আন্তর্জাতিক
উপনিবেশ-উত্তর ব্রিটিশ রাজার চ্যালেঞ্জ
ঈশান থারুর
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৮ মে ২০২৩ | ১৯:০৫
ক্যারিবিয়ান দেশ বার্বাডোস ২০২১ সালের নভেম্বরে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ মুকুট ত্যাগ করেছিল, তখন সেখানে রাজকীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন প্রিন্স চার্লস। ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর সেই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশটি সংসদীয় প্রজাতন্ত্র হিসেবে নতুন পথচলা শুরু করেছিল। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের পরিবর্তে দেশটি নতুন রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্ত করে। ওই অনুষ্ঠানে সেখানে চার্লস তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘অতীতের অন্ধকারতম দিন এবং দাসত্বের ভয়ঙ্কর নৃশংসতার পরও এই দ্বীপের মানুষ অসাধারণ দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের পথ তৈরি করেছে।’ তিনি বলেছিলেন, ‘মুক্তি, স্বশাসন এবং স্বাধীনতা আপনাদের পথ। স্বাধীনচেতা, ন্যায়বিচার এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ আপনাদের পথপ্রদর্শক।’ তাঁর বক্তব্যে দর্শকরা মুগ্ধ হয়েছিল। হাউস অব লর্ডসের একমাত্র বার্বাডিয়ান সাইমন উলি সেই সময় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তাঁর বক্তৃতা ‘ভবিষ্যতের রাজারই ইঙ্গিতবহ’।
দুই বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে তৃতীয় চার্লস এখন আর ‘ভবিষ্যৎ রাজা’ নন; গত বছর সেপ্টেম্বরে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর রাজা হয়েছেন। ইতোমধ্যে তাঁর অভিষেক সম্পন্ন হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী বছরগুলোতে তাঁর আনুষ্ঠানিক রাজতন্ত্রের আওতাভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে কীভাবে স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে কথা বলেন।
কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য মেনে শনিবার অভিষেক অনুষ্ঠানে তৃতীয় চালর্স পেয়েছেন নিরেট স্বর্ণ নির্মিত মুকুট, সিংহাসন, রাজদণ্ড, রত্নখচিত তরবারি, পবিত্র তৈলদানি ইত্যাদি। আবার অনুষ্ঠানটি অতীতে সম্পূর্ণরূপে ইংল্যান্ডের খ্রিষ্টান চার্চের বিষয় হলেও এবার বৌদ্ধ, হিন্দু, ইহুদি, মুসলিম ও শিখ নেতারাও চার্লসকে প্রতীকী নজরানা দিয়েছেন। প্রথমবারের মতো উপস্থিত ছিলেন নারী বিশপ। বাকিংহাম প্রাসাদে সাত দশকের মধ্যে প্রথম রাজ্যাভিষেকে নম্র স্বভাবের নতুন রাজা বলেছেন: ‘সেবা নিতে আসিনি; সেবা করতে এসেছি।’
‘কুইন কনসোর্ট’ ক্যামিলার জন্য নির্ধারিত মুকুটে স্থাপিত কোহিনূর হীরা ঘিরেও রয়েছে স্পর্শকাতরতা। দক্ষিণ এশিয়ার এই বিখ্যাত রত্ন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে পরিচালিত জবরদস্তি ও লুটপাটের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে ব্রিটেনের পরিবর্তিত বাস্তবতা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী এবং স্কটল্যান্ডের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ফার্স্ট মিনিস্টার। ১৯৫৩ সালে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিংহাসনে আরোহণের সময় এমনটি ছিল অকল্পনীয়।
চার্লস এমন একটি কমনওয়েলথের প্রধান হিসেবে ভূমিকা রাখতে যাচ্ছেন, যার প্রাসঙ্গিকতাও দ্রুত ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ক্যারিবীয় দেশগুলোর একটি অংশ বার্বাডোসের পথ অনুসরণ করে নিজেদেরকে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করার ঘোষণা দিয়েছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও রাজতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করছে। এসব দেশের নতুন মুদ্রায় চার্লসের ছবি শোভা নাও পেতে পারে।
রাজতন্ত্রের অপকর্মগুলো সাম্প্রতিক সময়ে জোরালোভাবে সামনে আসছে। গত মাসে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্রিটিশ রাজপরিবার ১৭ শতকে ক্রীতদাস বিক্রি থেকে সরাসরি লাভবান হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় বাকিংহাম প্যালেস ঘোষণা করেছে, ব্রিটিশ রাজতন্ত্র এবং ১৭-১৮ শতকের আটলান্টিক ঘিরে যে ক্রীতদাস বাণিজ্য গড়ে উঠেছিল, সে বিষয়ে অনুসন্ধান ও গবেষণায় সরাসরি সহায়তা করা হবে। চার্লস হতে পারেন ব্রিটেনের প্রথম উত্তর-ঔপনিবেশিক সেই রাজা, যিনি ইতোপূর্বে ঔপনিবেশিক সময়ে তাঁদের অন্যায়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী হতে পারেন। সেই কাজটি বার্বাডোস থেকে সূচিত হয়ে তা অব্যাহত থাকতে পারে।
ভারতে দ্রুত রাষ্ট্রীয় সফরে যাওয়ার কথা বলেছেন চার্লস। এ সফরের মাধ্যমে এক সময় ব্রিটেনের সবচেয়ে মূল্যবান উপনিবেশের সঙ্গে ব্রিটিশদের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে প্রয়োজনে রাজাকেও অতীতের অপরাধের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হতে পারে।
ক্ষমা চাওয়ার রাজনীতি জটিল। তা ছাড়া ব্রিটিশ সরকারগুলো দাসত্বসহ পূর্বসূরিদের ঐতিহাসিক অপরাধের জন্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিকে ক্রমাগতভাবে উপেক্ষা করে আসছে। অন্তত একটি জরিপ অনুসারে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রিটিশরা বিশ্বাস করে– দাসপ্রথা এবং ঔপনিবেশিকতার বিস্তারে রাজপরিবারের ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য চার্লসের প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত নয়। চার্লস নিজেও ব্যক্তিগত জীবনে আটপৌরে বর্ণবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত।
কিছু বিশ্লেষক রূপান্তরকারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে চার্লসের ক্ষমতা সম্পর্কে আশাবাদী। যেমন নিউ ইউরোপিয়ান পত্রিকার সম্পাদক ম্যাথু ডি’অ্যাঙ্কোনা লিখেছেন– এটি কেউ কেউ ভেবেছিল যে, ৭৩ বছর বয়সে রাজা হওয়া চার্লসকে সম্ভাব্য অপ্রতিরোধ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। আসলে বিপরীতটিই প্রমাণিত হয়েছে, অন্তত এ পর্যন্ত। তিনি জনসাধারণের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে জনপ্রিয়। অন্যরা অবশ্য অতটা নিশ্চিত নন। কানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ জাস্টিন ভভকের প্রশ্ন– নতুন রাজা কি আরও শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কমনওয়েলথ গড়ে তুলতে সাহায্য করবেন? একজন বয়স্ক শ্বেতাঙ্গের পক্ষেও কি তা করা সম্ভব হবে, যা অনেকের কাছে দমন, বিশেষাধিকার এবং ঔপনিবেশিকতার প্রতীক?
ঈশান থারুর: ওয়াশিংটন পোস্টের বিদেশবিষয়ক কলাম লেখক; দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ঈষৎ সংক্ষেপে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক
- ঈশান থারুর