ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতি

‘দেখানো’র নির্বাচনে নতুন কী দেখা যাবে?

‘দেখানো’র নির্বাচনে নতুন কী দেখা যাবে?
×

হাসান মামুন

হাসান মামুন

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০৫:১১

নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিপক্ষ না থাকলে কোনো ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ যে হয় না- সেটা অস্বীকারের সুযোগ নেই। প্রকাশ্যে না হলেও একান্ত আলাপে সরকার সমর্থকরাও এটা স্বীকার করছেন। সরকারও চাইছে আসছে নির্বাচনে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখাতে; সেটা সমমনা দলগুলোর মধ্যে হলেও। মাঠের বিরোধী দল বিএনপি পারত বিদ্যমান পরিস্থিতিতেই নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিতে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের ভিন্ন একটা পরিস্থিতি দেখতাম।

এর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালের নির্বাচনে কিন্তু তারা অংশ নিয়েছিল। তবু সেটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি। ‘অংশগ্রহণমূলক’ হলেও নির্বাচন যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নাও হতে পারে, তার ভালো উদাহরণ ২০১৮-এর নির্বাচন। সে অভিজ্ঞতার কারণেও বিএনপি এবারের নির্বাচনে আসতে রাজি হয়নি। এবারের নির্বাচনের ওপর অবশ্য প্রভাবশালী যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের গভীর দৃষ্টি রয়েছে। নতুন এ উপাদানটিও বিএনপিকে নির্বাচনে উৎসাহী করতে পারেনি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সরকারও চায়নি তারা আসুক। সেটা তাদের লক্ষ্য অর্জনের পথে বাড়তি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করত। তার বদলে এখন সহজ হয়ে গেছে নির্বাচন পার করাটা!

বাধা একটাই– জোটসঙ্গী ও সমমনা যাদের আনা গেল, তাদের শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে ধরে রাখা। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কিন্তু নির্বাচন থেকে সরে যাওয়া যায়। ভোট গ্রহণ চলাকালেও নির্বাচন বর্জন করা সম্ভব। ফলও প্রত্যাখ্যান করা যায়। সংসদে যোগ দিয়েও পদত্যাগের সুযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকারকে সহায়তায় যারা এগিয়ে এসেছে, তাদের সঙ্গে এমন কিছু করা যাবে না, যাতে তারা বেঁকে বসে। তাদের ধরে রেখে বরং দেখানোর চেষ্টা করতে হবে, বিএনপি নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকলেও এটাকে ‘অংশগ্রহণমূলক’ করা যায়। সংসদকেও ‘বহুদলীয়’ রূপে হাজির করা সম্ভব। যারা এ প্রকল্প হাতে নিয়েছেন, তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এটা করে দেখানো।

কাকে ‘দেখানো’ হচ্ছে, সেটা অবশ্য প্রশ্ন। বিশ্ব সম্প্রদায়ের যে অংশটি এখানে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায়, তারা কি এমন নির্বাচন এই প্রথম দেখছে? দেশের মানুষও কি এ ধরনের নির্বাচন আর দেখেনি? বয়সের কারণে যারা সামরিক শাসনামলের ‘পাতানো নির্বাচন’ দেখেনি, তারাও নিকট অতীতে ২০১৪ সালে এমন নির্বাচন হতে দেখেছে। ২০১৮ সালেরটিও ‘আসন ভাগাভাগির নির্বাচন’ ছিল বলে মনে করা হয়। এমন অভিযোগও রয়েছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন পাবে বলে সমঝোতার ভিত্তিতে খোদ বিএনপিই এতে অংশ নিয়েছিল। তাদের হয়তো আশা ছিল, ক্ষমতায় ফিরতে না পারলেও সংসদে প্রধান বিরোধী দলের হৃত অবস্থান পুনরুদ্ধার করা যাবে। তার পরেরটা পরে দেখা যাবে! কিন্তু নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (জাপা) বেরিয়ে আসে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে। বিএনপি পায় মোটে ৭টি আসন। 

এত কমসংখ্যক আসন নিয়ে কী করবে, সেটা ভেবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে দলটি। একটা পর্যায়ে সংসদ থেকে বেরিয়ে আসে তারা; কিন্তু রাজপথেও সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি। দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি তাদের। এ কাজে প্রশাসন থেকে সরকার পেয়েছে নজিরবিহীন সহায়তা। সেটা পাওয়ারই কথা। কেননা, ততদিনে প্রশাসনযন্ত্রে ক্ষমতাসীনদের অদৃষ্টপূর্ব কর্তৃত্ব কায়েম হয়েছে। এ অবস্থায় মাঠে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা প্রায় অসম্ভব। তা সত্ত্বেও পশ্চিমা চাপের সুবাদে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নজির গড়তে পেরেছিল বিএনপি। নিত্যনতুন বাধার মুখেও বড় বড় জমায়েত রচনায় সক্ষম হয় দলটি। জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করতেও সক্ষম হয়। তবে ২৮ অক্টোবরেই ঘটে এর পরিসমাপ্তি। সেদিন কী ঘটেছিল, তা মোটামুটি সবার জানা। সেটি পুঁজি করে নির্বাচনের আগে কেমন পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে, সেটাও কারও অজানা নয়। পশ্চিমা প্রতিশ্রুতিতেও নির্বাচনে এসে বিএনপি যেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে না পারে, সরকার সেটা নিশ্চিত করেছে। সে কারণেই বোধ হয় তপশিল ঘোষণার আগমুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘নিঃশর্ত সংলাপ’-এর প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেয় সরকার। তার ‘নির্বাচনের ট্রেন’ ছেড়ে দিয়েছে তখন। এতে যাত্রী হয়েছে শুধু সমগোত্রীয়রা। এভাবে যেতে যেতেই নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ করে দেখানোর চেষ্টা চলছে এখন।

চেষ্টাটা একান্তই সরকারের। নির্বাচনে এক ধরনের ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ দেখাতে তারা এমনকি নিজ দল থেকে স্বতন্ত্র ও ডামি প্রার্থী রাখতে ইচ্ছুক। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে– কেউ যেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যেতে না পারেন। ক্ষমতাসীনরা স্পষ্টতই চাইছেন ২০১৪ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে। সেটা নিতান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে হলেও। আর নির্বাচন কমিশন বলছে, ‘আগের রাতে ভোট’ হয়ে যাওয়ার মতো অভিযোগ আর উঠতে দেওয়া হবে না। সে জন্য কেন্দ্রে ব্যালট পেপার পাঠানো হবে ভোটের দিন ভোরে।

ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টাও এবার করা হবে। এ জন্য স্বয়ং সরকারপ্রধান নাকি চাইছেন সমমনা দল, এমনকি জোটসঙ্গীরা নিজ সক্ষমতায় ভোট করুক। কিন্তু তাদের কারোরই নাকি সক্ষমতা নেই জিতে আসার। আগে হয়তো কারও কারও ছিল; তবে গত ১৫-১৭ বছরে সে সক্ষমতা হারিয়েছেন। ২০০৮ সাল থেকে সরকারের সহযোগী জাপারও ভোট কমেছে এবং এমনকি ‘নিজেরা নিজেরা’ নির্বাচনে জিতে আসার সক্ষমতাও কমেছে। যাদের কিছুটা সক্ষমতা রয়েছে, তাদেরও মনোভাব হলো, এ ধরনের নির্বাচনে ‘ঝুঁকি নেওয়া’র কী দরকার! এদের অভিন্ন চাওয়া– ক্ষমতাসীন দলের এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থীও যেন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না থাকেন।

এদিকে ক্ষমতাসীন দল নিজেই আছে স্বতন্ত্র ও ডামিদের নিয়ে দুশ্চিন্তায়। তাদের ক’জনকে মাঠে রাখবে, ক’জনকে বসিয়ে দেবে– সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা কমছে না। এ অবস্থায় জোটসঙ্গী ও সমমনা দলগুলোর এমপি হতে ইচ্ছুকদের নির্বিঘ্নে জেতার ব্যবস্থা করা কঠিন। এমন ধারার নির্বাচনে সব দলেই এমপি হওয়ার আকর্ষণ তো বেড়েছে। এ অবস্থায় পশ্চিমা চাপে বেকায়দায় থাকা সরকারকে ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ অনুষ্ঠানে সহায়তা করতে যারা এগিয়ে এসেছেন, তাদের সবারই আছে নির্বিঘ্নে এমপি হওয়ার চাহিদা। সরকার এখন কী করবে? হয় দলীয় প্রার্থীদের বসিয়ে দিয়ে জোটসঙ্গী ও সমমনাদের প্রত্যাশিত মাত্রায় জিতিয়ে এনে পুরস্কৃত করা। নইলে নিজ দলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করে তাদের নতুন দল গড়তে বলা। তখন সেটাই হবে প্রধান বিরোধী দল। এ অবস্থায় জাপা হয়তো নির্বাচন বর্জন করবে।

মাঠের বিরোধী দল নির্বাচনে নেই; সংসদের বিরোধী দলও নেই; এতে নির্বাচনটি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হবে হয়তো। তাতেও সমস্যা নেই, নতুন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে। ‘কিংস পার্টি’গুলোর পারফরম্যান্স ভালো হলে অবশ্য জাপার দরকষাকষির ক্ষমতা এমনিতেই কমত। জোটসঙ্গীদেরও যেটুকু কদর রয়েছে, তা থাকত না।

এখন কীভাবে কী করা, সেটা স্থির করবে ক্ষমতাসীন দলের হাইকমান্ড। নির্বাচন যেভাবে খুশি করে ফেলতে পারবে তারা। আরেকটি মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার ক্ষেত্রে দেশের ভেতর থেকে গণ্য করার মতো কোনো বাধা তো নেই। অবস্থা এমন যে, ৩০০ আসনেই জেতা বোধ হয় সম্ভব। সেটা তো আর হয় না। তাই নিজেদের আসন যথাসম্ভব কমিয়ে, সহযোগীদের দিয়ে-থুয়ে নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ ও সংসদকে ‘বৈচিত্র্যময়’ দেখানোর কাজটা করতে হবে সযত্নে। তবু গোড়ার প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে– কাকে দেখানো?

আর এসব দেখে তারা কি ‘লা-জবাব’ হয়ে থাকবেন?

হাসান মামুন: সাংবাদিক, বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×