ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অ্যাপসভিত্তিক যাত্রীসেবা

সময়ে এক ফোঁড় দিন

সময়ে এক ফোঁড় দিন
×

ফাইল ছবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০

গত কয়েক বছর ধরে অ্যাপসভিত্তিক যাত্রীসেবা বা 'রাইড শেয়ারিং' কীভাবে যানজট লাঞ্ছিত এই নগরীর যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করে দিয়েছে, তা এখন প্রমাণিত। কিন্তু এই ব্যবস্থা সম্প্রসারিত ও জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি এর নিরাপত্তা ও সেবার মান নিয়েও অসন্তোষ বাড়ছিল। বিশেষত রাইড শেয়ারিংয়ের বৃহত্তম মাধ্যম মোটরসাইকেল নিয়ে। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে খোদ চালকদের অসন্তোষই সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের উপজীব্য হয়ে উঠছে। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে, অ্যাপে চলা রাইড শেয়ারের গাড়ির চালকরা অভিযোগ করে বলেছেন, তারা সড়কে পুলিশের নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনের মতো সময় ও শ্রমসাধ্য কাজ করে জীবন চালালেও এর আইনগত স্বীকৃতি পাচ্ছেন না। এক দিনে একাধিকার পুলিশি 'হয়রানি' থেকে 'ত্যক্ত-বিরক্ত' হয়ে গত সোমবার নিজের মোটরসাইকেলে আগুন দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন একজন বাইকচালক।

মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে 'ঢাকা রাইড শেয়ারিং ড্রাইভারস ইউনিয়ন' আয়োজিত মানববন্ধনে এমন আরও আপাত অজানা চিত্র ফুটে উঠেছে। আমরা জানি, বিশ্বব্যাপীই রাইড শেয়ারিং জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পাশাপাশি এর নিয়ম-শৃঙ্খলা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ কাজ করে চলছে। যেমন অ্যাপ কোম্পানির পক্ষে উপার্জনের ২৫ শতাংশ কমিশন নেওয়ার ব্যাপারে অসন্তোষ কেবল বাংলাদেশে নেই। বিশ্বের অন্যান্য দেশে তাদের নানা দাবিতে এ বছরই বিভিন্ন সময়ে ধর্মঘট পালিত হতে দেখা গেছে। বিশেষত করোনা পরিস্থিতিতে যখন সবারই জীবিকায় কমবেশি আঘাত এসেছে, তখন সম্ভাবনাময় এই খাতে কর্মরতদের আর্থিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। চলতি বছর এপ্রিলে ঢাকায়ও আরেক দফা বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছিল অ্যাপসভিত্তিক যাত্রীসেবার চালকরা। স্বীকার করতে হবে, অ্যাপস কোম্পানির কমিশনের বিষয়টি বাংলাদেশের একক বিষয় নয়। এ জন্য আন্তর্জাতিক ঐকমত্য প্রয়োজন।

কিন্তু অন্য যেসব অভিযোগ রাইড শেয়ারিং চালকরা তুলছেন, সেগুলো নিশ্চয়ই সমাধানযোগ্য। যেমন যাত্রীর জন্য রাস্তায় অপেক্ষায় থেকে 'অবৈধ পার্কিং' মামলা কিংবা কখনও কখনও আয়ের চেয়ে বেশি জরিমানা কিংবা ঘুষের বিষয়টি কেবল অধিকারের বিষয় নয়, বরং নিয়ম ও সুশাসনের প্রশ্ন। পাশাপাশি 'রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে' মোটরসাইকেল চালিয়েও 'পেট' না চলার আক্ষেপ সত্যিই মানবিক দিক থেকে দেখতে হবে। অ্যাপ কোম্পানির কমিশন অবিলম্বে কমানো সম্ভব না হলেও যদি ঘুষ বা জরিমানার বিষয়গুলো দূর করা যায়, তাহলে হয়তো এত অমানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে না। আমরা দেখতে চাইব, এই চালকরা কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় নামার আগেই এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ সক্রিয় হবে। একই সঙ্গে রাইড শেয়ারিং খাতের কোম্পানি ও চালকদের দায়িত্বশীলতাও কাম্য। ২০১৭ সালে এ-সংক্রান্ত যে নীতিমালা প্রণীত হয়েছিল, সেটা মেনে না চলার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ই উঠেছে। আমাদের মনে আছে, ২০১৯ সালে মাঝামাঝি রাজধানীতে উবার পরিচালিত মোটরসাইকেলে চড়ে দুর্ঘটনায় এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী নিহত হওয়ার পর এসব সেবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও কথা উঠেছিল। অভিযোগ উঠেছিল গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নিয়েও। আলোচনা যেহেতু সামনে এসেছে, এ-সংক্রান্ত সব ধরনের বিশৃঙ্খলাই নিয়মের আওতায় আসতে হবে।

আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখি, রাইড শেয়ারিং খাতের মোটরসাইকেল চালকদের অনেকে বেপরোয়া। তারা যেমন নিজেকে, তেমনই বিপন্ন করে তোলে যাত্রীকেও। উল্টো দিকে চলা, নিষিদ্ধ বাঁকে মোড় নেওয়া, বিপজ্জনক গতিসীমা, এমনকি উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ফুটপাতেও মোটরসাইকেল চলতে দেখি আমরা। অধিকারের পাশাপাশি দায়িত্বশীলতা নিয়েও সংশ্নিষ্ট সবাই সজাগ ও সক্রিয় হবেন বলে প্রত্যাশা। আর সময়ে এক ফোঁড় দিলে অসময়ে আর দশ ফোঁড় দিতে হবে না। আমরা জানি, বিশৃঙ্খলা অনেক পক্ষকেই বাড়তি ও বেআইনি সুবিধা দিয়ে থাকে। যে কারণে বছরের পর বছর বিশৃঙ্খলা টিকে থাকে। অ্যাপসভিত্তিক যাত্রীসেবার ক্ষেত্রেও ছদ্ম ঔদাসীন্য কাজ করছে কিনা, খতিয়ে দেখা জরুরি। আমরা নিশ্চয়ই চাই যে নাগরিকের বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়ূক; যাতায়াত ব্যবস্থা বহুমুখী হোক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। নিরাপত্তার প্রশ্নে ছাড় দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।

আরও পড়ুন

×