ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিশুশ্রম

৪৭ লাখ শিশু শ্রমিক: ঘোষণা ও বাস্তবতা

৪৭ লাখ শিশু শ্রমিক: ঘোষণা ও বাস্তবতা
×

মো. ছাদেকুল আরেফিন

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৩ | ১৮:০০

গত ১২ জুন ছিল বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। ২০০২ সালে দিবসটি পালন শুরু করে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। এ বছর দিবসটির বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য– ‘সবার জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার: শিশুশ্রমের অবসান ঘটান!’ গত বছরও প্রায় একই প্রতিপাদ্য ‘সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করি, শিশুশ্রম বন্ধ করি’ নিয়ে দিবসটি পালিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে শিশুশ্রম বন্ধ দূরের কথা; ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধের সরকারি ঘোষণা প্রায় কেতাবেই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এ ‘শিশু’ বলতে ১৪ বছর বয়স পূর্ণ করেনি এমন মানুষকে বোঝায়। ১৪ থেকে ১৮ বছরের নিচের বয়সীদের ‘কিশোর’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০ অনুসারে, শিশুদের আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্র কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। ক্ষেত্রবিশেষ চিকিৎসকের কাছ থেকে শিশু-কিশোরদের সক্ষমতা সনদ নিয়ে শর্তসাপেক্ষে হালকা কাজে নিয়োগ দেওয়া যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকার সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না, কত সংখ্যক শিশু-কিশোর বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত। ফলে এ সংক্রান্ত নীতি বা আইন যে কেতাবেই রয়ে গেল, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

২০১৩ সালে পরিচালিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষা, যা ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি চূড়ান্ত হয়, সেখানে বলা হয়েছে– বাংলাদেশে কর্মরত শিশুর সংখ্যা সাড়ে ৩৪ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ শিশুর কাজ শিশুশ্রমের আওতায় পড়েছে। কর্মরত শিশুদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ১২ লাখ ৮০ হাজার। আর ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ কাউন্সিল ও লেবার রাইটস সাংবাদিক ফোরাম (আইটিইউসি) জানিয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৪৭ লাখ।

আসলে দেশের সর্বক্ষেত্রেই, বিশেষ করে বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে শিশুশ্রমের উপস্থিতি লক্ষণীয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ছোট ছোট কারখানা, মোটরযান মেরামতের প্রতিষ্ঠান, খাবার হোটেল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে অনেকাংশে শিশু শ্রমিকের প্রাধান্য দেখা যায়। আরও উদ্বেগের বিষয়, এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের মৌলিক প্রয়োজনের ওপর গুরুত্ব আরোপ নেই বললেই চলে। শিশুদের মৌলিক প্রয়োজনের মূল বিষয় হলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান। এ ছাড়া শিশুদের সুষম খাবার, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, সুস্থ সামাজিকীকরণ, নৈতিক শিক্ষা, নির্যাতন থেকে সুরক্ষা, চিত্তবিনোদন প্রভৃতির নিশ্চিতিই শিশুদের মৌলিক প্রয়োজন।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ পর্যন্ত ৪৩টি কাজকে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে। এগুলোর মধ্যে অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিক কারখানা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোর অন্তর্ভুক্ত। কারণ এ ধরনের কারখানায় কাজ করলে শিশুদের নিউমোনিয়া, কাশি, আঙুলে দাদ, দুর্ঘটনাজনিত দৈহিক ক্ষত, ফুসফুসে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, হাঁপানি, যকৃতের দুরারোগ্য ব্যাধি, মূত্রাশয়ে ক্যান্সারের মতো রোগ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অথচ, শিশু শ্রমিকে পূর্ণ এ ধরনের প্রচুর কারখানা খোদ রাজধানীতে কর্তাব্যক্তিদের একেবারে নাকের ডগায় বছরের পর বছর কার্যক্রম চালাচ্ছে।

শিশুশ্রমের প্রাবল্যের সঙ্গে যে দারিদ্র্যের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়– তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অশিক্ষা, সচেতনতার অভাব নিশ্চিতভাবে দায়ী। বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, যশোর ও খুলনায় ৩৩ হাজার শিশু শ্রমিকের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে উঠে আসে, কাজ ছেড়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল– এমন আড়াই হাজার শিশু করোনাকালে আবার কাজে ফিরে গেছে। আগের চেয়ে কম পারিশ্রমিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হয়েছে ২ হাজার ৪০০ শিশু।

ইদানীং শুরু হয়েছে কিশোর গ্যাং নামক উপদ্রব। জড়িতদের মধ্যে মধ্যবিত্তের চেয়ে দরিদ্র শিশুরাই বেশি। এটা শিশুশ্রম নামক মুদ্রার অপর পিঠের চিত্র। শিশুশ্রম থাকলে শিশুদের অপরাধীকরণও থাকবে। একই সঙ্গে চলছে শিশু-কিশোরদের মাদক সেবন এবং মাদক ব্যবসায় তাদের ব্যবহার। শিশু-কিশোরদের মৌল চাহিদা, খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিকাশ নিশ্চিত করার উপযুক্ত কর্মসূচির অনুপস্থিতি যে এ সমস্যাগুলো উদ্ভবের জন্য দায়ী– তা অস্বীকার করা যাবে না। সেই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নও সমস্যাগুলোর বাড়বাড়ন্তের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

দেশে ১৮ বছরের নিচে রয়েছে জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অংশ, যারা আগামীতে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিষয়টা সরকারও জানে। এ কারণেই ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারের শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্য রয়েছে। কাজ যে কিছুই হয়নি, তা নয়। ৩৮টি খাত থেকে এখন পর্যন্ত রপ্তানিমুখী পোশাক খাতসহ আটটিকে শিশুশ্রমমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু শিশুশ্রমের প্রায় অভয়ারণ্য বলে যে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত আছে, সেখানে খুব কমই কাজ হয়েছে।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে শিশুশ্রমমুক্ত করতে হলে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ ধরনের শ্রমের নেতিবাচক ফল সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধানে সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে যে জনমত গড়ে উঠবে, তা-ই এক সময় সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হবে। এ জন্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিভিন্ন শক্তির সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কাজটার নেতৃত্ব সরকারকেই দিতে হবে। শিশুদের কল্যাণ এবং জাতির ভবিষ্যৎ বিবেচনায় এত যে নীতি ও আইন করা হয়েছে, সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়নও উপেক্ষিত থাকা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর ধারাবাহিক নজরদারি থাকতে হবে। যে সময় শিশুর স্কুলে যাওয়ার কথা, সে সময় এত শিশু-কিশোর স্কুলের বাইরে থাকে কীভাবে? এ ক্ষেত্রে অভিভাবক ও মালিকপক্ষকে সচেতন করতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে সরকারকে। যে শিশুরা শ্রমে নিয়োজিত আছে, তাদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন: উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×