দেশের বড় অংশের মানুষকে টিকার বাইরে রেখে শুরু হয়েছে বুস্টার ডোজ- বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে কথা উঠেছে। একই সঙ্গে এখন পর্যন্ত যারা টিকার আওতায় আসতে পারেননি, তাদের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চারের খবরও সংবাদমাধ্যমেই উঠে এসেছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর উদ্যোগ নিয়েছে, করোনা প্রতিরোধে নিয়মিত গণটিকার পাশাপাশি বুস্টার ডোজও চলবে সমানতালে। ইতোমধ্যে যারা দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন, নতুন করে তাদের আর রেজিস্ট্রেশন করতে হবে না। তাদের মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বুস্টার ডোজ নেওয়ার খুদেবার্তা পৌঁছে যাবে। করোনা সংক্রমণের প্রায় ২১ মাস পর আমরা এর ধরন পরিবর্তনের ফের বার্তা পেলাম। নতুন ধরন 'ওমিক্রন' ইতোমধ্যে অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে।
টিকা পাওয়ার উপযোগী সবাইকে এর আওতায় নিয়ে আসা হবে- এ প্রতিশ্রুতি-অঙ্গীকার রয়েছে। আমরা সেখান থেকে সরে এসেছি তা বলব না। কিন্তু টিকার আওতায় সবাইকে না নিয়ে আসার আগেই বুস্টার ডোজ শুরু করা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন উঠেছে তা উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। টিকাদানে আমরা যেহেতু লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও এখন পর্যন্ত পূরণ করতে পারিনি, এমতাবস্থায় বুস্টার ডোজ কার্যক্রম শুরু করা নিয়ে টিকার সমতার বিষয়ে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে। করোনার নতুন ধরন যখন বিশ্বের অনেক দেশে, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও চোখ রাঙাচ্ছে, তখনও আমাদের দেশে টিকাগ্রহীতার সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে দূরে। টিকা নিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য আমাদের আরও কিছু উদ্যোগ নিয়ে এ ক্ষেত্রে গতিশীলতা আনায় জোর দেওয়া জরুরি ছিল। যারা একেবারেই টিকার আওতায় আসেননি, তাদের অনেকেই প্রক্রিয়াগত জটিলতায় পড়ে তা পারেননি বা পারছেন না, এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। বিদ্যমান সব জটিলতা দূর করে সবাইকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ব্যাপক ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আমাদের এগোতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনা সুচারু করা। যেহেতু আমাদের এখন টিকার বড় সংকট নেই, সেহেতু গণটিকার পাশাপাশি বুস্টার ডোজ চলতে পারে। তবে এর পুরো ব্যবস্থাপনা ত্রুটিমুক্ত করা জরুরি। আপাতত আমরা স্বস্তির মধ্যে থাকলেও নতুন করে অস্বস্তি ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে করোনার নতুন ধরন 'ওমিক্রন'। বারবার রূপ বদলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া করোনার এই নতুন ধরনের সংক্রমণক্ষমতা অনেক বেশি। এর সম্ভাব্য সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রস্তুতি হিসেবে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ইতোমধ্যে জোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে -এই বার্তা স্বস্তির। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, এ পর্যন্ত ৯০টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রামক এই ভাইরাস। জিম্বাবুইয়েফেরত আমাদের দু'জন নারী ক্রিকেটারও ওমিক্রনে সংক্রমিত হয়েছেন।
২২ ডিসেম্বর সমকালের শীর্ষে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'দ্রুত ছড়াচ্ছে ওমিক্রন, তৃতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা'। অন্য আরেকটি প্রতিবেদনের শিরোনাম- 'হিমশিম ইউরোপ, ছড়িয়ে পড়েছে ভারতেও'। আমি মনে করি, এ ব্যাপারে আতঙ্ক নয়, বরং সংক্রমিত কাউকে পেলে পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ওই কার্যক্রম শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বিদেশ থেকে যারা এসেছেন, তাদের মধ্যে ওমিক্রনে কেউ সংক্রমিত হয়ে থাকলে তা ছড়াতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন সংক্রমণ বিস্তার প্রতিরোধে সব রকম ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তবে ব্যক্তির দায়ও যে কম নয়, তা যেন আমরা ভুলে না যাই। আমাদের স্মরণে আছে, দেশে বিদেশ প্রত্যাগত বিশেষ করে ইতালি থেকে আসা সংক্রমিতদের মাধ্যমে করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। কাজেই ওমিক্রন যেসব দেশে ইতোমধ্যে শনাক্ত হয়েছে, সেসব দেশ থেকে প্রত্যাগতদের ব্যাপারে যেমন বিশেষ ব্যবস্থা সময়ক্ষেপণ না করে নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তেমনি ওই সব দেশ থেকে দেশে ফেরার ব্যাপারেও কঠোর কড়াকড়ি আরোপ জরুরি। দেশের প্রতিটি প্রবেশপথে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও বিকল্প নেই।


দুঃখজনক হলেও সত্য, বিশ্বব্যাপী করোনার টিকাবৈষম্য এখনও বিদ্যমান। এ কারণেও করোনার নতুন ধরন তৈরি হচ্ছে। যেসব জায়গায় টিকা পৌঁছায়নি, সেখানে প্রতিনিয়ত নতুন ধরন সৃষ্টি করছে এই ভাইরাস। দেশে নতুন ধরনের সংক্রমণ ঠেকাতে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে জোর দিতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে সবার জন্য টিকা নিশ্চিত করে এরপর বুস্টার ডোজও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সত্য এড়ানো যাবে না, আফ্রিকার অনেক দেশ আছে, যেখানে ১ শতাংশ টিকাও দেওয়া হয়নি। করোনা বড় ধরনের বৈশ্বিক সমস্যা। তাই এর প্রতিরোধে যূথবদ্ধ প্রয়াস-আন্তরিকতার বিকল্প নেই। এর প্রতিরোধে কোনোরকম বৈষম্য জিইয়ে থাকা মানেই সবাই ঝুঁকিতে থাকা। আমরা এখনও নতুন ধরনের সংক্রমণের দিক থেকে নিরাপদে আছি বটে, কিন্তু তাই বলে নিশ্চিন্তে বসে থাকার অবকাশ নেই। নতুন প্রেক্ষাপটে আমাদের ফিরে যেতে হবে আগের অভ্যাসে। সব রকম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায় তো শুধু সরকারেরই নয়, ব্যক্তিরও। নতুন বাস্তবতায় সারা বিশ্বকে একযোগে কাজ করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ- আয়োজনেরও বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রীতিকর নয়। বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিশেষ ধরনের আরটিপিসিআরে 'ওমিক্রন' ধরন প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা যায়, যা পরে জিনোম সিকোয়েন্স করে নিশ্চিত করা যায়। দেশে আইইডিসিআর ছাড়া এ ধরনের আরটিপিসিআর নেই। আমি মনে করি, বড় বড় হাসপাতালে নতুন ধরন শনাক্তে বিশেষ আরটিপিসিআর বসানো প্রয়োজন। এভাবে যদি আমরা নজরদারি শক্তিশালী করতে পারি, তাহলে প্রথমে তা শনাক্ত করা যাবে এবং সেই নিরিখে নেওয়া যাবে ব্যবস্থাও।
নতুন প্রেক্ষাপটে আমাদের হাসপাতালসহ আনুষঙ্গিক কোনো ক্ষেত্রেই যেন ঘাটতি না থাকে, তাও নিশ্চিত করা জরুরি। সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। বিভিন্ন উৎস থেকে টিকার চাহিদার নিরিখে সংগ্রহ প্রক্রিয়া জোরদার করা, আমাদের নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার পথ মসৃণ করা এবং টিকাদান কর্মসূচির পরিসর ক্রমবৃদ্ধিরও বিকল্প নেই। নজরদারির ব্যাপারে অধিকতর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এ জন্য খুব জরুরি, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে না পারে। যারা ইতোমধ্যে দুই ডোজ টিকাই নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেকটাই কম।
তারা সংক্রমিত হলেও বিপদাশঙ্কা হয়তো প্রকট হয়ে উঠবে না। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষের আচরণ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় শতভাগ সচেতনতা-সতর্কতা। কিন্তু এও মনে রাখা জরুরি, টিকা দেওয়া মানেই কিন্তু নিরাপদ হয়ে যাওয়া নয়। কাজেই স্বাস্থ্যবিধির ব্যত্যয় ঘটানো মানে নিজেকে তো বটেই, অন্যকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া।
কীভাবে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ বন্ধ করা যায়- এ পদ্ধতি আমাদের দেশের সিংহভাগ মানুষই এখন জানেন। কিন্তু উদ্বেগের কারণ হলো, অনেকেরই তা মেনে চলতে অনাগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। সঞ্চিত সব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে সর্বাগ্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. মুশতাক হোসেন : উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর