রোহিঙ্গা
প্রত্যাবাসনের প্রশ্ন সংখ্যার নয়, নাগরিকত্বের
এনায়েত এইচ জাকারিয়া
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৫ দফা প্রস্তাব দিয়ে বলেছেন, এখন বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে যাওয়ার সময়। প্রশ্ন হলো, সেই অবসান কোন শর্তে হবে? উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে একজন রোহিঙ্গা মন্ত্রীর গল্পে।
বার্মার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নাম ছিল সুলতান মাহমুদ। এই রোহিঙ্গা নেতা ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী উ নু-র মন্ত্রিসভায় ছিলেন। ১৯৫১ সালের সংসদে রোহিঙ্গা সদস্য ছিলেন পাঁচজন, ১৯৫৬ সালে ছয়জন। সুলতান মাহমুদ মারা যান ১৯৮২ সালে, যে বছর বার্মা নতুন নাগরিকত্ব আইন করে তাঁর জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রহীন করে দেয়!
প্রত্যাবাসন সম্ভব– বাংলাদেশ তা করে দেখিয়েছে
১৯৭৮ সালে ‘নাগামিন’ অভিযানে দুই থেকে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার তখন একসঙ্গে তিন পথে এগিয়েছিল: সর্বোচ্চ পর্যায়ে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, ওয়ার্ল্ড ইসলামিক লিগসহ মুসলিম বিশ্বের সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন। ফল এসেছিল দ্রুতই। ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ফিরে যায় এক লাখ ৮৭ হাজার ২৫০ জন। তবে কাগজ নেই– এই যুক্তিতে ২৮ হাজার ৭৭৫ জনের ছাড়পত্র আটকে থাকে। আর চার বছরের মাথায় ১৯৮২ সালের আইনে রোহিঙ্গাদের নাম না থাকায় ১৯৯১-৯২ সালে আবার প্রায় আড়াই লাখ মানুষ আসে। তাদের অধিকাংশ ফিরেও যায়, কিন্তু আবারও সেই আইনি শূন্যতায়। মানুষ ফেরানো হয়েছিল, মর্যাদা ফেরানো হয়নি। সেই ব্যর্থতারই পরিণতি তৃতীয় দফা।
৯ বছরে একজনও ফেরেনি, তবে…
২০১৭ সালের পর সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আসে। সে বছরের সমঝোতার দলিলে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিই ছিল না। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুবার প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি হয়; কেউ ফেরেনি। উল্টো ২০২৪ সাল থেকে এসেছে আরও প্রায় দেড় লাখ। বাস্তবতাও বদলেছে। রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের ১৪টি এখন আরাকান আর্মির হাতে; বাংলাদেশ সীমান্তের পুরো ২৭০ কিলোমিটারও। যে সরকার যাচাই-তালিকা বানাচ্ছে, ফেরার ভূখণ্ড তার নিয়ন্ত্রণে নেই। তবু আশার জায়গা আছে, আগস্টে মিয়ানমার প্রথমবারের মতো প্রায় তিন লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইনের ‘সাবেক বাসিন্দা’ হিসেবে স্বীকার করেছে। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে প্রত্যাবাসনের একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপের দাবিও তুলেছেন। চাপের সব উপাদান এখন টেবিলে। প্রয়োজন সেগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলে গেঁথে ফেলা।
চীন ও জাতিসংঘকে প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে আনতে হবে
এই কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার চীন। বেইজিং একমাত্র শক্তি, যার প্রভাব জান্তা ও আরাকান আর্মি, দুই পক্ষের ওপরেই কার্যকর। রাখাইনে চীনের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ইউনান পর্যন্ত তেল-গ্যাস পাইপলাইন রয়েছে। আরাকান আর্মি নিজেই চীনা বিনিয়োগ সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছে। বাংলাদেশের উচিত চীনকে শুধু মধ্যস্থতাকারী নয়, প্রত্যাবাসন কাঠামোর নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে যুক্ত করা, যেখানে জান্তা ও আরাকান আর্মি, দুই পক্ষই ফেরত আসা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও অধিকারের দায় নেবে। একই সঙ্গে জাতিসংঘকেও দায়িত্ব নিতে হবে। ৯ বছর জাতিসংঘের সংস্থাগুলো মূলত ত্রাণ দিয়েছে। কাজটি অপরিহার্য, কিন্তু ত্রাণই সমাধান নয়। রোহিঙ্গারা জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত। তাদের ফিরিয়ে দেওয়া বিশ্বের দায়; বাংলাদেশের একার নয়।
গাম্বিয়ার পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে
বিচারের পথে সর্ববৃহৎ মিত্র গাম্বিয়া। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে দুই দেশ যৌথভাবে রোহিঙ্গাবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের সভার আয়োজন করেছে, যা ইতিবাচক সূচনা। একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। ক্যাম্পের জন্মনিবন্ধন, পরিবারভিত্তিক তথ্যভান্ডার, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের তালিকা ও মিয়ানমারের পুরোনো পরিচয়পত্রের মতো যেসব নথি বাংলাদেশের হাতে আছে, সেগুলো সুসংগঠিতভাবে গাম্বিয়ার আইনি দল, জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত সংস্থা (আইআইএমএম) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য একটি স্থায়ী সমন্বয় কাঠামো দরকার। আইসিজের রায় এলে তার বাস্তবায়ন ও ক্ষতিপূরণ প্রশ্নেও এসব নথি অপরিহার্য হবে। বিচার যত শক্ত হবে, মিয়ানমারের ওপর চাপ তত বাড়বে।
দাবির ভাষা বদলাতে হবে
দাবিটি হতে হবে সংখ্যা নয়; মর্যাদার। কতজন ফিরবে– তা নয়; কোন মর্যাদায় ফিরবে। ‘সাবেক বাসিন্দা’ স্বীকৃতি সূচনা মাত্র। কিন্তু অতীতের বসবাস একটি তথ্য, আর নাগরিকত্ব একটি অধিকার। প্রতিটি আলোচনায় লিখিত শর্ত থাকা দরকার– যাচাই তালিকা নাগরিকত্বের পথে একটি ধাপ। নইলে প্রত্যাবাসন মানে আবার ১৯৮২-পরবর্তী অবস্থায় ফেরত পাঠানো, আর চতুর্থ দফার বীজ বপন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে তাঁর পিতার দৃষ্টান্ত আছে। যিনি প্রমাণ করেছিলেন, দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর বহুমুখী কূটনীতি থাকলে কম সময়ে প্রত্যাবাসন সম্ভব। সেই পথ অনুসরণের সুযোগ এখন প্রধানমন্ত্রীর সামনে।
এনায়েত এইচ জাকারিয়া: উন্নয়নকর্মী ও
জননীতি বিশ্লেষক
- বিষয় :
- রোহিঙ্গা