ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

ঢাকা শহরের স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন

ঢাকা শহরের স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন
×

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১৩:৩৬

হিসাব করে দেখলাম, আজ থেকে ৬০ বছর আগে ঢাকা শহরে এসেছিলাম। শহর বলা ঠিক হবে না। একটা বড় গ্রাম। হাতেই গোনা যেত যানবাহনের সংখ্যা। আজকের তুলনায় রিকশার সংখ্যাও নগণ্য। পথগুলো পিচঢালা, মেঠোপথ। রাস্তার দু'ধারে গাছগাছালি অথবা ডোবা-নালা। নদীর পাশেই ছিল একটা বাজার- সদরঘাট। আর ছিল একটা বড় বাজার। পাইকারি বাজারও ছিল, সেটি চকবাজারে। কিন্তু সিনেমা হল ছিল বেশ কয়েকটি। পাশে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গায় স্টিমার চলে। ছোট ছোট লঞ্চ আর বৈঠা টানা নৌকা। কোনো এক বিকেলে অল্প পয়সায় বুড়িগঙ্গায় ভ্রমণ করা যেত। ছিল ছোট-বড় অনেক পার্ক। শহর গড়ে উঠছে ঢিমেতালে নতুন ঢাকায়। মাটির রাস্তার ওপরে পিচ পড়েছে, কোথাও কংক্রিট। ধানমন্ডি, গুলশান গড়ে উঠেছে, দোতলা বা বড়জোর তিনতলা দালান দেখা যায়। তবে একতলা বাড়িই বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয় পাড়াটাও বেশ নয়নাভিরাম। গাছপালা মোড়ানো ছাত্রছাত্রীদের আবাসিক হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আর শহীদ মিনার পাশাপাশি। তার সামনেই পলাশ আর শিমুলগাছের সারি। নতুন ঢাকা শহর তখন তেমন জাগেনি। ফার্মগেট সত্যিই কৃষিরই জায়গা। খামারকে কেন্দ্র করে কয়েকটি লাল ইটের অফিস। শাহবাগে হোটেল গড়ে উঠেছে, একমাত্র আধুনিক হোটেল। ক্যান্টনমেন্ট তখনও ছিল, তবে বড় কোনো দালান নেই। কিছু ব্যারাক আর তেজগাঁও এলাকার শেষে একটা এয়ারপোর্ট। এয়ারপোর্টের দালানটাই শুধু তিনতলা। প্রবল শব্দে কিছু কিছু বিমান নামে-ওঠে। বসতি গড়ে উঠেছে ঢিমেতালে। কিন্তু গাছপালা কাটা পড়ছে না।

বুড়িগঙ্গার পাড় থেকে প্রাচীন শহরটা বেশ গাছপালার মধ্য দিয়ে- বিশাল বলধা গার্ডেন (বোটানিক্যাল গার্ডেনের আদলে)- চলে এসেছে রামকৃষ্ণ মিশন হয়ে সদ্য বর্ধিষ্ণু মতিঝিলের দিকে। এখানেই ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন, তখনকার বিখ্যাত লোকদের বাড়ি। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব ছিল না। ভিক্টোরিয়া পার্ককে ঘিরেই কয়েকটা কলেজ, স্কুল এবং তার মধ্যেই কালেক্টরের অফিস। দুটি নাট্যমঞ্চও ছিল- একটি মাহবুব আলী ইনস্টিটিউট, অন্যটি লালকুঠি। শখের থিয়েটার হতো সেখানে। রাত্রিযাপনের জন্য কিছু বোর্ডিং। এই বোর্ডিংগুলোর মধ্যে আবার রেস্টুরেন্টও ছিল। কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল বিউটি বোর্ডিং। মোগলাই খাবারের একটা বাহার ছিল এই শহরে। কাবাব, পরোটা, শাইলু পালোয়ানের বিরিয়ানি, হালুয়া, বাকরখানি ছাড়াও নানা ধরনের মিষ্টিজাত খাবার পাওয়া যেত। লাচ্ছি আর মাঠার সরবরাহ ছিল সব জায়গায়। তখনকার সেই অনুন্নত শহরটায়ও একটা মায়াবী জনপদের স্পর্শ পাওয়া যেত।

কিন্তু কলকাতার আদলে আমার বাবা প্রথমেই ঢাকাকে একটা শহর হিসেবে বাতিল করেছিলেন। প্রথম কথাটি হচ্ছে, শহরে হাইড্রেন নেই, ট্রাম নেই, আকাশচুম্বী অট্টালিকা নেই। হাওড়া, শিয়ালদহের মতো ব্যস্ত রেলস্টেশন নেই। নানা রঙের নানা ভাষার মানুষ নেই। উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি বলার এন্তার মানুষ নেই। তাই ঢাকাকে শহর না, একটা বড় গ্রাম বলতে পারো। আর কলকাতা হলো কসমোপলিটন শহর। যদিও ঢাকা শহর হিসেবে, রাজধানী হিসেবে কলকাতার চেয়েও পুরোনো। ঢাকার সবকিছু ছিল। প্রাসাদ, দালান, পয়ঃপ্রণালি, পানি নিস্কাশনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত বয়ন শিল্প মসলিন। ঢাকার পাশ দিয়েই চলে গেছে এক স্রোতস্বিনী, যেখানে মোগল আমলে নৌবাহিনীর বড় বড় নৌকা ভিড়ত। এখান থেকেই সপ্তডিঙ্গা মধুকর পৃথিবীর দূরতম গন্তব্যে চলে যেত। আওরঙ্গজেবের সময়ে এখান থেকে এক থেকে দেড় কোটি টাকার রাজস্ব যেত দিল্লিতে। মানুষের জীবনযাপনের ব্যয়ও ছিল আয় অনুযায়ী সুলভ।


প্রাকৃতিক নিয়মে ঢাকার সম্প্রসারণ শুরু হলো। মুক্তিযুদ্ধের পরেই মানুষের আসা শুরু হলো। ঢল নামল আশির দশকে। মেঠোপথে রাস্তা হলো। ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট থেকে একসময় নাম হলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), কিন্তু আধুনিক সভ্যতা নির্মাণে যে বাস্তুকলাবিদ বা স্থপতির নেতৃত্ব থাকে, তা থাকল না। পৃথিবীর সব দেশ ও শহরের একটা স্থাপত্য থাকে, যা ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, বিশিষ্ট নাগরিক, নিসর্গপ্রেমী, দূরদর্শী ও প্রভাবশালী মিলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে একটা দেশের চেহারা বের করে নিয়ে আসেন। এভাবেই লন্ডন, প্যারিস, মিউনিখ, রোম, মাদ্রিদ, লিসবনসহ পৃথিবীর বড় বড় শহর একেকটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণ আমেরিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যেও সেই স্বকীয়তা খুঁজে পাওয়া যায়। পাকিস্তান সরকার বিশ্বের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থপতিকে নিয়ে এলো, যার নাম লুই কান। ঢাকা শহরের একটা বড় জায়গাজুড়ে তিনি নির্মাণ করলেন দ্বিতীয় রাজধানী। সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রেখে একটা প্রায় মরুভূমির আদলে পরিকল্পনা করলেন এক ইন্দ্রপুরীর। জাতীয় কোনো সংস্কৃতির ধাঁচের মধ্যে রইল না। প্রশস্ত রাজপথ হলো বটে কিন্তু কোনো নিসর্গ তৈরি হলো না। তাদের সুযোগ ছিল যে চারুকলা ইনস্টিটিউট বা জাহাঙ্গীরনগরের মতো একটা কিছু করতে পারত, সেই সুযোগও মিলল না। ঐতিহ্য ভেঙেচুরে ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত বিভাগের আওতায় চলে গেল দেশ।

সব কিছুই ভাঙতে ভাঙতে এই শহরটাও হয়ে উঠেছে একটা জোড়াতালি দেওয়া জনপদ, যে জনপদে নাগরিকদের কোনো ভালোবাসা তৈরি হলো না। কোটি মানুষের এক নিছক আবাসস্থল, যার সঙ্গে একটাই যুক্ত হয়েছে, তা হলো জীবিকা এবং একশ্রেণির লোকের লুণ্ঠন। শুধু ঢাকার কেন্দ্রস্থলে নয়, আশপাশে যেসব জায়গায় জলাভূমি বা ফাঁকা জায়গা ছিল, সেগুলোও সুকৌশলে দখল করে গড়ে উঠছে কৃত্রিম শহর। লোহা আর ইটের সংমিশ্রণে একেকটা বিশাল দানবের মতো উচ্চবিত্তের আবাসস্থল গড়ে উঠেছে। ৩৩টি খালের সমন্বয়ে ঢাকা শহরে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের ব্যবস্থার বদলে করা হয়েছে পরিকল্পনাহীন রাজপথ। শহরের গৃহনির্মাণ কাজের দায়িত্ব পড়েছে রাজউকের কাছে। অবলীলায় তারা পান্থপথের মতো রাস্তায় বড় বড় হাসপাতাল, অফিস ও বিপণিকেন্দ্র অনুমোদন করে যাচ্ছে। তারা কখনও হিসাব করে না যে এই পথে কত রোগী ও তাঁর আত্মীয়স্বজন আসবেন, বিপণিকেন্দ্রে কত ক্রেতা আসবেন বা অফিসে কতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী আসবেন আর তাঁদের গাড়িগুলো কোথায় থাকবে? তাই পান্থপথ কখনোই যানজটমুক্ত থাকে না।

কিন্তু শহরকে এখনও বাঁচানো যায়। তার একটা বড় উদাহরণ হচ্ছে হাতিরঝিল। হাতিরঝিলের পরিকল্পনা ও নির্মাণ বহু যানবাহনের চাপ কমিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার একটা সহজ ব্যবস্থা করেছে। একটা বড় সৌন্দর্য হচ্ছে মাঝখানের লেকটি। সেখানেও মানুষ পানিপথে যাতায়াত করতে পারে। সরকার নদীদূষণ ও দখলমুক্ত করার জন্য একটি উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে। বর্তমানে তা স্তিমিত। ৩৩টি খালের মধ্যে অন্তত কয়েকটি খালকে মুক্ত করলেও শহরটি যানজটমুক্ত নয়নাভিরাম হতে পারে এবং পয়ঃপ্রণালি প্রাকৃতিক নিয়মে ফিরে যেতে পারে। এসব পরিকল্পনার জন্য চাই কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আজকে যদি একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয় যে এই শহরে ৩৩টি খাল উন্মুক্ত করা হবে, তার জন্য প্রয়োজনে সব স্থাপনা ভেঙে ফেলতে হবে। প্রভাবশালীদের চাপ এবং ভোট দুটিই হয়তো সামনে এসে দাঁড়াবে। কিন্তু আমাদের পরবর্তী বংশধররা বুঝবে তাদের পূর্বপুরুষরা অসাধারণ এক কাজ করে শহরটাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। বেশি দিন আগের কথা নয়, কলকাতা শহরের যানজট, ঘিঞ্জি এলাকায় যে কারও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যেত। মাত্র ৪০ বছরে ফ্লাইওভার তৈরি করে, পাতাল রেল বানিয়ে ট্রাফিক সিস্টেম কন্ট্রোল ও জলাশয়গুলো উদ্ধার করে শহরের জীবনযাপন পাল্টে দিয়েছে। ঢাকা শহরেও ফ্লাইওভার, আকাশপথে মেট্রোরেল হচ্ছে। কিন্তু যানজট কমার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আমাদের মতো জনবহুল দেশে পাতাল রেল ছিল একটা বড় সমাধান। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের হাতে দিয়ে সর্বনাশ হয়ে গেছে। তাঁরা তাঁদের সুবিধামতো পরিকল্পনা করেছেন, শহরের ভবিষ্যতের কথা ভাবেননি। এখানেই প্রয়োজন কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের। সরকারকে বলতে হবে- আমি এটা চাই, আপনারা তা করুন। এখানে আরেকটি কথা মনে রাখতে হবে- আমাদের দেশের আমলা, বিশেষজ্ঞ তাঁরা খুবই অভিবাসনমুখী, দেশকে বাসযোগ্য করার পরিবর্তে তাঁদের মাথায় সব সময়ই চিন্তা থাকে কখন কীভাবে বিদেশে সন্তান-সন্ততি নিয়ে জীবন কাটানো যায়। আমাদের সন্তানরা এই দেশে থেকে কী দুর্ভোগ পোহাতে পারে- এটা তাঁদের কল্পনাতেই নেই। এখনও শহরকে বাসযোগ্য করা সম্ভব। তা না হলে একসময়ে একে পরিত্যক্ত বলে ঘোষণা করতে হবে।

মামুনুর রশীদ: নাট্যব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×