সমাজ
আমরা কোন সংস্কৃতির কদর করছি?
নাদির জুনাইদ
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০
ইদানীং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দেখি, বেশিরভাগই পণ্ডিত রবিশংকর বা জর্জ হ্যারিসন সম্পর্কে সামান্যই জানে। প্রাগৈতিহাসিক, জিব্রাইলের ডানা, মোবি ডিক, থ্রি মাস্কেটিয়ারস, আরণ্যক, হারবার্ট- প্রভৃতি আলোচিত গল্প-উপন্যাসও বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী পড়েনি। সত্যজিৎ রায়ের উদয়ন পণ্ডিত চরিত্রটি তাদের কাছে অপরিচিত। তারা চেনে না 'প্রতিদ্বন্দ্বী' ছবির সিদ্ধার্থ বা 'পদাতিক'-এর সুমিতের মতো তরুণদের। 'শতরঞ্জ কি খিলাড়ী' ছবির দুই অভিজাত ব্যক্তি মির্জা সাজ্জাদ আলি আর মীর রওশন আলির মানসিকতা সম্পর্কেও জানে না তারা। হতাশ হয়ে দেখি- দেশের প্রথিতযশা চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির নির্মিত বিভিন্ন চলচ্চিত্র সম্পর্কেও এই সময়ের বহু তরুণ-তরুণীর ধারণা নেই।
হালে আলোচিত 'হিরো আলম' বিকৃত সুরে আর রবীন্দ্রসংগীত গাইবেন না- ক'দিন আগে পুলিশের কাছে এমন মুচলেকা দিয়েছেন। ভুল সুরে কেউ রবীন্দ্রসংগীত গাইলে তার বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা যায় কিনা এবং পুলিশ সেই ব্যক্তির কাছ থেকে মুচলেকা নিতে পারে কিনা, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। সঠিক সুরে রবীন্দ্রসংগীত না গেয়ে সেই ভিডিও কেউ সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করলেই ধরে নেওয়া যায় না- তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে রবীন্দ্রসংগীত বিকৃত করেছেন। হয়তো তাঁর রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার উৎসাহ আছে, কিন্তু সঠিক সুরে গাইতে পারেননি। এসব ক্ষেত্রে পুলিশের কাছে অভিযোগ না করে তাঁকে বুঝিয়ে বলা উচিত, বিকৃত সুরে গান গাওয়ায় সৌন্দর্য নেই।
রবীন্দ্রসংগীত এবং নজরুল্রসংগীত সঠিক সুর ও কথায় গাওয়া উচিত- এমন মত যাঁরা প্রকাশ করেন, তাঁদের 'এলিটিস্ট' বলে নিন্দা করাও অযৌক্তিক। ইচ্ছামতো গান গাওয়ার অধিকারের কথা বলে ভুল সুর ও কথায় রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল্রসংগীত কিংবা লালনগীতি গাওয়ার প্রবণতা সমর্থন করা হলে অশুদ্ধ গান পৌঁছে যাবে বহু মানুষের কাছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে মূল সংগীত। রাগ সংগীত কিংবা সুফি সংগীতের সঙ্গে রক মিউজিকের ফিউশন করা হলেও কিন্তু গানের সুর বিকৃত করা হয় না। 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' চলচ্চিত্রে গুপী প্রথমে বেসুরো কণ্ঠে গান গাইত। গুপীর গান গাওয়ার আগ্রহ দেখে ভূতের রাজা খুশি হলেও তাকে কিন্তু বেসুরো কণ্ঠে গান গাওয়ার বর তিনি দেননি। শুদ্ধ সুরে গান গাওয়ার বরই দিয়েছিলেন।
বস্তুত, নিবন্ধের শুরুতে যে সাংস্কৃতিক নির্মাণগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো উঁচু মানের হয়ে উঠেছে মানুষের মধ্যে চিন্তার গভীরতা ও নান্দনিক বোধ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে বলেই। গভীরভাবে ভাবতে পারার ক্ষমতাই সূক্ষ্ণবোধ আর চিন্তাঋদ্ধতা। মানুষ যদি গভীরভাবে ভাবার চেষ্টা না করে কেবল হালকা বিনোদনেই বুঁদ হয়ে থাকে, তাহলে তারা জীবন, সমাজ ও রাজনীতির নানা জটিলতা অনুধাবন করতে পারবে না। গভীরভাবে চিন্তা করতে অক্ষম মানুষকে নিয়ন্ত্রণ ও শোষণ করাও খুব সহজ। চিন্তা-চর্চার ফলে মানুষ যেমন ভালো-মন্দের পার্থক্য অনুধাবন করতে পারে, তেমনি তার পক্ষে মনের অনুভূতি প্রকাশ করাও সম্ভব হয়। জর্জ হ্যারিসনের 'বাংলাদেশ' গানটির ভিডিও দেখানোর পর যখন ছাত্রছাত্রীদের অনুভূতি জানতে চাই, তখন বেশিরভাগই কেবল বলে, 'ভালো লেগেছে'। সাদামাটা এই উত্তর শুনে প্রশ্ন করি- চিন্তাঋদ্ধ সাংস্কৃতিক উপাদান নিয়মিত গ্রহণ না করার কারণেই কি নিজের অনুভূতি প্রগাঢ়ভাবে প্রকাশের সক্ষমতাও তৈরি হয়নি?
অতিমাত্রায় তেল, লবণ, চর্বি ও মসলাযুক্ত খাবার নিয়মিত খেলে যেমন শরীরের ক্ষতি হয়; একইভাবে হালকা, চটুল বিনোদন জোগায় এমন সাংস্কৃতিক উপাদানের অবারিত প্রচারও মনের জন্য ক্ষতিকর। চিন্তাশীল এবং নান্দনিকভাবে অভিনব উপন্যাস, সংগীত, চলচ্চিত্র এলিট সংস্কৃতির উপাদান এবং এই কারণে তা সাধারণ মানুষের জন্য নয়- এমন কথা বলা যুক্তিহীন। কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান, ভিত্তোরিও ডি সিকা, আকিরা কুরোসাওয়া প্রমুখের কাজ দুর্বোধ্য নয় এবং তাঁদের কাজের সঙ্গে বহু মানুষের পরিচয় ঘটানো মানুষের চিন্তার উন্নতির জন্যই জরুরি।

ফরাসি চলচ্চিত্রকার জঁ-ল্যুক গদার মনে করেছেন, ব্রিটিশ রক ব্যান্ড 'দ্য বিটলস' এবং 'দ্য রোলিং স্টোনস' খুবই গুরুরুপূর্ণ। কারণ এ দুটি ব্যান্ড একই সঙ্গে 'পপুলার' ও 'ইন্টেলেকচুয়াল'। সত্যজিৎ রায়ের 'হীরক রাজার দেশে' বা অনীক দত্তের 'ভূতের ভবিষ্যৎ' দর্শককে বিনোদন জোগায়, সেই সঙ্গে দর্শককে বারবার ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। এমন সাংস্কৃতিক নির্মাণই মানুষকে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে সমাজ-সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে হয়ে ওঠে শক্তিশালী।
সমাজে আমরা দেখি গণসংস্কৃতি বা ম্যাস কালচার নামে একটি সংস্কৃতি, যা কেবল বাজারের জন্য তৈরি করা হয়। এমন সাংস্কৃতিক উপাদানে চিন্তার গভীরতা নেই; বক্তব্যের সৃজনশীল প্রকাশ নেই। আছে অনুকরণ চেষ্টা আর গতানুগতিকতা। একজন শিল্পী নিজের ভাবনা প্রকাশের জন্য পরিশ্রমের মাধ্যমে সৃষ্টি করেন শৈল্পিক উপাদান। আর ম্যাস কালচার তৈরি হয় বাণিজ্যিক লাভের কথা মাথায় রেখে। ম্যাস কালচারের সঙ্গে তাই শৈল্পিক সুষমার সংযোগ নেই। চটকদার উপাদান ব্যবহার করে বিভিন্ন বয়সের দর্শককে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে আর্থিক মুনাফাপ্রাপ্তিই গণসংস্কৃতির লক্ষ্য।
চটুল বিনোদনে দর্শককে আচ্ছন্ন করে রাখার ফলে মানুষের মধ্যে সুরুচি আর বিচারবুদ্ধি তৈরি হয় না। সমাজের বিভিন্ন গুরুতর সমস্যা সম্পর্কে তাদের মনে সচেতনতাও জন্মায় না। বিনোদনের আফিমে বুঁদ হয়ে থাকা সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদ গড়ে তুলতে অক্ষম মানুষের সংখ্যা যত বাড়ে, ভোগবাদী ব্যবস্থায় শোষণ করা তত সহজ হয়। সুবিবেচনাবোধের অভাবে প্রকট হয় বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা। চিন্তাবিদ হারবার্ট মারকিউজ তাই বলেছিলেন, ম্যাস কালচার রাজনৈতিক নিপীড়নই টিকিয়ে রাখে।
আমাদের সমাজে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা টিকে থাকছে। সেই সঙ্গে কমছে ইতিহাস সচেতনতা ও চিন্তাশীল সাংস্কৃতিক উপাদানের প্রতি আগ্রহ। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত স্থূলতাসর্বস্ব টিকটক ও অন্যান্য চটুল ভিডিও আপলোড করার ফলে অগণিত মানুষের রুচি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
মনে রাখা দরকার, গণসংস্কৃতির প্রসারে সাধারণ মানুষের বুদ্ধি, রুচি এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশের উন্নতি হয় না। এতে লাভবান হয় আর্থিক মুনাফা লাভের জন্য ব্যগ্র ব্যক্তি ও গোষ্ঠী। মানুষের পছন্দমতো কনটেন্ট তৈরির স্বাধীনতা আছে- এই কথা বলে অগভীর সাংস্কৃতিক উপাদানের সমালোচনা না করে মুনাফামুখী গণসংস্কৃতির অবাধ বিতরণ আমরা নিশ্চিত করছি কিনা এবং আমাদের এমন আচরণের কারণে সমাজ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা কি ভেবে দেখছি?
হিরো আলমের অধিকার ক্ষুণ্ণ নিয়ে যেমন উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে; আমাদের দেশে সাংস্কৃতিক নির্মাণের প্রতি কমবয়সীদের উদাসীনতা নিয়ে তেমন উদ্বেগ প্রকাশ করা হলে সাংস্কৃতিক ক্ষয় সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি হতো। ইচ্ছামতো কনটেন্ট নির্মাণ মানুষের অধিকার কিংবা সাংস্কৃতিক উপাদানের মান কে ঠিক করবে- এমন কথা বলা যেতেই পারে। কিন্তু এর ফলে কোন ধরনের সাংস্কৃতিক উপাদান সমাজে অবাধে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তাও ভাবতে হবে।
ড. নাদির জুনাইদ: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সমাজ
- নাদির জুনাইদ