ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জয়শঙ্করের মন্তব্য

প্রতিবেশীদের নতুন দৃষ্টিতে দেখছে ভারত

প্রতিবেশীদের নতুন দৃষ্টিতে দেখছে ভারত
×

এম. হুমায়ুন কবির

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর শুক্রবার দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে কিছু বক্তব্য দেন। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, সেখানে তিনি বলেছেন– ‘৯ বছরে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের মধ্যে আকাশ-পাতাল পরিবর্তন এসেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সব রাজনৈতিক দল ও সব সরকারের সঙ্গে একভাবে কাজ করার ক্ষমতা ও দক্ষতা আজকের ভারত আয়ত্ত করেছে। প্রতিবেশীদেরও এভাবে গড়ে তুলতে ভারত সচেষ্ট।’

বক্তব্যটি জয়শঙ্করের নিজস্ব বলেই আমি বিশ্বাস করছি। তাঁর এ বক্তব্য খুবই যথার্থ বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। এই বক্তব্যকে যদি আমি একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখি; যদি আঞ্চলিক সহায়তার ক্ষেত্রে সত্যিই এমনটা ঘটে, তাহলে এটাকে আমি বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিহিত করতে পারব।  
আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা আশাব্যঞ্জক কথা। কেননা, ভারত এখন যে পর্যায়ে যেতে চাইছে, তা অর্জনে এ বক্তব্য সহায়ক হবে। বিশ্বপরিমণ্ডলে ভারত একটি অবস্থান তৈরি করতে চাচ্ছে। সে কারণে তাদের আগ্রহ এখন বিশ্বের দিকে। বিশেষ করে আগামী সেপ্টেম্বরে জি-২২ সম্মেলনের মতো ইভেন্ট রয়েছে, যা ভারতে অনুষ্ঠিত হবে। তারা এখন সেদিকেই মনোযোগ দিতে চাইছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এখন নিজের সম্পর্কে ধারণা এই যে, তিনি নিজেকে একজন বিশ্বনেতায় পরিণত করবেন। সেদিকেই এখন দৃষ্টি রাখতে চাইছেন নরেন্দ্র মোদি। বিশ্বনেতা হতে চাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নিজের একটি শক্ত ও ইতিবাচক অবস্থান বজায় রাখতে চান। এসব ঘটনার সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য সংগতিপূর্ণ বলেই মনে হয়। এর ফলে তাঁরা প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি মনোযোগ দেওয়ার ধরনের ক্ষেত্রে বদল আনতে চলেছেন, বলা যায়। আমার বিবেচনায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের এটি একটি দিক হতে পারে।

জয়শঙ্করের বক্তব্যের দ্বিতীয় যে জায়গাটি হতে পারে তা হলো, ভারতের বিরুদ্ধে বহু দিন ধরে অনেক প্রতিবেশী দেশেরই অভিযোগ– তারা প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনেক বেশি সক্রিয় থাকে। এটা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণের মধ্যে ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। সেদিক থেকে ভারতের বর্তমান প্রত্যাশা, যা জয়শঙ্করের বক্তব্যে উঠে এসেছে, এ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনবে বলে আমার বিশ্বাস। যদি এ প্রত্যাশা অনুসারে ভারত সরকার প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে একটি সুষম এবং ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, তার ফল ইতিবাচক হবে বলে আমি মনে করি। একই সঙ্গে এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যে ইতিবাচক দিকগুলো আছে, সেগুলো আরও সমৃদ্ধ হবে বলে আমি মনে করি। এর ফলে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যতটা শক্তিশালী হবে, তার চেয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর গণতন্ত্র আরও বেশি শক্তিশালী হবে বলে মনে করি। এতে আঞ্চলিকভাবে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা যায়।
উল্লেখ্য, নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত অবশ্য সবচেয়ে কম জড়িয়েছে। প্রতিবেশীদের কাছে এখন ভারতের পরিচয় তাই স্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে গেছে।


জয়শঙ্কর আরও বলেছেন, ‘সুপ্রতিবেশী এমনি এমনি হয় না। প্রতিবেশীকে তখনই কাছে পাওয়া যায়, যখন বড় শক্তিধর দেশ প্রতিবেশী দেশে লগ্নি করে। তাদের ভালো-মন্দের অংশীদার হয়। সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়। আমরা ঠিক সেটাই করতে চেয়েছি।’ তাঁর এ বক্তব্যও মূল্যবান।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। তিস্তা চুক্তি না হওয়া বাংলাদেশের পক্ষে অপ্রাপ্তির অবশ্যই। কিন্তু এটা ধরে বসে থাকলে চলবে না। এ অঞ্চলে আরও ৫৪টি নদী আছে। মাত্র একটি নদীর (গঙ্গা) ক্ষেত্রে আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছি। এ অঞ্চলে আরও এমন বহু বিষয় আছে, যেগুলোর সুরাহা হলে বাংলাদেশ-ভারত সুষমভাবে উপকৃত হতে পারে। পানির সুষম বণ্টনই নয়; পানি ব্যবহারেও একটি সুষম অবস্থায় আসতে হবে। সবার জন্য কল্যাণকর, সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে যদি চান, তাহলে তো একটি জায়গায় আমাদের যেতে হবে। ফলে শুধু তিস্তা নয়; আমাদের আরও বড় সুযোগ রয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে আমি খুবই সময়োপযোগী হিসেবে দেখতে চাই। নিঃসন্দেহে ভারত বাংলাদেশের একটি বড় প্রতিবেশী। সে ক্ষেত্রে যে কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের জনগণের মতামতের ওপর ভিত্তি করে যদি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক তৈরি হয়, তাহলেই সম্পর্কটি টেকসই ও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য কল্যাণকর হবে। মানুষ যতক্ষণ এই সম্পর্ককে গ্রহণ না করবে; এ সম্পর্কটি নিজের মনে না করবে, ততক্ষণ সম্পর্কটি পালাবদলের ওপর নির্ভর করবে। অর্থাৎ ততক্ষণ পর্যন্ত সম্পর্কটি টেকসই হবে না।

আমরা বাংলাদেশ-ভারত ভৌগোলিকভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বিভিন্নভাবে আমরা একে অপরের সঙ্গে জড়িত। আমি মনে করি, আমাদের একসঙ্গে ইতিবাচকভাবে অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সম্পর্কিত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি নিয়ে একসঙ্গে কাজের ক্ষেত্র রয়েছে। আমাদের এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভূ-রাজনীতির যে গুরুত্ব, সেখানে দুটি দেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, এখানেও ভারসাম্য তৈরি করা দরকার। আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক চাই; চীনের সঙ্গে সম্পর্ক চাই– এই বিষয়গুলো কিন্তু আলোচনা হতে পারে। সবার জন্য সমান উপকারী এবং টেকসই সম্পর্ক তৈরি করতে পারলে এ অঞ্চলের জন্যই তা অর্থবহ হবে।

এম. হুমায়ুন কবির: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

আরও পড়ুন

×