ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতি

‘নিজেরা নিজেরা’ নির্বাচনে ‘নিষেধাজ্ঞার’ কাঁটা

‘নিজেরা নিজেরা’ নির্বাচনে ‘নিষেধাজ্ঞার’ কাঁটা
×

হাসান মামুন

হাসান মামুন

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২৩:০৫

মনোনয়নপত্র দাখিলের তারিখ না পেছানোর ভেতর দিয়ে এটিও নিশ্চিত হয়ে গেল– নির্বাচন সামনে রেখে গঠিত তিনটি ‘কিংস পার্টি’র আর কিছু করে দেখানোর নেই। প্রদত্ত সময়ে তারা উৎসাহব্যঞ্জক কিছু করে দেখাতেও পারেনি। সম্ভাব্য সব রকম চেষ্টায় কোনো ঘাটতি রাখা না হলেও মাঠের বিরোধী দল বিএনপিতে ‘ভাঙন’ ধরানো যায়নি। এখন এসব কথিত পার্টির কী পরিণতি হয়, তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে। তাদের একজন আলোচিত নেতার যে প্রকাশ্য ফোনালাপ ‘ভাইরাল’ হয়েছে, তা শুনে বুঝতে কষ্ট হয় না; কী সব চলেছে এতদিন! এখন তারা নিজেরা কে কোন আসনে দাঁড়াবেন; আদৌ জিতে আসার প্রশস্ত পথ পাবেন কিনা– তা নিয়েই দেখা দিয়েছে সংশয়।

সরকার যে চরিত্রই ধারণ করুক, তাকে চ্যালেঞ্জ করতে অবশ্য বারবারই ব্যর্থ বিএনপি; আন্দোলন করে সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামানো তো পরের ব্যাপার। এবারও সে সম্ভাবনা আছে বলে বিশ্বাস করার লোক খুব কম। এর কারণ দুটি– বিএনপির শক্তি কমেছে এবং সরকারের সামর্থ্য বেড়েছে আন্দোলন নস্যাৎ করে দেওয়ার। বিরোধী দল মোকাবিলায় সরকার এত শক্তিশালী কখনোই ছিল না। এটি যে বিএনপির হাইকমান্ডের অজানা, তাও নয়। কিন্তু তারা কী করবেন? মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় অতিবাহিত হওয়ার পর কি প্রত্যাহার করতে পারেন আন্দোলন কর্মসূচি? তবে তারা নিশ্চয়ই পারেন এতে কিছু বদল আনতে।

বিএনপির বড় সান্ত্বনা হলো, এত চাপের মুখেও তারা দল ধরে রাখতে পেরেছে। অতীতে আওয়ামী লীগ, বিএনপির মতো দল ভাঙার চেষ্টায় ফায়দা হয়নি দেখেও সরকারপক্ষ থেকে এবার জোরেশোরেই এ প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল হয়তো এ কথা ভেবে, তারা তো সুদীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে আর অব্যাহত চাপের মুখে। তা ছাড়া সরকার ও তার মিত্রদের মধ্যে এমন ধারণা রয়েছে যে, বিএনপি ঠিক রাজনৈতিক দল নয়। এটি হলো আওয়ামীবিরোধীদের প্ল্যাটফর্ম। বর্তমান পরিস্থিতিতে দলটি ভেঙে দেওয়া কঠিন হবে না। তা ছাড়া অর্থনীতি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের তো ‘দেওয়ার ক্ষমতা’ও অনেক বেড়েছে। বাস্তবে দেখা গেল, হিসাব মেলানো কঠিন।

মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনে বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যানকে যেভাবে দলে এনে প্রার্থী বানানো হয়েছে, সেটি খোদ সরকারপক্ষে প্রশংসিত হবে না। নাশকতার মামলায় জেলে নিয়ে দ্রুত জামিনে মুক্তি দিয়ে তারপর যেভাবে মনোনয়ন দেওয়া হলো এবং এ বিষয়ে তাঁর যে বক্তব্য এসেছে, সেটি লজ্জাজনক পরিস্থিতিতেও যোগ করেছে নতুন মাত্রা। তবে নির্বাচন যেভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে, তাতে মানুষ কোনো দৃশ্য দেখেই বোধহয় বিস্মিত হবে না। সমস্ত কিছু দেখার জন্য তারা প্রস্তুত!

সরকার অবশ্য তার প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হয়েছে। সেটি হলো বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা। সবকিছুর পরও তাদের নির্বাচনে রাখতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে যে ‘নিঃশর্ত সংলাপ’-এর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সেটি সরকারপক্ষ গ্রহণ করত। সংলাপ হলে তা নিঃশর্ত হতে হবে– এটি তো তাদেরই বক্তব্য ছিল। বাস্তবে এবারের নির্বাচন নিয়ে বেজায় আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্রের লিখিত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি নিয়েও তারা বিএনপির সঙ্গে সংলাপ এড়িয়েছে। নির্বাচন কমিশনও তপশিল ঘোষণায় আর বিলম্ব করেনি।

সরকারের দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে রাখা। নইলে তো ‘কোনো বিরোধী দলই’ নির্বাচনে থাকে না! সেটিও তারা নিশ্চিত করেছে; এমনকি এতদিনের অতি বিশ্বস্ত রওশনপন্থিদের দল থেকে প্রস্থান মেনে নিয়ে।

সামনে তাদের চ্যালেঞ্জ হলো ‘নিজেরা নিজেরা’ নির্বাচন করে ফেলার যে আয়োজন, সে লক্ষ্য অর্জনে আসন ধরে ধরে ‘বিজয়ী প্রার্থী’ স্থির করা। অন্তত সিংহভাগ ক্ষেত্রে সেটি সুনিশ্চিত করা। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিন ১৭ ডিসেম্বর। অধিকাংশ নিবন্ধিত দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে– সেটি বড় কথা নয়। কথা হলো, কাদের কত আসন দিয়ে এ যজ্ঞ সম্পন্ন করা হবে। সবাই তো সরকার অনুমোদিত! এ অবস্থায় সাজিয়ে তোলা সংসদে কারা হবে প্রধান বিরোধী দল, কে বিরোধীদলীয় নেতা, তা নিয়েও দেনদরবার চলতে দেখা যাবে।

আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থীসমষ্টিও হয়ে উঠতে পারে দ্বিতীয় বৃহৎ দল। সে ক্ষেত্রে আমরা একটা নতুন ধরনের বিরোধী দলও দেখতে পারি সংসদে; জাতীয় পার্টির বদলে। এটি হয়তো হবে ‘নবতর নিরীক্ষা’র দিকে যাত্রা।

অনেকে অবশ্য আশা করে আছেন, জাতীয় পার্টি হয়তো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবে শেষ মুহূর্তে। তাতে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হবে। তাদের এক সভায় তো দলের তৃণমূলের মাত্র একজন বাদে সবাই বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষেই বক্তব্য রেখেছিলেন। দলটির চেয়ারম্যানও কম জ্বালাময়ী বক্তব্য দেননি একটা সময় পর্যন্ত। ভারত সফর সেরে আসার পর থেকে অবশ্য তাঁর অবস্থান বদলান। এখন ভিন্ন কোনো প্রভাব কি দলটির অবস্থান পাল্টাতে ভূমিকা রাখবে? আসন ধরে ধরে ‘পছন্দের প্রার্থী’ স্থির করা দেখেও তারা বুঝতে পারবেন, শেষতক জাতীয় পার্টিকে কত আসন দেওয়া হবে। নবতর নিরীক্ষায় সংসদের তৃতীয় দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও সেটা কি তারা মেনে নেবেন?

১৭ ডিসেম্বর আসতে আসতে আন্দোলন তীব্র হবে বলে মনে হয় না। বিএনপি নেতাকর্মীর ওপর ধরপাকড় অব্যাহত। পুরোনো মামলায় তাদের সাজা হয়ে যাচ্ছে। সাজার ধরনেও আছে মিল। গোলেমালে নতুন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আর নতুন তপশিলের আওতায় নির্বাচন হলেও এসব সাজাপ্রাপ্তের পক্ষে প্রার্থী হওয়া কঠিন হবে। তবে সরকারপক্ষ আপাতত মনোযোগ নিবদ্ধ করবে ‘শান্তিপূর্ণভাবে’ নির্বাচন সেরে ফেলায়। এটিও যে ‘গ্রহণযোগ্য নির্বাচন’-এর শর্ত! নির্বাচনকে তারা ‘অংশগ্রহণমূলক’ করে তুলেছে ইতোমধ্যে। এবার এটিকে শান্তিপূর্ণ করার শর্ত হলো, মাঠে নিজেদের মধ্যে যেন সহিংসতা না হয়। একতরফা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের মধ্যে সহিংসতা কিন্তু রেকর্ড গড়েছিল।

সরকারের ‘স্মার্টনেস’ দেখে যারা অভিভূত, তারা অবশ্য আশা করে থাকবেন, সবকিছু ভালোয় ভালোয় বা নিরাময়যোগ্য ক্ষতিতে সম্পন্ন হবে। নবতর নিরীক্ষারও প্রশংসা করতে তারা হয়তো অসম্মত হবেন না। তবে দৃষ্টি রাখতে হবে এর ভেতর দিয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সম্ভাব্য পরিবর্তনে। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যে নির্বাচন হতে চলেছে, তাতে সরকারের প্রকৃত প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতি ‘রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতার সংকট’ আরও বাড়িয়ে তুলবে বৈকি। এ ধরনের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি রোধে দেশের বাইরে থেকে যেসব প্রচেষ্টা এবার চলছিল; নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরও সেটি অব্যাহত থাকতে পারে। নির্বাচনের বাইরের ইস্যুতেও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার নতুন শঙ্কা কিন্তু তৈরি হয়েছে। অনেকে হয়তো সঠিকভাবেই ভাবছেন, এর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য!
দেশের সিংহভাগ মানুষ নিশ্চয়ই চায় না, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এতদিনের অর্জিত উন্নয়ন বিপন্ন হোক। একটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়ে গেল, আবার নতুন করে নিষেধাজ্ঞাও এলো– সেটি হবে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক। এ দুই ক্ষতি একযোগে বহন করা খুবই কষ্টকর হয়ে যাবে বলে এখান থেকে উত্তরণই কাম্য।

হাসান মামুন: সাংবাদিক, বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×