ঘটনার ফলে বায়ুমণ্ডলে পাঁচ কোটি কুরি (তেজস্ক্রিয়তার একক) তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ গিয়ে পরে বেলারুশে। দেশটির পুরো ভূখণ্ডের ২৩ শতাংশই সিজিয়াম-১৩৭ তেজস্ক্রিয় পদার্থ দ্বারা দূষিত। এটার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে এক কুরির বেশি। অন্যদিকে ইউক্রেনের ৪.৮ শতাংশ আর রাশিয়ার ০.৫ শতাংশ ভূখণ্ড দূষিত। প্রতি বর্গকিলোমিটারে এক কুরির বেশি ঘনত্বসম্পন্ন কৃষিজমির পরিমাণ এক কোটি ৮০ লাখ হেক্টরেরও বেশি। এর মধ্যে ২৪শ হেক্টর জমি কৃষি অর্থনীতি থেকে পুরোটাই বাদ দিতে হয়েছে। বেলারুশ একটা বনভূমির দেশ। কিন্তু এর মোট বনভূমির ২৬ শতাংশ এবং প্রিপিয়াত, দিনিয়েপার ও সোঝ নদীর তীরবর্তী জলাভূমির একটা বড় অংশ এখন তেজস্ক্রিয় অঞ্চলের মধ্যে গণ্য হয়। স্বল্পমাত্রার তেজস্ক্রিয়তার এই ক্রমাগত উপস্থিতির ফলে প্রতিবছর ক্যান্সার, মানসিক প্রতিবন্ধকতা, স্নায়বিক সমস্যা আর বংশগত রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
—বেলারুস্কায়া এনৎসিক্লোপেদিয়ার               ‘ চেরনোবিল’ অংশ থেকে 
খ.
১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিল। পোল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও রোমানিয়ায় যন্ত্রে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়তা ধরা পড়ে। এপ্রিল মাসের ৩০ তারিখ ধরা পড়ে সুইজারল্যান্ড ও উত্তর ইতালিতে। 
মে মাসের ১ ও ২ তারিখে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, গ্রেট ব্রিটেন ও উত্তর গ্রিসে। মে মাসের ৩ তারিখে ইসরায়েল, কুয়েত ও তুরস্কে। ...বায়ুবাহিত গ্যাসীয় কণা সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়: মে মাসের ২ তারিখে জাপানে, ৫ তারিখে ভারতে, ৫ ও ৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এগুলো শনাক্ত হয়। চেরনোবিল সারাবিশ্বের সমস্যায় পরিণত হতে এক সপ্তাহেরও কম সময় লেগেছিল।
- ‘বেলারুশে চেরনোবিল দুর্ঘটনার পরিণতি।’ মিনস্ক, সাখারভ, ইন্টারন্যাশনাল কলেজ অন রেডিওইকোলজি
গ.
চতুর্থ চুল্লিটি এখন ‘কভার’ নামে পরিচিত। এটা তার সিসা-ও-ধাতব খোলসের ভেতরে এখনও প্রায় বিশ টন পারমাণবিক জ্বালানি ধরে রেখেছে। এর ভেতরে ঠিক কী ঘটছে, তা কেউ জানে না।
সারকোফ্যাগাসটি ভালোভাবেই তৈরি হয়েছিল। এটার নকশাও ছিল অনন্য। আর এটা নিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গের নকশাকারী-প্রকৌশলীদের সম্ভবত গর্বও হওয়ার কথা। কিন্তু এটা তৈরি হয়েছিল দূর থেকে। এর খণ্ডগুলো জোড়া লাগানো হয়েছিল রোবট আর হেলিকপ্টারের সাহায্যে। এজন্য সেখানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো হিসাব অনুযায়ী, এখন সেখানে ২০০ বর্গমিটারেরও বেশি ফাঁকা জায়গা আর ফাটল আছে, আর সেগুলোর মধ্য দিয়ে তেজস্ক্রিয় কণা অনবরত বেরিয়ে আসছে... সারকোফ্যাগাসটা কি ধসে পড়তে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারে না। কারণ এর অনেক জোড় আর কাঠামোর কাছে পৌঁছানোই এখনও অসম্ভব। সুতরাং স্বাভাবিকভাবে সেগুলো মজবুত আছে কিনা তা দেখাও সম্ভব নয়। কিন্তু সবাই জানে, ‘কভার’ যদি ধসে পড়ে, তাহলে তার পরিণতি ১৯৮৬ সালের চেয়েও ভয়াবহ হবে। 
–ওগোনিওক ম্যাগাজিন, সংখ্যা ১৭, এপ্রিল, ১৯৯৬ বিশ্ব সংক্ষিপ্ত সংবাদ, বেলারুশ: সংসদ
ঘ.
সমালোচনা নিষিদ্ধ 
সংসদ এমন একটি আইন পাস করেছে, যাতে প্রতিবাদ সংগঠিত করা, নিষিদ্ধ সংগঠনে যোগ দেওয়া বা জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার জি. লুকাশেঙ্কো (আগামী বছর তৃতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচনে লড়ছেন) এই আইনের খসড়া জমা দিয়েছেন। সঙ্গে আহ্বান জানান, জর্জিয়া, ইউক্রেন ও কিরগিজস্তানে জনগণের অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এটি দ্রুত পাস করার। এই আইনের আওতায় সরকার উৎখাতের পক্ষে সমর্থন করার দায়ে সর্বোচ্চ তিন বছর এবং ‘দেশকে হেয় করার’ দায়ে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
বিরোধী দলের নেতা আনাতোলি ভি. লেবেদকো এই আইনকে সোভিয়েত আমলের দমনমূলক আইনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এই পদক্ষেপগুলো দেখিয়ে দেয় যে লুকাশেঙ্কো নিজেই জানেন, তিনি সৎভাবে নির্বাচনে জিততে পারবেন না।’ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউরোপে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থা এই আইনকে রাজনৈতিক বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের জন্য হুমকি বলে মনে করেছে।
–দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ৩ ডিসেম্বর, ২০০৫ 

আরও পড়ুন

×