ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রোহিঙ্গা সংকট

আন্তর্জাতিক মহলের 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি'

আন্তর্জাতিক মহলের 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি'
×

রাহমান নাসির উদ্দিন

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্যাতন, নির্মম হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার ধর্ষণ, পাইকারি অগ্নিসংযোগ এবং অমানবিক জেনোসাইড থেকে বাঁচার জন্য লাখ লাখ রোহিঙ্গা ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আগের আশ্রিত রোহিঙ্গা এবং নতুন আশ্রয়প্রার্থী মিলে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ লক্ষাধিক, কারও কারও মতে ১৩ লাখ। এর মধ্যে গত চার বছরে নতুন করে জন্ম নিয়েছে এক লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শিশু। কক্সবাজারের উখিয়া এবং টেকনাফে অবস্থিত ৩৪টি অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে এসব রোহিঙ্গা বাস করছে।
মনে রাখা জরুরি, বিগত প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে বহুমুখী সমস্যার মধ্যে আছে। ১৯৭৮ সালে প্রথম যখন বার্মার সামারিক বাহিনী 'অপারেশন ড্রাগন কিং' নামে একটি অপারেশন চালায়, তখন প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। ১৯৯১-৯২ সালে যখন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী 'অপারেশন বিউটিফুল অ্যান্ড ক্লিন ন্যাশন' নামে রোহিঙ্গাদের ওপর পুনরায় সামরিক অভিযান চালায়, তখন প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। পরে এই সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গার মধ্য থেকে প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গাকে জাতিসংঘের সহায়তায় একটি প্রত্যাবাসন চুক্তির মাধ্যমে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। অবশ্য এদের অনেকেই বিভিন্নভাবে পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর ২০১২ সালে আসে এক লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা। ২০১৬ সালে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। কিন্তু ২০১৭ সালের সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। কেননা, এ সময় বাংলাদেশে প্রবেশ করে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা।
বাংলাদেশ শুরুতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে অনীহা দেখালেও চরম মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে গিয়ে একান্তই মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়। কিন্তু বিগত চার বছরে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কোনো অগ্রগতি আমরা লক্ষ্য করিনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলতে আমরা যাদের বুঝি, তারাও রোহিঙ্গা সমস্যার কার্যকর সমাধানে তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। শুরু থেকেই রাশিয়া, চীন, জাপান এবং ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং এখন পর্যন্ত সে অবস্থানে তারা অনড় আছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন খানিকটা দূতিয়ালির ভূমিকা নেবে বলে বাংলাদেশকে আশ্বাস দিলেও চীনের অবস্থান অনেকটা 'ধরি মাছ নাই ছুঁই পানি'র মতো। আর ভারত কেবলই 'লিপস সার্ভিস' দিয়ে খালাস, কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে আখেরে মিয়ামারের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। এ রকম একটি অবস্থায় চার বছর পরে এসে বাংলাদেশের করণীয় কী, সেটা নিয়ে সক্রিয়ভাবে চিন্তা করা এবং তা কার্যকর করার একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জরুরি।
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ শুরু থেকেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকেই একমাত্র নীতি হিসেবে গ্রহণ করে সব ধরনের তৎপরতা চালিয়েছে এবং বাংলাদেশের জায়গা থেকে সেটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কেননা, বাংলাদেশ এমনিতেই অধিক জনসংখ্যার দেশ। তার ওপর ১১ (বা ১৩) লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বছরের পর বছর ধরে লালন-পালন করা বাংলাদেশের জন্য কষ্টকর। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির কারণে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে একটা তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীবন-জীবিকা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে। ফলে, বাংলাদেশ শুরু থেকেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেই গুরুত্ব আরোপ করেছে। সে কারণেই ২০১৭ সালের নভেম্বরেই বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে একটি প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষর করে। এবং ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে, যাতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা যায়। এরই ধারাবাহিতায় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে একটি 'ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট এগ্রিমেন্ট' চুক্তি করা হয় দুই দেশের মধ্যে। সে চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য মিয়ানমার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করবে এবং প্রত্যাবাসন শুরুর দিন থেকে দুই বছরের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর এবং ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট দুই দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারের রাখাইনে ফিরে যেতে রাজি হয়নি। ফলে দুই দফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, সব ধরনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব, আন্তরিকতার অভাব এবং তীব্র অনিচ্ছার কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়। কেননা, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইনে ফিরে গিয়ে কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে? তাদের ফেলে আসা বসতভিটা ফেরত দেওয়া হবে কিনা? তাদের নাগরিকত্ব ফেরত দেওয়া হবে কিনা? তাদের জীবনের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া হবে কিনা? তাদের প্রতি যে অন্যায়-অত্যাচার করা হয়েছে তার সুষ্ঠু বিচার হবে কিনা? এ রকম অসংখ্য প্রশ্নের কোনো সদুত্তর রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার দিতে পারেনি। তাহলে কিসের ভিত্তিতে, কিসের আশায় এবং কিসের ভরসায় রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে যাবে? ফলে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার সব দায়-দায়িত্ব মিয়ানমারকেই নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে সে সময় খুব একটা সমর্থন জানায়নি। কারণ তারা মনে করে, মিয়ানমারে রাখাইনের পরিস্থিতি এখনও রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ নয়। কিন্তু কেন নিরাপদ নয় এবং মিয়ানমার কেন এ রকম একটি পরিস্থিতি সেখানে তৈরি করে রেখেছে- সে প্রশ্ন কেউ উত্থাপন করেনি এবং পরিস্থিতি উন্নতি করার জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর কোনো চাপ প্রয়োগ করতে পারেনি। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করার জন্য ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের যৌথ টাস্কফোর্সের এক সভা হওয়া কথা থাকলেও সেটা 'অনিবার্য কারণে' হয়নি। ২০২০ সালের মার্চ থেকে করোনা মহামারির থাবায় গোটা বিশ্ব যখন স্থবির হয়ে আছে, তখন প্রত্যাবাসনের আর কোনো উদ্যোগ আমরা দেখিনি। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে এসে নতুন করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার একটা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু গত ১ ফেব্রুয়ারি সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করায় পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নতুন করে সংকটের মুখে পড়ে। নতুন সামরিক সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত কার্যকর সংলাপ শুরু করতে পারেনি।
রোহিঙ্গা ঢলের চার বছরে এসে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করা। নতুন করে একটা সংলাপ শুরু করে পুরো কার্যক্রমকে নতুন করে গতি দেওয়া। এটা মনে রাখা জরুরি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের সঙ্গে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেটা কোনো ব্যক্তি-বিশেষ কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হয়নি; চুক্তি হয়েছিল মিয়ানমার রাষ্ট্রের সঙ্গে। সুতরাং আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি স্বাক্ষরের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় যেই আসুক রাষ্ট্রীয় চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সে সরকারের দায়িত্ব। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, সু চির সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে যেসব চুক্তি করেছিল, সেখানে তৎকালীন সেনাবাহিনীর পূর্ণ সম্মতি ছিল। বাংলাদেশ এ আর্গুমেন্ট নিয়ে নতুন করে সংলাপ শুরু করতে পারে এবং সেটা দ্রুততম সময়ে শুরু করা উচিত বলে আমি মনে করি। এখানে এটাও মনে রাখা জরুরি, ১৯৭৮ সাল থেকে যত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তন্মধ্যে দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন সামরিক সরকারের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমেই হয়েছে। সুতরাং শক্ত কূটনৈতিক তৎপরতার ভেতর দিয়ে নতুন করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করাই হচ্ছে রোহিঙ্গা ঢলের পঞ্চম বছরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন

×