ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উন্নয়ন

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উত্তরণে করণীয়

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উত্তরণে করণীয়
×

ফয়সাল কবির শুভ

ফয়সাল কবির শুভ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২৯

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে আসা এবং আমদানি করা এলএনজি, কয়লা ও পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আমাদের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপের মুখে ফেলছে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে এখন আর শুধু পরিবেশ কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

এই বাস্তবতায় সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-৩০ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কৌশল শুধু সৌর প্যানেল স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, স্মার্ট গ্রিড, জ্বালানি দক্ষতা, সবুজ অর্থায়ন এবং কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাকেও এই রূপান্তরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। লক্ষ্যটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যকে বাস্তবায়নে রূপ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ কারিগরি এবং নীতিগতভাবে কতটা প্রস্তুত। 

নবায়নযোগ্য জ্বালানি 

যেসব প্রাকৃতিক উৎস ক্রমাগত পুনর্নবীকরণ হয় কিংবা মানুষের সময়মাত্রায় কার্যত নিঃশেষ হওয়ার আশঙ্কা নেই, সেসব উৎস থেকে উৎপাদিত শক্তিই নবায়নযোগ্য জ্বালানি। সূর্যের আলো, বাতাস, প্রবাহিত পানি ও জৈববস্তু এর পরিচিত উদাহরণ।

বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা সম্ভবত সৌরশক্তিতে। ভৌগোলিক কারণে বড় আকারের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ সীমিত। আবার বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনাও নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কেন্দ্রীভূত। বিপরীতে দেশের প্রায় সর্বত্রই সূর্যালোক পাওয়া যায়। এ কারণেই সরকারের কৌশলে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সৌর সেচ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, কৃষি ও সৌরবিদ্যুতের সমন্বিত ব্যবস্থা– এগ্রিভোল্টাইকস, সৌরশক্তিচালিত হিমাগার এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির সৌর চার্জিং অবকাঠামোর মতো বহুমুখী ব্যবহারের কথা এসেছে।

বাংলাদেশের আর অপেক্ষার সুযোগ নেই

এর সবচেয়ে বড় কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা। সরকারের কৌশলপত্রেই স্বীকার করা হয়েছে, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি অর্থনীতি, পরিবেশ এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি করছে। বিদ্যুতের চাহিদা বছরে প্রায় ৬ শতাংশ হারে বাড়তে থাকলে ২০৩০ সালে সর্বোচ্চ চাহিদা ২৪ থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার সরাসরি সম্পর্ক। এলএনজি, তেল কিংবা কয়লা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় কিনতে হয়। পক্ষান্তরে সূর্যের আলো আমদানি করতে হয় না। ফলে অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী প্রতিটি অতিরিক্ত ইউনিট দেশীয় নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রতি বাংলাদেশের ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমাতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, রপ্তানি প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ক্রমেই কার্বন-সচেতন হচ্ছে। তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াসহ বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর জন্য পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের সহজলভ্যতা ভবিষ্যতে পরিবেশগত মান পরিপালন, বাজারে প্রবেশ এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে শুধু পরিবেশ রক্ষার ব্যয় হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় সৌরক্ষেত্র মাথার ওপরেই

জনবহুল বাংলাদেশে জমির সীমাবদ্ধতা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। সরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, কারখানা, গুদাম, বিপণিবিতান এবং আবাসিক ভবনের ছাদ মিলিয়ে বিপুল পরিমাণ জায়গা রয়েছে, যার বড় অংশ এখনও জ্বালানি উৎপাদনের দৃষ্টিকোণ থেকে অব্যবহৃত।

জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির বাস্তবায়ন নির্দেশিকায় প্রাথমিকভাবে সারাদেশে প্রায় ২,০০০ থেকে ৩,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছিল। এখন প্রয়োজন ছাদকে জাতীয় জ্বালানি সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা। বাংলাদেশ ন্যাশনাল সোলার রুফটপ জিআইএস ইনভেন্টরি তৈরি করতে পারে, যেখানে স্যাটেলাইট চিত্র, ভবনের তথ্য, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং স্থানীয় বিতরণ নেটওয়ার্কের সক্ষমতা একত্র করা হবে। এর মাধ্যমে কোন ছাদ সৌরবিদ্যুতের জন্য উপযোগী, সম্ভাব্য উৎপাদন কত এবং কোথায় বিনিয়োগ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত, তা নির্ধারণ করা সম্ভব। বিল্ডিং কোডে কীভাবে সৌর প্যানেল আবশ্যিক করা যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু করা দরকার। অর্থাৎ প্রতিটি বাসার ছাদকে ব্যবহার করে কতটা বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যায় সেই হিসাব করা জরুরি। 

এগ্রিভোল্টাইকস: একই জমিতে খাদ্য ও বিদ্যুৎ

শুধু ছাদ ব্যবহার করে অবশ্য ভবিষ্যতের পুরো নবায়নযোগ্য জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। বড় সৌর প্রকল্পও প্রয়োজন হবে। তখনই সামনে আসে জমির প্রশ্ন। এখানে এগ্রিভোল্টাইকস বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এ পদ্ধতিতে একই জমিতে কৃষি উৎপাদন ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন পাশাপাশি চলে। সৌর প্যানেল এমন উচ্চতায় ও বিন্যাসে স্থাপন করা হয়, যাতে তার নিচে ও মাঝের জায়গায় কৃষিকাজ অব্যাহত রাখা যায়।

মানিকগঞ্জের একটি সাম্প্রতিক পরীক্ষামূলক উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক উদাহরণ। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এবং ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ৯৮ কিলোওয়াট ক্ষমতার এগ্রিভোল্টাইক ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। ধান চাষ ও কৃষিযন্ত্র চলাচলের সুযোগ রেখে প্রকল্পটি নকশা করা হয়েছে এবং অন্যান্য ফসল নিয়েও পরীক্ষা চলছে।

এর তাৎপর্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। সৌরবিদ্যুৎ সেচে ব্যবহার করে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। আবার উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব। অর্থাৎ একই জমি একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তায় অবদান রাখতে পারে। জমির সংকটে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিতে পারে।

আমাদের উপায় খুঁজতে হবে একই জমি থেকে কীভাবে খাদ্য ও বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। ভবিষ্যতের সৌর উন্নয়নে তাই একটি শক্তিশালী নীতি হতে পারে জমি অধিগ্রহণের আগে জমির বহুমুখী ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

পাকিস্তান: বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক কাছের শিক্ষা

অনেক দিক থেকেই পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বেশি প্রাসঙ্গিক। দুই দেশেরই বড় জনসংখ্যা, উন্নয়নশীল অর্থনীতি, আমদানি করা জ্বালানির ব্যয়ের চাপ, উচ্চ বিদ্যুৎমূল্য এবং আর্থিক চাপে থাকা বিদ্যুৎ খাতের মতো কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পাকিস্তানে সাম্প্রতিক সময়ে ডিস্ট্রিবিউটেড ও রুফটপ সোলারের দ্রুত বিস্তার ঘটেছে। সৌর প্যানেলের দাম কমে যাওয়া এবং গ্রিডের বিদ্যুতের উচ্চ ব্যয় পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহিত করেছে।

এখানে বাংলাদেশের জন্য দুটি শিক্ষা রয়েছে। প্রথমটি আশাব্যঞ্জক– প্রযুক্তির মূল্য, বাজারের অর্থনীতি ও নীতিগত প্রণোদনা একই দিকে কাজ করলে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার সরকারি পরিকল্পনার ধারণার চেয়েও দ্রুত হতে পারে। দ্বিতীয়টি সতর্কবার্তা; তুলনামূলক বেশি বিল দেওয়া গ্রাহকরা যদি দ্রুত নিজস্ব সৌরবিদ্যুতে চলে যান, অথচ বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণের স্থায়ী ব্যয় অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে বিতরণ সংস্থাগুলো আর্থিক চাপে পড়তে পারে। সেই ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত এমন গ্রাহকদের ওপর পড়তে পারে, যাদের নিজেদের সৌর ব্যবস্থা স্থাপনের সামর্থ্য নেই। তাই বাংলাদেশের মিটার ও ট্যারিফ ব্যবস্থা এমনভাবে নকশা করতে হবে, যাতে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগকারীরা যথাযথ প্রণোদনা পান, একই সঙ্গে গ্রিডের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের স্বার্থও সুরক্ষিত থাকে।

নবায়নকৃত জ্বালানির জন্য আঞ্চলিক জোটের সম্ভাবনা

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ শুধু দেশের সীমানার ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। এশিয়ায় আন্তঃদেশীয় পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ধারণা দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে। আসিয়ান পাওয়ার গ্রিড তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যেখানে ভূমি ও সম্পদের সীমাবদ্ধতায় থাকা দেশকে নবায়নযোগ্য সম্পদে সমৃদ্ধ প্রতিবেশীর সঙ্গে সংযুক্ত করার চেষ্টা চলছে।

ইন্দোনেশিয়া-সিঙ্গাপুর জ্বালানি করিডোরের একটি ভালো উদাহরণ। সীমিত ভূমির সিঙ্গাপুর ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি চাহিদার একটি অংশ প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানির পরিকল্পনা করছে, অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া তার বিপুল নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্ভাবনাকে বিদেশি বিনিয়োগ ও সবুজ শিল্পায়নের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। একইভাবে লাওস-থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুরের যৌথ পাওয়ার প্রজেক্ট দেখিয়েছে, একাধিক দেশের গ্রিড ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাস্তবেও সম্ভব।

দক্ষিণ এশিয়াতে একই ধারণা ভিন্ন সম্পদভিত্তিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে। হিমালয়ের নদী ব্যবস্থার কারণে নেপালের বড় শক্তি জলবিদ্যুৎ। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভারতের সঞ্চালন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি শুরু করেছে। একে শুধু সীমিত পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে সম্ভাবনাকে ছোট করে দেখা হবে। বাংলাদেশের দিনের বেলার সৌরবিদ্যুৎ নেপালের এবং ভবিষ্যতে ভুটানের জলবিদ্যুতের সঙ্গে পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে; আর ভারতের বৃহৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক হতে পারে এই আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ সেতু। দীর্ঘ মেয়াদে এর মধ্য দিয়েই একটি দক্ষিণ এশীয় সবুজ জ্বালানি বাজার গড়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে বড় বাধা কী?

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে নীতি আছে বা নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে আমাদের বড় সমস্যা নীতি প্রণয়নে নয়, বরং বাস্তবায়নে। সরকারের ২০২৬-৩০ কৌশলপত্রেও স্বীকার করা হয়েছে, আগের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলো প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি মূলত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি, সহায়ক নীতির দুর্বলতা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবে।

বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুমোদনকেন্দ্রিক আমলাতন্ত্র থেকে সহায়তামুখী প্রশাসনে উত্তরণ। একটি ডিজিটাল ওয়ানস্টপ রিনিউয়্যাবল এনার্জি অ্যাপ্রুভাল সিস্টেম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে সিদ্ধান্তের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারে। এর উদ্দেশ্য পরিবেশগত বা কারিগরি যাচাই দুর্বল করা নয়; বরং পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও সময়বদ্ধ করা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ নতুন কারিগরি চ্যালেঞ্জও তৈরি করবে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকৃতিগতভাবেই পরিবর্তনশীল। দুপুরে সৌরবিদ্যুৎ প্রচুর পাওয়া গেলেও সন্ধ্যার দিকে উৎপাদন দ্রুত কমে যায়, অথচ তখন বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকতে পারে। তাই প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গ্রিডে শুধু হাজার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

বাংলাদেশের প্রয়োজন বড় পরিসরে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় গ্রিড ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি। অর্থাৎ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গ্রিড আধুনিকায়নকে দুটি আলাদা কর্মসূচি হিসেবে নয়, একই অবকাঠামোগত রূপান্তরের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

কাঠামোগত পরিকল্পনা 

২০৩০ সালের লক্ষ্যকে প্রথমে বছরভিত্তিক স্বচ্ছ বাস্তবায়ন রোডম্যাপে রূপ দিতে হবে। প্রতবছর কত সক্ষমতা যুক্ত হবে, তার পাশাপাশি কোন প্রতিষ্ঠান কী বাস্তবায়ন করবে এবং কার কাছে জবাবদিহি করবে– সেটি স্পষ্ট করতে হবে। সরকারি স্থাপনা, শিল্প ভবন, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় বাণিজ্যিক ভবন দিয়ে ন্যাশনাল সোলার রুফটপ জিআইএস ইনভেন্টরি শুরু করা যেতে পারে।  এগ্রিভোল্টাইকসকে পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে জাতীয় গবেষণা ও বিনিয়োগ কর্মসূচিতে নিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত সৌর প্রকল্প থেকে কৃষিজমি, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক প্লাবনভূমিকে সুরক্ষা দিতে হবে।

গ্রিড আধুনিকায়ন ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ এখনই শুরু করতে হবে; হাজার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পরে নয়। প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয় কমাতে সবুজ ঋণ, গ্রিন বন্ড, ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স ও আন্তর্জাতিক ক্লাইমেট ফাইনান্সকে কাজে লাগাতে হবে। সবশেষে অগ্রগতি হতে হবে পরিমাপযোগ্য এবং জনগণের কাছে দৃশ্যমান। ছয় মাস অন্তর রিনিউয়্যাবল এনার্জি প্রগ্রেস ড্যাশবোর্ড প্রকাশ করা যেতে পারে, যেখানে কত সক্ষমতা বাস্তবে উৎপাদনে এসেছে, কত বিনিয়োগ হয়েছে, কোন প্রকল্প কেন আটকে আছে, কত জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি এড়ানো গেছে এবং কত কার্বন নিঃসরণ কমেছে, তার হালনাগাদ তথ্য থাকবে।

বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার

সাম্প্রতিক সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্যতম সফল দেশ অস্ট্রেলিয়া। তারা দেখিয়েছে নীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, গ্রিড আধুনিকায়ন এবং জনগণের অংশগ্রহণ একই সঙ্গে এগোলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কত দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে অস্ট্রেলিয়ার বিশাল ভূমিনির্ভর মডেল অনুসরণ করা সম্ভব নয়। পাকিস্তান আমাদের দেখায়, একটি উন্নয়নশীল দেশেও ডিস্ট্রিবিউটেড সোলার দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে। তবে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতি, ট্যারিফ ও গ্রিড ব্যবস্থাপনার সংস্কার প্রয়োজন। আর নেপাল দেখায়, নিজস্ব ভৌগোলিক সুবিধা এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যকে বৃহত্তর জ্বালানি নিরাপত্তার অংশে পরিণত করা সম্ভব। বাংলাদেশকে তাই নিজের বাস্তবতায় নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি মডেল গড়ে তুলতে হবে।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, এগ্রিভোল্টাইকসের মাধ্যমে একই জমিতে খাদ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করতে হবে, আর ভাসমান বা বড় সৌর প্রকল্প নিতে হবে কেবল যেখানে তা পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। এর সঙ্গে আঞ্চলিক জলবিদ্যুৎ, ব্যাটারি সংরক্ষণ এবং আধুনিক গ্রিডকে যুক্ত করতে হবে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ এখন আর শুধু প্রযুক্তি নয়; বরং বাস্তবায়ন– প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, নীতির নিশ্চয়তা, অর্থায়ন, গ্রিড প্রস্তুতি, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। বাংলাদেশের নীতি হবে দ্রুত, বিনিয়োগবান্ধব, পরিবেশগতভাবে দায়িত্বশীল এবং সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে এই জ্বালানি রূপান্তর একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করবে, আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবে, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করবে এবং অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও সহনশীল করে তুলবে। লক্ষ্য শুধু বেশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়– সঠিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সঠিক জায়গায় এবং সঠিক পদ্ধতিতে তার বাস্তবায়ন।

ড. ফয়সাল কবির শুভ: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী পরিবেশ গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদ
shuvobuet81@gmail.com 

আরও পড়ুন

×