ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হ্যানিম্যানকে ঘিরে নাটকীয় সন্ধ্যা

হ্যানিম্যানকে ঘিরে নাটকীয় সন্ধ্যা
×

হ্যানিম্যান নাটকে মীর জাহিদ হাসান

তারেকুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

কিছু সন্ধ্যা কেবল কেটে যায় আর কিছু সন্ধ্যা আমাদের ভেতরে থেকে যায় অনুভূতি ও অনুপ্রেরণা হয়ে। তেমন এক নাটকীয় সন্ধ্যা ছিল ১২ সেপ্টেম্বর শনিবারের সন্ধ্যা। 
ওইদিন হোমিওপ্যাথির জনক ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের জীবন, সংগ্রাম, চিন্তাধারা ও মহান অবদানকে কেন্দ্র করে নির্মিত মনোড্রামা ‘হ্যানিম্যান’-এর পঞ্চম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে।
মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় প্রযোজিত এবং অভিনেতা মীর জাহিদ হাসানের অনবদ্য একক অভিনয়ে মঞ্চের আলোয় যেন ফিরে এসেছিলেন মহাত্মা হ্যানিম্যান। তাঁর স্বপ্ন, অনুসন্ধিৎসা, সংগ্রাম আর সত্যের সন্ধানে অবিচল পথচলা নিয়ে মঞ্চের আলোয় যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর জীবন ও ব্যক্তিত্বের নাটকটি ছিল সাবলীল, গভীর এবং অনুভব করার মতো এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
হ্যানিম্যানের সেই কর্মযাত্রার অনন্য নাট্যরূপের সাক্ষী হতে উপস্থিত ছিলাম আমরা হোমিওপ্যাথি শিক্ষার্থীসহ টিম হোমিও কথনের অনেক সদস্য। যাঁর জীবন ও চিন্তার সঙ্গে আমাদের পথচলার এত গভীর যোগ, তাঁকে বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে মঞ্চের আলোয়, একজন জীবন্ত মানুষের অনুভূতি ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অনুভব করার অভিজ্ঞতা সত্যিই অন্যরকম। ‘মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়’-এর ৪৫তম প্রযোজনায় বহু প্রতীক্ষিত ‘হ্যানিম্যান’ মনোড্রামাটি উপভোগ করার অভিজ্ঞতাটি এক কথায় অসাধারণ এবং অকল্পনীয়!
পুরোটা সময় যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসেছিলাম। মঞ্চে অভিনেতা মীর জাহিদ হাসান যখন মহাত্মা স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের জীবনের শেষ অধ্যায়, ফ্রান্সের দিনগুলো, তাঁর সংগ্রাম, প্রতিকূলতার মুখে অবিচল থাকা, মানবকল্যাণের প্রতি তাঁর অদম্য নিষ্ঠা এবং নতুন এক চিকিৎসা-দর্শন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ পথচলাকে ফুটিয়ে তুলছিলেন, সেই অসাধারণ অভিনয় আমাদের বারবার ভুলিয়ে দিয়েছে যে আমরা একটি নাটক দেখছি। অনেক মুহূর্তে মনে হয়েছে, যেন স্বয়ং হ্যানিম্যান তাঁর জীবনের কথা আমাদের সামনে তুলে ধরছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই কিংবদন্তি শুধু একজন চিকিৎসক ছিলেন না–তিনি ছিলেন মানবজগতের এক অনন্য জাদুকর। নতুন ধারার চিকিৎসার জন্য আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো, মেটেরিয়া মেডিকার নিরলস পরিমার্জন কিংবা সন্তান হারানোর ব্যক্তিগত শোক, প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে মানবসেবায় তাঁর যে অবিচল লড়াই, নাটকটিতে অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।
হ্যানিম্যানকে নিয়ে পড়েছি, তাঁর দর্শন নিয়ে ভেবেছি, তাঁর লেখা পড়ার চেষ্টা করেছি। শিল্পের শক্তি অনেক সময় ইতিহাসকে হৃদয়ের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। হোমিওপ্যাথির একজন একনিষ্ঠ সেবক ও শিক্ষার্থী হিসেবে আজকের অভিজ্ঞতা আমাদের তাঁর জীবন ও কর্মকে নতুনভাবে অনুভব করতে সাহায্য করেছে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও অনুরাগ যেমন আরও গভীর হয়েছে, তেমনি হোমিওপ্যাথির প্রতি আমার ভালোবাসা, বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতাকে যেন আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।
এমন একটি মননশীল ও আবেগপূর্ণ প্রামাণ্য উপস্থাপনার জন্য মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়, নির্দেশক শুভাশীষ দত্ত তন্ময়, রচয়িতা অপূর্ব কুমার কুণ্ডু এবং অভিনেতা মীর জাহিদ হাসানকে অসংখ্য ধন্যবাদ। 
নাট্যকার কীভাবে এতটা গবেষণাধর্মী, দ্রুতগতির অথচ প্রাণবন্ত সংলাপের জীবন আশ্রয়ী নাটক লিখলেন–সেটি এক বিস্ময় আমাদের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী সবার কাছে। নির্দেশকের নির্মাণ দৃষ্টিনন্দন এবং বহুমাত্রিক। অভিনেতা মীর জাহিদ হাসানের একটু একটু করে হ্যানিম্যান হয়ে ওঠা যেন বৃন্ত থেকে প্রস্ফুটিত ফুলের মহাকাব্যিক বিবর্তিত নয়নাভিরাম নান্দনিক রূপ।
ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যানকে জানা, অনুভব করা এবং তাঁর মানবকল্যাণের স্বপ্নকে নতুন করে ভাবার জন্য এ নাটকটি এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
এই সন্ধ্যায় যেন সময় পেরিয়ে ফিরে গিয়েছিলাম সেই মানুষটির কাছে, যিনি প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন–শিখিয়েছেন অনুসন্ধান। চিকিৎসার পথে মানুষের কল্যাণকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে শিখিয়েছিলেন। 
মহাত্মা হ্যানিম্যানকে ঘিরে সেই সন্ধ্যা তাই শুধু একটি নাটক দেখা নয়, ছিল একজন পথপ্রদর্শকের জীবনকে নতুন করে অনুভব করার এক অনন্য যাত্রা। হোমিওপ্যাথির জয় হোক, মানবতা দীর্ঘজীবী হোক। 

আরও পড়ুন

×