বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শন
দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার পথনির্দেশনা
মো. ছাদেকুল আরেফিন
প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৩:২১
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে ১৯৭২-এর সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদের কয়েকটি অংশে। আমরা যদি ১৯৭২-এর সংবিধানের শিক্ষাবিষয়ক অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করি তাহলে দেখব বঙ্গবন্ধু তার শিক্ষা দর্শনের মূল ভাবনাটাই প্রতিফলিত করেছেন ১৭ অনুচ্ছেদে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পর বাংলাদেশের সংবিধানে 'সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা' বিষয়টি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা হয়, যা মূলত বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শনের প্রতিফলন। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞানমুখী করার জন্য বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বেতন মওকুফ করা হয় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় ১৯৭২ সালের ১৫ জানুয়ারি। এ ছাড়া ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য ৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়। বঙ্গবন্ধু বিনামূল্যে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং শতকরা ৪০ শতাংশ কম দামে ষষ্ঠ থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক বিতরণের ব্যবস্থা করেন। বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ও ভাবনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন ঘটে প্রতিরক্ষা খাতের থেকে শিক্ষা খাতে ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা বেশি বরাদ্দের বিষয়টি। বঙ্গবন্ধু শিক্ষাকে গণমুখী করার জন্য এবং শিক্ষার মূল বিষয় সচেতন ও আলোকিত মানুষ গড়ার জন্য তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে গ্রামে গিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন।
১৯৭২-এর সংবিধানে শিক্ষাক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর চিন্তার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় ১৭নং অনুচ্ছেদে। ১৭ অনুচ্ছেদের 'ক' ধারায়- একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা, ১৭ অনুচ্ছেদের 'খ' ধারায় সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষাকে সংগতিপূর্ণ করতে এবং প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নাগরিক সৃষ্টি, ১৭ অনুচ্ছেদের 'গ' ধারায় আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশনা আছে। ১৯৭১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬.৮% এবং ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার দাঁড়ায় ২৫.৯০ শতাংশ (সূত্র :বিশ্বব্যাংক)। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রায় ১১ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনসহ প্রায় ৪০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন এবং গণশিক্ষা প্রসারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে আড়াই কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। বঙ্গবন্ধু কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন, যাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে ওঠে। শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকর, আইনগত এবং নীতিগত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৭২ সালে কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন, ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ড কমিশন অব বাংলাদেশ অধ্যাদেশ ১৯৭৩, বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশ ১৯৭৩, বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অধ্যাদেশ ১৯৭৩, প্রাথমিক স্কুল অ্যাক্ট ১৯৭৪সহ প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্যদিয়ে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শনের আলোকে পদক্ষেপগুলোর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। পর্যালোচনায় দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুতনয়া শেখ হাসিনার শিক্ষা খাতে প্রতিটি পদক্ষেপই বঙ্গবন্ধুর দর্শন দ্বারা প্রতিফলিত। বঙ্গবন্ধুর মতো শেখ হাসিনাও প্রাথমিক শিক্ষায় দৃশ্যমান অগ্রগতি এনেছেন। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কর্মসূচি সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করছেন। এ ছাড়া একাডেমিক ক্যালেন্ডার করে শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়মিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন হচ্ছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য নিক ভাষায় পাঠ্যবই থেকে শুরু করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক দেওয়া হয় এই সরকারের সময়ে। প্রান্তিক স্তর পর্যন্ত বৃত্তি, উপবৃত্তি, মেধাবৃত্তির টাকার পরিমাণ ও সংখ্যা বৃদ্ধিসহ সম্প্রসারণ এবং প্রদান করার মধ্যে দিয়ে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শনে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার অনুকরণে শেখ হাসিনা কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেন। ২০২০ সালে কারিগরি শিক্ষায় ছাত্রছাত্রী ভর্তির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ শতাংশ, যা ২০০৯ সালের আগে ছিল শতকরা ১ শতাংশেরও কম। এ লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডাবল শিফট চালুসহ প্রতি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল স্থাপন, ৪টি বিভাগীয় শহরে মহিলা পলিটেকনিক মহাবিদ্যালয় স্থাপন, ৪টি বিভাগীয় শহরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করা অন্যতম উদ্যোগ। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত আইসিটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে শেখ হাসিনার সরকার।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছেন এবং বাস্তবায়ন করেছেন। ১৯৯৬ সালে সরকারে এসে তিনি সারাদেশে ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৬টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে। এরপর ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান সময়ে পর্যন্ত ২১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ৫৫টির বেশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে শেখ হাসিনার সরকার। দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এর মধ্যে। এ ছাড়া রয়েছে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়-যার মধ্যে কৃষি, চিকিৎসা, মেরিটাইম, ডিজিটাল, টেক্সটাইল, ফ্যাশন টেকনোলজি, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করেছেন ২০১০ সালে। উচ্চশিক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগও বাস্তবায়ন করেছে শেখ হাসিনা সরকার, যা বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শনের অনুসরণে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন :উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।