ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতি

বিএনপির আন্দোলনের হিসাবে নতুন গরমিল

বিএনপির আন্দোলনের হিসাবে নতুন গরমিল
×

মারুফ মল্লিক

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৮ মে ২০২৩ | ১৯:০৫

রাজনীতির মাঠে কাছাকাছি সময়ে দুটো সংবাদ মিলল। প্রথমটি, আবারও আন্দোলন কর্মসূচির কথা ভাবছে বিএনপি। উদ্দেশ্য– সরকারের পদত্যাগসহ ১০ দফা দাবি আদায়। দ্বিতীয়টি, গণঅধিকার পরিষদ আচমকা গণতন্ত্র মঞ্চ নামের জোট ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে। দুটি ঘটনাই নতুন বিচার-বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বিএনপি, গণতন্ত্র মঞ্চ ও গণঅধিকার পরিষদ– সবাই যখন সরকারবিরোধী, তখন এই অনৈক্যের কারণ কী? বিএনপি কি শেষ পর্যন্ত সরকারবিরোধী আন্দোলনে সফল হবে? গণঅধিকার পরিষদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই বা কী?

গণঅধিকার পরিষদের সিদ্ধান্ত আন্দোলনে বিভাজন সৃষ্টি করবে? স্তিমিত করে দেবে প্রতিবাদের মনোভাব? শেষ পর্যন্ত গণঅধিকার পরিষদ কি সরকারবিরোধী আন্দোলনে থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ঘটনা সতর্কতার সঙ্গে বিচার-বিশ্লেষণও জরুরি।

গত ডিসেম্বরে পল্টনে সমাবেশ করা থেকে পিছু হটার পর বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপি আবারও নেতাকর্মীকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। এর আগে বিভাগীয় সমাবেশ করে বেশ সাড়া ফেলেছিল দলটি। ওই সমাবেশগুলোতে জনসমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ সমর্থক বিশেষত নিম্নবর্গের মানুষ হেঁটে, সাইকেলে, নৌকায় করে সমাবেশগুলোতে যোগ দিয়েছিল। কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বিএনপির ১৭ নেতাকর্মী পুলিশের গুলিতে নিহতও হলো। তাদের বেশিরভাগই  ছিল দিনমজুর ও খেটে খাওয়া। ফলে, দেখা যাচ্ছে বিএনপির সমাবেশগুলোর মাধ্যমে নতুন করে রাজনীতির শ্রেণিবিন্যাস ঘটছে। আর্থিক দুরবস্থা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, দুর্নীতি, লুটপাটের কারণে নিম্নবর্গের মানুষ সরকারবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিচ্ছে। সব মজলুম, নির্যাতিত ও বঞ্চিত এক মঞ্চে এসে উপস্থিত হতে চাইছে। যদিও বিএনপি এসব মানুষের জন্য বিশেষ কোনো কর্মসূচি দিতে পারেনি; আন্দোলনের সেই গতি ধরেও রাখতে পারেনি।

অনেকের মতে, বিএনপি গত ডিসেম্বরে জোরালো আন্দোলন করে শক্তি ক্ষয় করতে চায়নি। সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে তারা শক্তভাবে চাপ সৃষ্টি করতে চায়। যদি তা-ই হয়, তবে অবধারিতভাবে দুটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে। প্রথমটি হচ্ছে, সরকারকে মেয়াদ পূর্ণ করার সুযোগ তাহলে বিএনপিই করে দিয়েছে? কারণ, আন্দোলনরত দলটির কাছে তো প্রতিটি মুহূর্তই শেষ সময় হওয়ার কথা। কারণ, তারাই অভিযোগ করেছে– এই সরকার জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে। তাই যদি হয়, আরও সময় দেওয়া মানে, এই সরকারকে মেনে নেওয়া। দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, যদি শেষ সময়ের জন্য শক্তি সঞ্চয়ই করে রাখতে হয়; অযথাই কর্মসূচি ঘোষণা করে পুলিশের গুলির মুখে কর্মীদের ঠেলে দেওয়া কেন? অথচ বিএনপির আন্দোলন, সমাবেশে জনসমাগমের কোনো সংকট হচ্ছে না। সম্প্রতি মে দিবসে শ্রমিক দলের মিছিল ও সমাবেশেও বিপুল জনসমাগম হয়েছে। লাগাতার হামলা, মামলা ও নানাবিধ হয়রানির পরও লোকজন সমাবেশে আসছে। তাই বিএনপিকে এ দুই প্রশ্নের মীমাংসা করেই নতুন কর্মসূচির দিকে এগোতে হবে।

নতুন করে আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি বিভিন্ন শহরে রোড মার্চের মাধ্যমে ‘চল চল ঢাকা চল’ কর্মসূচির ঘোষণা দিতে পারে। নেতাকর্মী যে কোনোভাবেই হোক ঢাকা চলে আসবে। এমন উদাহরণ আছে। গত বছর বিভাগীয় সমাবেশগুলোতে কোনোভাবেই মানুষকে আটকে রাখা যায়নি। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে দুই-এক দিন আগেই সমাবেশস্থলের দখল নিয়েছে নেতাকর্মী। ঢাকায় সমাবেশের কয়েক দিন আগেই কয়েক লাখ মানুষ চলে এসেছিল। ওই সময় ঢাকায় ৬ লাখের মতো নতুন মোবাইল সিমকার্ড প্রবেশ করেছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর। কিন্তু বিশাল জনসমাগম বিএনপি কাজে লাগাতে পারেনি। বরং সরকারের চাপে নমনীয় হয়ে সমাবেশস্থল পর্যন্ত পরিবর্তন করেছিল। এর পরই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।

বর্তমান সরকারকে হটাতে এর আগেও বিএনপি একাধিকবার আন্দোলন করেছে। লাগাতার অবরোধ ও হরতালের মতো কর্মসূচি দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সুবিধা করতে পারেনি। কিন্তু এখন রাজনীতির এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে দলটি। অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণের প্রতি তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য আছে। জনগণেরও দলটির প্রতি আছে আশা-ভরসা। সেই জায়গা থেকেই সমাবেশে জনসাধারণ আসছে। বিএনপি নেতৃত্বকে জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় রেখে এবং অতীতের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণে সবাইকে এক মঞ্চে নিয়ে আসতে হবে।

উপরিউক্ত দুটি প্রশ্নের মীমাংসার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কর্মপরিধি আরও বাড়াতে হবে বিএনপিকে। গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় নিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন পরিসরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের উদ্যোগে এসব বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিএনপিকেও এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। কিন্তু দলটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারছে না। বরাবরই এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ থেকে পিছিয়ে আছে। বিএনপিকে সফল হতে হলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সফল হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

জোট ও যুগপৎ আন্দোলন নিয়ে বিএনপিকে আরও সতর্ক ও কৌশলী হতে হবে। গণতন্ত্র মঞ্চ ও বিএনপি যুগপৎ কর্মসূচি পালন করছে। অথচ গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে গণঅধিকার পরিষদ বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গণঅধিকার পরিষদ এখনও প্রভাবশালী দলে পরিণত না হওয়ায় এই ঘোষণায় আন্দোলনের খুব একটা ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। ক্ষুদ্র স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তারা বরং বৃহৎ স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। 

জোটের রাজনীতিতে নানা টানাপোড়েন থাকেই। গণতন্ত্র মঞ্চের ভেতরেও তা থাকা স্বাভাবিক। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে থাকলেও মঞ্চে গণঅধিকার পরিষদই বড় দল; সভা-সমাবেশে তাদের নেতাকর্মীর সংখ্যাও বেশি। কিন্তু মনে রাখা উচিত ছিল, এই মঞ্চ আরও বৃহত্তর লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে। কে কার আগে বক্তৃতা দিল বা কে কোথায় বসল বা সমাবেশে কাদের লোক বেশি– এসব নিয়ে তর্ক করার সময় এখন না। বরং মঞ্চ ভাঙার দায়িত্ব নিয়ে গণঅধিকার পরিষদ ভবিষ্যতে নানা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

বস্তুত এরই মধ্যে গণঅধিকার পরিষদ নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। কথিত ইসরায়েলি এক ব্যবসায়ী ও গোয়েন্দার সঙ্গে দেখা করে চট্টগ্রাম বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী এখনও জেলে। আর গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক নুর ওই ইসরায়েলি ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করে দিব্যি রাজনীতি করে বেড়াচ্ছেন। ফলে রাজনীতির এই সন্ধিক্ষণে মঞ্চ ত্যাগের কারণে সন্দেহ আরও দানা বাঁধবে। এমনও কি হতে পারে– শেষ পর্যন্ত গণঅধিকার পরিষদ সরকারবিরোধী আন্দোলন থেকেই সরে গেল? বিএনপিসহ বিভিন্ন দল থেকে বঞ্চিত ও অবমূল্যায়িত অনেকেই গণঅধিকার পরিষদে যোগ দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন– এই সম্ভাবনা কিংবা আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এখন বিএনপিকে সব দিক বিবেচনায় এনেই আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কঠিন বাঁকে দাঁড়িয়ে দলটি। ২০১৪, ’১৮ এবং ’২৩ সাল এক নয়। এবার বিএনপি সফল হতে না পারলে দল হিসেবে সংকটের মুখে পড়তে পারে। আর সেই সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিনই হবে। প্রকৃত অর্থেই আন্দোলনের শেষ সুযোগ ধরে নিয়ে বিএনপিকে পথে নামতে হবে এবার।

ড. মারুফ মল্লিক: লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×