ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অভিযান

পৃথিবীর ছাদে মৃত্যুর মুখোমুখি

পৃথিবীর ছাদে মৃত্যুর মুখোমুখি
×

পামির অভিযানে সালেহীন আরশাদী

সালেহীন আরশাদী

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৪ | ২৩:৩৬ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৪ | ১৫:০১

গত বছরের আগস্ট মাসের কথা। বাসা থেকে রওনা দেওয়ার সাত দিন পর অবশেষে আমাদের লক্ষ্য পামির এসে পৌঁছলাম। আমরা আছি ৩ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতায় কিরগিজস্তানের পিক লেনিন বেস ক্যাম্পে। এবড়োখেবড়ো দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে আমাদের বিকেল হয়ে গিয়েছিল। ক্লান্ত দেহটি নিয়ে যখন আমরা তাঁবুর দিকে যাচ্ছি, তখন ট্রান্স আলতাই পর্বতমালার পেছন থেকে অদ্ভুত সুন্দর আর রহস্যময় এক পূর্ণিমার চাঁদ উঁকি দিয়েছে।

পরদিন আমাদের পরিকল্পনা ছিল বেস ক্যাম্পের পাশেই একটি চূড়ায় এক্লিমাটাইজেশন করব। বেস ক্যাম্পের উচ্চতা ৩ হাজার ৬০০ মিটার। ক্যাম্প-১-এর উচ্চতা ৪ হাজার ২০০ মিটার। হুট করে ৩ হাজার ৬০০ মিটার থেকে  ক্যাম্প-১-এ গিয়ে যেন অসুস্থ বোধ না করি, তাই উচ্চতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া দরকার। যেহেতু বেস ক্যাম্প থেকে পেট্রোভক্সি চূড়াটি কাছেই আর উচ্চতাও ৪ হাজার ৮০০ মিটার, ক্যাম্প-১ থেকে কিঞ্চিৎ বেশি, তাই এই চূড়াতেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

ভোরে আলো ফুটতেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম। এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না, আমরা পৃথিবীর ছাদ পামিরের বুকে হাঁটছি। যতদূর চোখ যায় শুধুই বাদামি ধূসর উঁচু-নিচু পর্বতের সারি। দু’দিন আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে, তাই পর্বতের ঢালে সবুজ কচি ঘাস ও বুনো ফুলে ছেয়ে গেছে। পর্বতের ঢাল বেয়ে যত ওপরে উঠছি চারদিকের প্রকৃতির রূপ নিজেকে মেলে ধরছে। লেনিনের চূড়াটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে দেখতে পেট্রোভস্কির রিজলাইনে উঠে এলাম। নিচ থেকে পেট্রোভস্কি চূড়াটিকে বেশ কাছে মনে হয়েছিল। রিজলাইনে ওঠার পর মনে হলো কোনো ভ্রান্তি হচ্ছে। রিজলাইন ধরে যত এগোচ্ছি ততই যেন চূড়াটি পিছিয়ে যাচ্ছে। রিজলাইন ট্রাভার্স করতে করতে বেলা ৩টার দিকে আমরা ৪ হাজার ৬৬৩ মিটার উচ্চতায় চলে আসি। পেট্রোভক্সি আমাদের থেকে তখন মাত্র ১৫০ মিটার উঁচুতে। আমাদের হতাশ করে দিয়ে এবারও রিজলাইনটি এখানে এসে একেবারে ভেঙে গেছে। একটু ঘুরে কানেক্টিং রিজ খুঁজতে গিয়ে আমরা পেট্রোভক্সির মোরেইনের কাছে চলে এলাম।

তীব্র গরমে মোরেইনের নিচে থাকা বরফ তখন গলতে শুরু করেছে। হিমবাহ গলা পানির সঙ্গে মাটি ও পাথর মিলে পুরো মোরেইনটাই কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল হয়ে আছে। সেই সঙ্গে এদিক-সেদিক দিয়ে রকফল হচ্ছে। রিজলাইন ধরতে হলে আমাদের গলতে থাকা মোরেইন অতিক্রম করতে হবে। কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে আমি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম। কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই বুঝলাম বড্ড ভুল করে ফেলেছি। আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে, আমি নিজেকে আটকে রাখতে পারছি না। আতঙ্ক আর শঙ্কায় আমি কিছু ধরার জন্য হাতড়ে যাচ্ছি; পর্বতের স্লেট পাথর খুলে চলে আসছে। আমার ডানপাশে তাকিয়ে দেখলাম নিচে হাজার ফিটের খাদ। এখান থেকে পড়লে একেবারে হিমবাহের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ব। মৃত্যুভয় আমাকে ততক্ষণে ঘিরে ফেলেছে। 

আমি খুব ভালোমতো জানি, জীবনের পূর্ণতার জন্য মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ধর্মীয়ভাবে হোক, সামাজিকভাবে হোক বা বৈজ্ঞানিকভাবে হোক, আর অভিজ্ঞতা থেকেই হোক– আমি খুব ভালোমতোই জানি, এই বিরাজমান সময়চক্রে এমন এক মুহূর্ত আসবে যখন আমাকে এই পৃথিবী, আপনজন, এই পাহাড়-পর্বতের মায়া, নিজের জীবন, জাগিয়ে রাখা সব স্বপ্ন ও এই বর্তমানকে বিদায় বলতে হবে। সেই মুহূর্তটি নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি, কল্পনায় মুহূর্তটি ভিজুয়ালাইজ করার চেষ্টা করেছি। একবার-দু’বার নয়, একাধিকবার এমন মৃত্যু-মুহূর্ত আমার সামনে এসেছে বা অন্যভাবে বললে, আমি মৃত্যুর সেই মুহূর্তগুলোর দিকে এগিয়ে গিয়েছি। 

বিদ্রোহ করে বসা শরীরকে বিশৃঙ্খলার মাঝে আবার নিজের কবজায় নিয়ে আসা খুব কঠিন। বুক ভরে গভীর এক নিঃশ্বাস নিয়ে সিরিও ফরেলের মতো মনে মনে বললাম, ‘...আর আমরা শুধু মৃত্যুকে একটি কথা বলতে চাই– আজ নয়।’

এরপর শরীরের পুরো সিস্টেমটিকে রিস্টার্ট করা শুরু করে দিলাম। ভয়ে, শঙ্কায় ২০০ ছুইঁছুঁই হার্টরেটকে আবার ১০০-এর নিচে নামিয়ে আনতে হবে। আর এটা সম্ভব করার জন্য সবার আগে নড়াচড়া পুরোপুরি থামিয়ে দিতে হবে। মন আর মস্তিষ্ককে বুঝাতে হবে এখন যা হবে হোক, বাঁচি কি মরি তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। এখন আমি এক কদমও নড়ব না। এরপর দীর্ঘদিন ধরে অনুশীলন করা ব্রিদিং এক্সারসাইজ দিয়ে ধুকপুক করা হার্টের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে বেশি সময় লাগল না। 

নড়াচড়া বন্ধ করে ব্রিদিংটা নিয়ন্ত্রণে আনার সময়, আমি টের পাচ্ছি হার্ট রেট ৫-১০ করে নেমে যাচ্ছে। যত নামছে ততই আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। প্রতিটি পাথুরে নুড়ি, যারা আমার পায়ের নিচ থেকে জমি কেড়ে নিচ্ছে তাদের মুভমেন্ট আমি বুঝতে পারছি। এর মধ্যেই মস্তিষ্ক সামনে সরু পথটুকু অ্যানালাইজ করছে। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছে, আমি এখানে একা নই। আমার একজন সঙ্গী পেছনেই আছে, বাঁক ঘুরে অজিলও পিছু পিছু ঠিক এখানেই চলে আসবে। আমি চিৎকার করে অজিলকে ওখানেই থেমে যেতে বললাম। একই সঙ্গে ওকে জানিয়ে দিলাম পরিস্থিতি খুবই আশঙ্কাজনক– আমি হয়তো আর নিজেকে ধরে রাখতে পারব না। কারণ পায়ের নিচ রকফল হচ্ছে তো হচ্ছে, হাত দিয়ে যে পাথরগুলো ধরে রেখেছি, সেগুলোও খুলে চলে আসছে। 

এরপর হার্টবিট আরও কমে এল, সঙ্গে নিয়ন্ত্রণও। এরপর শুধুই রুটিন ওয়ার্ক– পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। মানবিক অনুভূতিগুলোর হঠাৎ ডিস্ট্রাকশনের কারণে এই ড্রিলটি অটোমেটিক্যালি কাজ করেনি। ঝুরঝুরে পাথরে, বিশেষ করে ঢালে গ্রাভিটেশনাল সোর্সের বিপরীতে গিয়ে অতিক্রম করার চেষ্টা করলে পাথরের এই পতন আরও ত্বরান্বিত হবে। আমাকে এখন এই পাথরগুলোর মতোই হয়ে যেতে হবে। ওরা যেভাবে গ্র‍্যাভিটির বিপরীতে নিজেদের আটকে রাখছে, ওই পজিশনগুলোকে টার্গেট করে এগিয়ে যেতে হবে, অনেকটা ব্যালেরিনাদের মতো।

ইঞ্চি ইঞ্চি করে নিজেকে আরেকটু ওপরে নিয়ে গেলাম। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর নিরাপদ একটি কার্নিশে উঠে যেতে সক্ষম হলাম। কঠিন বিপজ্জনক একটি পথ নিরাপদে পাড়ি দিতে পেরে মন তখন আনন্দে ভাসছে। প্রতিকূলতা পেরিয়ে বেঁচে ফেরার এই আনন্দের তুলনা আর কিছুর সঙ্গে করা সম্ভব না। পামিরের প্রথম অভিযানেই এমন টক-ঝাল মুহূর্তের অভিজ্ঞতা হবে, তা কে জানত! বেঁচে ফিরে সেসব মুহূর্ত স্মৃতির পাতা থেকে তুলে এনে বারবার উপভোগ করতে পারছি বলে নিজেকে এখন সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে। পামিরে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার সেই অভিজ্ঞতা কখনও ভোলার নয়।

আরও পড়ুন

×