ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকৃতি ও সংস্কৃতি সুরক্ষার কারিগর

প্রকৃতি ও সংস্কৃতি সুরক্ষার কারিগর
×

ইউসুফ মোল্লা (১৯৪৯-২০২২)

পাভেল পার্থ

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২২ | ১৩:২৭

২০১৩ সালে 'পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ' শ্রেণিতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে 'জাতীয় পরিবেশ পদক' পেয়েছেন ইউসুফ মোল্লা। রাজশাহীর তানোরের পাঁচন্দর ইউনিয়নের দুবইল গ্রামের এই কীর্তিমান নিজ গ্রামে গড়ে তুলেছেন তিন শতাধিক দেশীয় ধানের 'বরেন্দ্র বীজ ব্যাংক' এবং গ্রামীণ প্রত্নতত্ত্ব সামগ্রীর এক দুর্লভ সংগ্রহশালা। শুধু নিজ এলাকাতেই নয়; দেশের নানা প্রান্তে পরিচিতি ও জনপ্রিয় হয়েছেন তিনি। হয়ে উঠেছেন সবার প্রিয় 'মোল্লা ভাই'। বাস্তবিক অর্থেই কৃষিপ্রধান বাংলার কৃষিজগৎ আজ দীর্ণ ও নড়বড়ে। একদিকে দেশের গ্রামীণ তরুণ কৃষি থেকে উদ্বাস্তু হচ্ছে; অন্যদিকে শহুরে কিছু তরুণ নতুন স্বপ্ন নিয়ে কৃষিকে আগলে নিজের পরিচয় দাঁড় করাচ্ছে। নিরাপদ, প্রাকৃতিক কৃষি ফসলের জোগান নিশ্চিতকরণে উদ্যোক্তা ও সংগঠক হওয়ার সাহস করছে। ইউসুফ মোল্লা এমন স্বপ্নময় তরুণদের দেশি শস্য-ফসল জোগান দিয়েছেন; মজবুত করেছেন নতুন প্রজন্মের তরুণদের কৃষিজাত স্বপ্ন-সাহসকে। ইউসুফ মোল্লার সঙ্গে আমার সম্পর্ক মাত্র ১২ বছরের। প্রথম সাক্ষাৎ ২০১০ সালে। বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের মাধ্যমে দেশের নানা প্রান্তে আমি তখন 'কৃষি প্রাণবৈচিত্র্য মেলা' আয়োজন ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছি। তানোরের মেলায় ইউসুফ মোল্লা তার সংগ্রহ সামগ্রীর একটি স্টল দিয়েছিলেন। অহিদুর রহমান ইউসুফ মোল্লার তথ্য নথিভুক্ত করেছিলেন। ২০১২ সালের আগস্টে প্রথম তার বাড়িতে শিক্ষা গ্রহণের জন্য যাই। প্রতিবেলায় খাবারের থালা আমাকে চমকে দিত। মাগুরশাইল, মুগী, চেংগুর, দাদখানি, রাঁধুনিপাগল ধানের ভাতের সঙ্গে থাকত কলা বড়া, করলা পাতার বড়া, ডালের বড়ি, ডালকচু, মানকচু, লাউপাতা, সজনে, গিমা, লটপটে শাক, কলমি, ডুমুর ভাজি কিংবা পাতাকচু ভর্তা। বরেন্দ্রর কোন ধানের ভাতের সঙ্গে কোন পদের তরকারি মানানসই- এমন সরেজমিন গবেষণার দুর্লভ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি মোল্লা ভাইয়ের বাড়িতেই। শিখেছি বরেন্দ্র অঞ্চলের তাল ও আমের জনশ্রেণিবিন্যাস। জেনেছি প্রাচীন বরেন্দ্রগীতি, মাদারের গান থেকে শুরু করে আদি কৃষিবচন। ইউসুফ মোল্লা যখন আগের দিনের আদিবাসী-বাঙালির মধুর সম্পর্কের কথা বলতেন, তার চোখ থেকে স্বর্গীয় দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ত। আবার শিব নদীর ধারে একদিন দাইরসা (দারুসা) দাঙ্গার কথা বলতে গিয়ে অঝোরে কেঁদেছেন; শেষ করতে পারেননি। ২০২২ সালের ১৪ জানুয়ারি সকালে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন আমাদের প্রিয় 'মোল্লা ভাই'। যখন তার শেষযাত্রার সঙ্গী হই, দেখি পুরো দুবইল গ্রাম যেন নানা জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-বয়সের মানুষে আরেক সংগ্রহশালা। চলতি আলাপখানি ইউসুফ মোল্লার জীবন ও কর্ম এবং দর্শনের সংমিশ্রণে এক স্মৃতিকাতর অভিজ্ঞতার বিনম্র বয়ান।

হারিয়ে যাওয়া ঘুমপাড়ানি গান

১৩৫৫ বঙ্গাব্দে জন্ম ইউসুফ আলীর। মা জোবেদা বিবি, বাবা আবদুর রহমান। আট ভাইবোনের ভেতর ইউসুফ ছিলেন দ্বিতীয়। তার অন্য ভাইবোন হলেন- আমেনা বিবি, হালেনূর বিবি, জয়নূর বিবি, রহিমা বিবি, রাশেদা বিবি, জাবেদ আলী এবং জাহিদুর রহমান। দুবইলে নছর পণ্ডিতের পাঠশালায় বাল্যশিক্ষার পাঠ নেন তিনি। ১৯৬৪ সালে ভর্তি হন দুবইল বিদ্যালয়ে। সেখানে চতুর্থ শ্রেণি পাসের পর ভর্তি হন চানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। 'পারিবারিক কৃষির আবহে তার কৃষিশিক্ষার হাতেখড়ি। কৃষিকাজের পাশাপাশি তরুণ বয়সে কিছুদিন চানপুর মসজিদে ইমামতি করেছিলেন। মান্দার ভদ্রসেনা গ্রামে এতিম বাচ্চাদের জন্য একটি মাদ্রাসাও তৈরি করেন। সেই থেকে ইউসুফ আলী হয়ে যান 'ইউসুফ মোল্লা'। বিয়ে হয় মোসলেমা বেগমের সঙ্গে। তাদের তিন ছেলে, এক মেয়ে। ৯৫ বছর বয়সে ইউসুফ মোল্লার নানি নছিরজান মারা যান। শৈশবে নানির কাছেই প্রাচীন ঘুমপাড়ানি গান শুনেছেন ইউসুফ। 'বাসলি বেরাম' বা অর্ধাঙ্গ রোগের চিকিৎসা হতো এক সময় গান গেয়ে। ইউসুফ মোল্লা বাসলি বেরাম চিকিৎসার এমন কয়েকটি দুর্লভ গান শুনিয়েছিলেন। ১৩২৮ বঙ্গাব্দে নওগাঁর গফুর মোল্লা নামে একজন খুন হয়ে রাজশাহীর মোহনপুরের মোল্লা ডায়িংয়ের ক্ষ্যাপা ফকির ওই ঘটনায় একটি সারিগান বাঁধেন। ইউসুফ মোল্লা শৈশবে সেই গান শুনেছেন। বিদ্যালয়, পারিবারিক কৃষি আর বরেন্দ্রর প্রাচীন লোকসংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল ইউসুফ মোল্লার এক মানবিক মনস্তত্ত্ব।

বৈচিত্র্য আর বৈভবের স্মৃতিকথা

ইউসুফ মোল্লার কাছে বরেন্দ্রর বৈচিত্র্য আর বৈভবের গল্পের ভাণ্ডার ছিল। বলেছিলেন বরেন্দ্র অঞ্চলের তিন জাতের তালের কথা। হাড়ে তাল, তাল ও বাথাইনা তাল। বুটপুচি, আষাঢ়ে, খাটাইনা, মটমইটা, কাঁচামিঠা, লাইয়া, চিতরি, সেতি, সেইংরা, সিন্ধুরা, সিথি, গোলাপবাড়ি, বৌভুলানি, ঢলঢইলা, পাগাইড়া, দাউদা, করমজা, কাজি, কেলাকিচা, খাটাইশা, লুকচুষি, গুঠি, হাতিবান্ধা, খইরতি, যশফুল, লুদা ও বেলি- এমন নামের প্রাচীন আমের জাতও নাকি ছিল এক সময়। কার বাড়ির কোনদিকে এসব আমগাছ ছিল, সেসব বলেছিলেন মোল্লা ভাই। দুবইল গ্রামের গোরস্তানে চান মোহাম্মদ ঝরু একটি পাকুড়ের চারা লাগান। একবার সেই গাছ কিছু যুবক কেটে ফেলতে চেয়েছিল। ঝরু আর ইউসুফ মোল্লা বাধা দেন। আজ এই গাছে প্রচুর পাখির বাস। এই বিশাল পাকুড়তলায় আজ শায়িত আরেক বটবৃক্ষ ইউসুফ মোল্লা। তানোরের বিলকুমারী কিংবা শিব নদী নিয়ে প্রচুর কাহিনি ছিল তার। ইউসুফ মোল্লা ছিলেন রাসায়নিক কৃষির ঘোরতর বিরোধী। বিশেষ করে কৃষিজমিতে বিষ ব্যবহারের বিপক্ষে কৃষকদের সচেতন করতেন। তিনি দেখিয়েছেন জমিতে লাঙলঘেঁষা কিংবা দুবরাইল ঘাস থাকলে তা মানুষ ও গবাদি পশুর কাজে লাগে। ১ বিঘা জমিনের ঘাস বাছতে গ্রামের পাঁচজন গরিব মানুষ কাজ পায়। বরেন্দ্র অঞ্চলের দুর্যোগপ্রস্তুতির নানা কৌশল তিনি শিখিয়েছেন তরুণদের। বিশেষ করে খরার দিনে তেঁতুল ও টকের খাটা রান্না করে খাওয়া কিংবা মাটির ঘরের গুরুত্ব।

এক বিরল সংগ্রহশালা

ইউসুফ মোল্লার সংগ্রহশালা, বীজব্যাংক আর রাঁধুনিপাগল ধানের পুনরুত্থান নিয়ে বহু সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। গ্রামের একজন কৃষকের সংগ্রহশালা গড়ে তোলা বড় নয়, বরং তিনি উপলব্ধি করেছেন গ্রামীণ সংস্কৃতির ইতিহাস সুরক্ষার; সেটিই প্রধান বিষয়। ১৩৮০ বঙ্গাব্দে দুবইল গ্রামের মো. আমজাদ আলীর ঘর থেকে তিনি প্রথম কালো মাটির নকশা করা একটি মাটির বয়াম সংগ্রহ করেন। আগের দিনে এসব বয়ামে নুন রাখা হতো। মাদার গানের বিখ্যাত শিল্পী নজু সর্দারের একটি কাঠ ও দস্তার তৈরি 'আশাবাড়ি' ছিল তার পুত্র তানোরের যশপুরের বদর আলী সর্দারের কাছে। ১৪১৮ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে ইউসুফ মোল্লা সেটি সংগ্রহ করেন। ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে এক সাঁওতাল গ্রাম থেকে একজন সোনাকাঠি ধান সংগ্রহ করে আনেন। ইউসুফ মোল্লা সেই ধান মাটির ভাণ্ডে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। প্রতিটি সংগ্রহের পেছনে ছোট-বড় গল্প জড়িয়ে আছে। যার কাছ থেকে যা সংগ্রহ করেছেন, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন সবার প্রতি। কিছু আদি ধানের নমুনা মাটির ভাণ্ডে প্রত্নচিহ্ন হিসেবে সংগ্রহ করলেও ধানের বৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রথমদিকে তার তেমন আগ্রহ ছিল না। বারসিকের সান্নিধ্যে ধানের জাত সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বীজবর্ধন কাজে জড়িয়ে পড়েন। তিন শতাধিক ধানের জাতের মাধ্যমে গড়ে তোলেন জীবন্ত 'বরেন্দ্র বীজ ব্যাংক'। প্রতি বছর নবান্ন আয়োজন করতেন সবাইকে নিয়ে। গ্রামীণ পিঠা আর নতুন ধানের হরেক রকম নমুনায় ভরপুর থাকত উৎসব। গ্রাম থেকে শহর, সাংবাদিক থেকে গবেষক, উদ্যোক্তা থেকে কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী থেকে শিল্পী, কৃষক থেকে লেখক বহু মানুষ সান্নিধ্য পেয়েছেন ইউসুফ মোল্লার। বহুজন নানাভাবে বরেন্দ্র বীজ ব্যাংক থেকে বীজ নিয়েছেন। হয়তো প্রশ্ন উঠতে পারে, কতজনে আর তার মতো এসব আদি জাতের সম্মান, মর্যাদা ও কদরের সুরক্ষা দিতে পেরেছেন?

ইউসুফ মোল্লা খুব গুরুত্বপূর্ণ এক দার্শনিক প্রশ্ন হাজির করেছেন তার কাজের ভেতর দিয়ে। সেটি হলো প্রকৃতি ও সংস্কৃতি কেনোভাবেই আলাদা করে সুরক্ষিত হতে পারে না। প্রকৃতি ও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক সম্পর্ক আছে। এ সম্পর্কের নমুনা একেক এলাকায় একেক রকমের। একেক জনজীবনে একেকভাবে এ সম্পর্ক বিরাজিত। ইউসুফ মোল্লা বলেছেন, '...এই জীবনপাঠের নেশা বড় নেশা। এই নেশা তালের তাড়ির নেশার চেয়েও ভারি। একবার যে এই নেশায় পড়েছে, সারাজীবন তার কেটে যায় কেবল দেখতে দেখতে, শিখতে শিখতে আর বুঝতে বুঝতে। আর এভাবেই একজন সংগ্রহ করতে শুরু করেন। যা কিছু সংগ্রহ করি দেখা যায় আমরা নিজেদের ইতিহাসকেই সংগ্রহ করছি।' ক্রমেই ইতিহাসবিচ্ছিন্ন হয়ে ওঠা আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে তাই বারবার ইউসুফ মোল্লার কাজ ও দর্শনকে অবশ্যপাঠ্য করে তোলা জরুরি।

পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক
animistbangla@gmail.com

আরও পড়ুন

×