ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

রাজনৈতিক মারপিটের সমীকরণ

রাজনৈতিক মারপিটের সমীকরণ
×

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০

বাঙালি বিস্মৃতিপ্রবণ ও আত্মঘাতী– এ কথা বহুল উচ্চারিত। নিকট অতীতের স্মৃতি-অভিজ্ঞতা ভুলে সমসাময়িক উত্তেজনার দিকে আমাদের যাবতীয় উদ্বেগ ও আবদার ন্যস্ত। এ কারণে অন্ধ মহিষের অযৌক্তিক ক্রোধের সামনে অসহায় সমর্পণের মতো ঘটনাও জাতির ইতিহাসে ঘটেছে।

একটি উদাহরণ দিই। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের ৫২ বছরে এ দেশের কোনো রাজনৈতিক দল স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। যে ক’বার সরকার পরিবর্তন হয়েছে, তার তিনবার ‘সামরিক’ শাসন– জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ; একবার সেনাসমর্থিত সরকার ২০০৭-এ। বাকি তিনবার গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকার পরিবর্তন– ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১-এ। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তিনবারের সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হয়েছে– এক নিঃশ্বাসে বলা না গেলেও সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে বলতেই হয়, অবশ্যই নির্বাচন তিনটিতে গণরায়ের প্রতিফলন ছিল। জবাবদিহির সংসদ সেই তিনবারই প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা গণতান্ত্রিক সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের পক্ষে দ্রুতপায়ে অগ্রসর হচ্ছিলাম।

এসব পুরোনো কাসুন্দি; সবারই জানা। এ-ও নামতা পড়ার মতো আমাদের মুখস্থ যে, সংবিধানের বাইরে যাওয়ার আপাতত আর কোনো সুযোগই নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেছে; আর কোনো ওয়ান ইলেভেন সরকার এ দেশে কোনোদিন আসবে না!

বেশ। এসব উচ্চারণ আমরা আগে শুনিনি? ১৯৯৬ সালে? তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ না। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেবার পাগল ও শিশু ছাড়াই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্বে এসেছিল। এর পর ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে খালেদা জিয়া সরকারের চূড়ান্ত টালবাহানা শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ-বিএনপি নির্বিশেষে রাজনৈতিক নেতাদের জেলখানাবাসী করে ফেলেনি। তারও আগে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির হানাহানি-মারামারিতে রক্তাক্ত হয় দেশ; রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি সাধারণ মানুষের বিরক্তি ও বিতৃষ্ণা উগরে ওঠে। ফলাফল হিসেবে সেনাসমর্থিত মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে দুই বছরের বেশি সময় যা খুশি তা-ই শাসন চালায়!

২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেও সেই একই হানাহানি-মারামারি! নিকট অতীতের এই দুই জাতীয় নির্বাচনের ‘মর্মান্তিক’ ও ‘একদেশদর্শী’ অভিজ্ঞতা বিস্মৃতিপ্রবণ বাঙালির বিস্মৃতিতে। আশা করি এখনও মিশে যায়নি, তাই এ প্রসঙ্গ আর না বাড়িয়ে অনিবার্য প্রশ্নটি সামনে আনতেই হয়– গেল দু’বারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের কয়েক মাসে হানাহানি-মারামারির দৃশ্য ও অনুষঙ্গগুলোর পুনরাবৃত্তি কি এবারও হবে? এই হানাহানি ও মারামারি কাদের মধ্যে হয়? সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই মারামারির সম্পর্ক কোথায়?

পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসের সেই উক্তি : ‘ঈশ্বর থাকেন ভদ্র পল্লীতে, তাহাকে এইখানে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না’– এর মতো গেল দু’বারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কর্মকর্তাদের সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ‘খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই’। ঈশ্বরের কৃপায় পরপর দুই দফা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল এককভাবে নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসে। সরকারপক্ষীয় যুক্তি– এতে সরকারের কী করার আছে? বিরোধীরা নির্বাচনে না এলে তারা তো তাদের জোর করে নির্বাচনে ধরে আনতে পারে না!
অদ্ভুত এক বাস্তবতা! বিরোধীরা নির্বাচনে আসে না বলে সরকার একপক্ষীয় নির্বাচন করে; আর সরকার একপক্ষীয় নির্বাচন করে বলে বিরোধীরা নির্বাচনে আসে না! এ যেন সেই অতি পুরোনো ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’র পুনরাবৃত্তি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাকি, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন? দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পক্ষে যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের নির্বাচনী ব্যবস্থার উদাহরণ অহরহ আসে। অবশ্য উন্নত দেশসহ বিদেশি রাষ্ট্রগুলো যখন আমাদের গণতন্ত্র আর নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়, সেটাও আমাদের ভালো লাগে না।

এই আমরা কারা?

এই ‘আমরা’ মানে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারা। যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে না, তখন নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের উদ্বেগ তাদের বড় ভালো লাগে।

২.

তর্কের খাতিরে যদি বলা হয়, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দল যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় থেকে যেতে চায় বলেই রাজপথে মারামারি, সন্ত্রাস হয়– এর পাল্টা উত্তর কী হতে পারে?

পুরোনো ইতিহাস ভুলে বর্তমানে দাঁড়াই। ১৪ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। নিশ্চিতভাবেই দেশের প্রচুর উন্নয়ন তারা করেছে; সুশাসনের চেষ্টায় স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগ নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে। ২০২৩ সালে এখন তাদের কর্তব্য– জাতীয় নির্বাচনে জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে জেনে নেওয়া, কেমন দেশ পরিচালনা করছে তারা? জনগণ কি আওয়ামী লীগের কাজকর্মে সন্তুষ্ট? এটাই জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্রের ন্যূনতম সৌন্দর্য! এ দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার যে ঐতিহ্য, ক্ষমতায় থেকে নিজ দায়িত্বে নির্বাচন করলে যা হয়, তাতে জবাবদিহি বলে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। সাধারণ মানুষসহ রাজনৈতিক দলগুলো সংসদে জবাবদিহি চায়, আর চায় বলেই রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের এই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়া; এই কর্মসূচি-পাল্টা কর্মসূচি আর শেষমেশ রক্তারক্তি-মারামারি!

শুক্রবার রাজধানীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমাবেশ ঘিরে সতর্ক অবস্থানে পুলিশ -সমকাল

তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের সঙ্গে এই মারপিট করতে চায় জাতীয় সংসদে বসে ক্ষমতার উত্তাপ পোহাতে?

সাধারণ মানুষের সঙ্গে এই মারপিটের সম্পর্ক কোথায়?

এক দল ক্ষমতায় থাকতে চায় যে কোনো উপায়ে; আরেক দল ক্ষমতায় যেতে চায় যে কোনো উপায়ে। তাই এই মারপিট। দুই দলই জনগণের ভাগ্য আর দেশের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছর পরপর মহাসমারোহে মারপিট শুরু করে!

৩.

জাতীয় সংসদে বসতে হলে মারপিট করতে হবে কেন?

২৫ বছরের ঊর্ধ্বে যে কোনো পূর্ণবয়স্ক নাগরিক জাতীয় সংসদে প্রার্থী হতে পারেন। নির্বাচনে একজন প্রার্থী আইনত সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন। প্রকৃত চিত্রটি কী? এমপি হতে আসলে কত কোটি টাকা খরচ করতে হয়– এ নিয়ে নানা জনশ্রুতি আছে। আমরা জনশ্রুতিতে কান না দিলেও চারপাশে যা দেখি, তাতে এইটুকু বুঝি– এমপি হওয়া অনেক ক্ষেত্রে শুধু ‘ধনিক শ্রেণি’র অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কালো টাকার মালিকদের জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না থাকলে এবং এলাকা ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সৎ পেশাজীবীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারলে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক মারপিট কমে যেত। আবার গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা– মিহি কণ্ঠের নিরীহ ব্যক্তি এমপি হয়েই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন; নব্য সংসদ সদস্যের স্ত্রী-শাশুড়ি-ড্রাইভার ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছেন! তার মানে, সম্পদের সঙ্গে এমপি পদের ঘনিষ্ঠতা প্রবলই শুধু নয়, একান্তভাবে নিবিড়; তা এমপি হওয়ার আগে বা পরে, দু’পর্যায়েই!

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মূল রাজনৈতিক মারপিটের সমীকরণ মেলাতে হলে সংসদ সদস্যের অর্থের অবারিত উল্লম্ফনের মুখে লাগাম ধরে রাখার ব্যবস্থা জরুরি। সব মিলিয়ে তাই সংসদে জবাবদিহি এবং জবাবদিহিই উপযুক্ত চিকিৎসা।

অবশ্য রাজনৈতিক মারপিট সমীকরণের হিসাব মোটেই সরল নয়। দলগুলোর মৌসুমি নেতাকর্মী অনেক সময় মারপিট করে পাদপ্রদীপের আলোয় আসে। হুমকি-ধমকি, নানা রকম হিরোইজম তাদের বিভিন্ন স্তরের নেতা বানানোয় ভূমিকা রাখে। এমনকি মার খেয়েও নেতা হওয়ার ঘটনা থাকে। যদিও শেষ বিচারে শিক্ষা, বিচক্ষণতা, অভিজ্ঞতার ওপরেই মূল নেতৃত্ব ও দক্ষতা নির্ভর করে। সে ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়– কালো টাকার উপস্থিতি না থাকলে অবশ্যই রাজনৈতিক হানাহানি কমে আসবে।

৪.

একটি তুর্কি প্রবাদে বলা হচ্ছে, ‘জঙ্গল ছোট হয়ে আসছিল, কিন্তু এর পরও গাছেরা কুঠারকেই ভোট দিচ্ছিল। কারণ, কুঠারের হাতল কাঠের তৈরি, আর গাছেরা ভেবেছিল, কুঠার বুঝি তাদেরই একজন।’

ভোট এভাবেই সাধারণ মানুষ দিতে চায়, নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে তারা ভোটের লাইনে দাঁড়াতে চায়। ভাগ্য বদলের চাবি হিসেবে দেখতে চায় তারা এই ‘মূল্যবান’ ভোটকে। তাদেরই ‘একজন’কে তাই তারা নির্বাচিত দেখতে চায়, যে তাদের সবার হয়ে কথা বলবে! তাই এত আয়োজন, এত প্রাণান্তকর চেষ্টা। হয়তো এ কারণেই যাবতীয় রাজনৈতিক হানাহানির সূচনা– নির্বাচিত ‘একজন’কে নির্ধারণে কারচুপি, চাতুরী, কালো টাকা, হয়রানি, জালিয়াতিসহ গুচ্ছ গুচ্ছ দুরাচারে চারপাশের বিষ হয়ে ওঠা! গাছ তখন কুঠারকে চিনতে ভুল করে বসে। আর আমরা বিস্মৃতিপ্রবণ বাঙালি গাছ ও কুঠার উভয়েরই অতীত কর্মকাণ্ড ভুলে সব এক পাল্লায় মাপতে বসি।

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×