ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনের বার্তা

ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনের বার্তা
×

ওয়েনরান জিয়াং

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৩৪

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরে আয়োজনের কোনো কমতি ছিল না। যেমন  বি-টু বোমারু বিমানের প্রদর্শনী, পান্ডা কূটনীতি থেকে শুরু করে নিক্সন আমলের ঢঙে নৈশভোজে দেওয়া পাত্র ছুঁইয়ে শুভেচ্ছা। তবে গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলোর চোখ দিয়ে যারা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন, তাদের কাছে এসব আনুষ্ঠানিকতা বা জাঁকজমক মূল বিষয় ছিল না। তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ অর্জনের ওপর জোর দেওয়া। রিয়াদ, নয়াদিল্লি থেকে শুরু করে জাকার্তার মতো রাজধানীগুলোর জন্য এই শীর্ষ সম্মেলন স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে– চলতি দশকের বাকিটা সময় তারা এ দুই পরাশক্তির সঙ্গে কীভাবে নিজেদের সম্পর্ক বজায় রেখে চলবে।

এই শীর্ষ সম্মেলন থেকে বেইজিং এমন এক অবস্থান নিয়ে বের হয়েছে, যেখানে তারা কোনো সামরিক ঝামেলায় না জড়িয়েই কূটনৈতিক সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। এর বিপরীতে ওয়াশিংটন ইরানবিরোধী সাত মাসের মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় এই বৈঠকে অংশ নিয়েছে। তারা মিত্রদের ওপর বাণিজ্যের চাপ সৃষ্টি করছিল; লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছিল এবং চীনকে ঠেকানোর অভিযানে বৈশ্বিক দক্ষিণকে তাদের পক্ষে যোগ দিতে বাধ্য করছিল। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে নৈশভোজ উপভোগ করেন এবং সম্মেলনকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে আখ্যা দেন। যেসব দেশের সরকারকে বেইজিং থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে, তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই বৈপরীত্য অগোচরে থাকবে না।

মধ্যপ্রাচ্য: চীনের বাড়তি সুবিধা

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই পার্থক্যটি সবচেয়ে স্পষ্ট। মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই কৌশলগত প্রণালি বন্ধ রয়েছে। ট্রাম্প চান, তেহরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন যেন হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে সহায়তা করে। প্রেসিডেন্ট শি অবশ্য যুদ্ধবিরতি এবং শেষ পর্যন্ত শান্তি আলোচনায় ফিরে আসায় সমর্থন জানিয়েছেন। তবে চীনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে প্রণালি খোলার ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি বা ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করা হয়নি। এতে স্পষ্ট, বেইজিং সব পরিস্থিতিতে নিজের সুবিধাজনক অবস্থান বজায় রাখতে চায়।

ইরাক, মিসর ও আলজেরিয়ার মতো দেশ যখন জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও নৌপথ অবরুদ্ধ হতে দেখছে, তখন চীনের এই সামরিক সংযম তাদের কাছে আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর এই যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার মতো নতুন কোনো পরাশক্তির প্রয়োজন নেই; তাদের এমন কাউকে প্রয়োজন, যিনি গুলি না চালিয়ে সব পক্ষের সঙ্গেই কথা বলতে পারেন। বেইজিং নিজেকে ঠিক সেই ভূমিকাতেই উপস্থাপন করছে।

ট্রাম্পের অনিশ্চয়তা সামলানো

বৈশ্বিক দক্ষিণের অন্যান্য সরকারের জন্য এটি এক কঠিন পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে। ট্রাম্প নিজে চীনের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ বাড়ালেও এই দেশগুলোকে চীন থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিং নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ দুই মাসের জন্য স্থগিত রাখলেও এই দেশগুলোকে শুল্ক ও সরবরাহ ব্যবস্থার ধাক্কা সহ্য করতে বলা হচ্ছে। এর ফলে একটি ধারণা জোরালো হচ্ছে, পরাশক্তির দ্বন্দ্বের খেসারত অন্য দেশগুলোকে দিতে হবে, আর ওয়াশিংটন ও বেইজিং নিজেদের মধ্যে দরকষাকষির পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে। এর প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে দৃশ্যমান।

ভারত তার বহুপক্ষীয় ভারসাম্য বজায় রাখার নীতিকে আরও জোরদার করছে। তারা একদিকে রাশিয়ার তেল কিনছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রযুক্তি ও চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানাচ্ছে। বেইজিংয়ের শর্তে এই পরাশক্তির লড়াই মানেই কিন্তু বিশ্বশান্তি নয়। তবে রিয়াদ থেকে জাকার্তা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের জন্য ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানটি নিজেদের অবস্থান শক্ত করা এবং নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের সুযোগ এনে দিতে পারে। আসল চ্যালেঞ্জ হলো, এ দুই দেশের ভবিষ্যৎ কোনো চুক্তি যেন বাকি বিশ্বকে কেবল ক্ষতির মুখেই ফেলে না দেয়।

ওয়েনরান জিয়াং: আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়না ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং ম্যাকটাগার্ট রিসার্চ চেয়ার ইমেরিটাস; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×