ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ

ভেরিফিকেশন যেন যোগ্যতার বাধা না হয়

ভেরিফিকেশন যেন যোগ্যতার বাধা না হয়
×

একই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জেলার ভেরিফিকেশন পদ্ধতিতে কি কোনো অসামঞ্জস্য ছিল?

সাব্বির নেওয়াজ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১:৫৬

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও পুলিশ ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন—এমন প্রার্থীর সংখ্যা কম নয়। নিয়োগপ্রক্রিয়ার একেবারে শেষ ধাপে এসে চাকরি না পাওয়ার এই ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে যারা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে মেধাক্রমে জায়গা করে নিয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশনের পর বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এখন জরুরি।

সরকারি চাকরিতে পুলিশ ভেরিফিকেশন গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রার্থীর পরিচয়, নাগরিকত্ব, ঠিকানা, অতীতের কোনো গুরুতর তথ্য বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয় যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ভেরিফিকেশন নিজেই যদি অস্পষ্টতা ও প্রশ্নের জন্ম দেয়, তাহলে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এখানেই এবারের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ‘ভেরিফিকেশন বিতর্ক’-এর মূল জায়গাটি।
চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত একজন প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ‘নেতিবাচক ভেরিফিকেশন’ বলা যথেষ্ট নয়। কী তথ্যের ভিত্তিতে রিপোর্ট নেতিবাচক হলো, সেই তথ্যের সত্যতা কতটা যাচাই করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর থাকা প্রয়োজন। কারণ পুলিশ ভেরিফিকেশনের কোনো ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ অনুসন্ধান কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের ভুল বোঝাবুঝির কারণে একজন যোগ্য প্রার্থী চাকরি হারালে তার দায় কে নেবে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভেরিফিকেশন কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া নয়। এটি নিয়োগের একটি যাচাই-পর্ব। ফলে কোনো অভিযোগ, মামলা বা স্থানীয় বিরোধের অস্তিত্ব থাকলেই একজন প্রার্থী স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য হয়ে যাবেন—এমন নীতি ন্যায়সংগত হতে পারে না। অভিযোগের প্রকৃতি, মামলার অবস্থা, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং অভিযোগের সঙ্গে প্রার্থীর প্রকৃত সংশ্লিষ্টতা—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—একই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জেলার ভেরিফিকেশন পদ্ধতিতে কি কোনো অসামঞ্জস্য ছিল? কোথাও প্রার্থী নিয়োগপত্র পেয়েছেন, আবার কোথাও একই ধরনের তথ্যের কারণে কেউ বাদ পড়েছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘটনায় একই ধরনের মানদণ্ড প্রয়োগ না হলে বৈষম্যের অভিযোগ উঠতেই পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বাদ পড়া প্রার্থীদের অনেকেই এখন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে জানতে পারছেন না—তাদের ঠিক কোন কারণে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। চাকরির প্রত্যাশায় বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেওয়া একজন প্রার্থী চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পর যদি জানতে পারেন তিনি বাদ পড়েছেন, অথচ কারণটি পরিষ্কার নয়, তাহলে তার হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

এই পরিস্থিতিতে পুনরায় যাচাইয়ের উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। এটি হলে সেটি হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নথিনির্ভর। প্রয়োজনে ভিন্ন কর্মকর্তার মাধ্যমে তথ্য পুনরায় যাচাই করা যেতে পারে। তবে শুধু ‘ফের ভেরিফিকেশন’ করলেই হবে না; আগের রিপোর্টে কোথায় ভুল বা অসংগতি ছিল, সেটিও চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রার্থীদের বক্তব্য শোনার সুযোগ দিতে হবে।

বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আলোকে। কমিশন সরকারি চাকরিতে নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রচলিত পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রথা বাতিলের সুপারিশ করেছিল। কমিশনের চেয়ারম্যান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বলেছিলেন, চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক থাকার প্রয়োজন নেই। পরে সংস্কার-প্রস্তাবে আরও নির্দিষ্টভাবে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগে প্রার্থীর পুলিশ ভেরিফিকেশন না করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে অপরাধসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে চূড়ান্ত নিয়োগের আগে তা করার সুযোগ রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। অর্থাৎ সংস্কারের মূল ভাবনা ছিল—যোগ্যতা নির্ধারণের প্রতিযোগিতামূলক ধাপ থেকে পুলিশি যাচাইকে আলাদা রাখা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অপরাধসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা। সেই প্রেক্ষাপটে চূড়ান্ত সুপারিশের পর ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রাথমিক শিক্ষক প্রার্থীদের বর্তমান সংকটটি নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি করে। অন্তত এতটুকু নিশ্চিত করা জরুরি যে, ভেরিফিকেশন যেন রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত বিরোধ, অস্পষ্ট অভিযোগ বা যাচাই-অযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে কোনো যোগ্য প্রার্থীর নিয়োগ আটকে দেওয়ার হাতিয়ার না হয়।

সরকারের জন্য বিষয়টি কেবল কয়েকজন প্রার্থীর চাকরির প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের মতো একটি বড় নিয়োগে স্বচ্ছতা, মেধা ও ন্যায্যতার প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রাখা জরুরি। ভুল হয়ে থাকলে তা সংশোধন করা প্রশাসনের দুর্বলতা নয়; বরং ভুল স্বীকার করে সঠিক সিদ্ধান্তে ফিরে আসাই দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

তবে বিপরীত দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভেরিফিকেশনে প্রকৃত ও গুরুতর নেতিবাচক তথ্য পাওয়া গেলে শুধু আন্দোলন বা সামাজিক চাপের কারণে কাউকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। যোগ্যতা ও সততার প্রশ্নে প্রশাসনকে কঠোর থাকতে হবে। অর্থাৎ সমাধান হতে হবে না ‘সবাইকে নিয়োগ’ কিংবা ‘সবাইকে বাদ’—বরং প্রত্যেক প্রার্থীর তথ্য পৃথকভাবে, প্রমাণের ভিত্তিতে এবং নিরপেক্ষ মানদণ্ডে যাচাই।

এখন প্রয়োজন তিনটি বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত। প্রথমত, বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীকে লিখিতভাবে কারণ জানানো। দ্বিতীয়ত, যাদের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে, তাদের তথ্য স্বাধীনভাবে পুনঃযাচাই করা। তৃতীয়ত, পুনঃযাচাইয়ের ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ও অভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করা।

প্রাথমিক শিক্ষক শুধু একজন সরকারি কর্মচারী নন; তিনি একটি শিশুর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সেই শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তার প্রভাব নিয়োগপ্রাপ্তদের পাশাপাশি পুরো শিক্ষা প্রশাসনের ওপর পড়ে।

তাই ‘ভেরিফিকেশন’ বিতর্ককে আন্দোলন বনাম প্রশাসনের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একে দেখতে হবে ন্যায়সংগত নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার একটি পরীক্ষা হিসেবে। ভুল থাকলে সংশোধন, অনিয়ম থাকলে ব্যবস্থা এবং যোগ্য প্রার্থীর অধিকার থাকলে তা নিশ্চিত—এই তিন নীতির সমন্বয়েই বিতর্কটির গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব।

সাব্বির নেওয়াজ : বিশেষ প্রতিনিধি, সমকাল
Sabbir.newaz@gmail.com

আরও পড়ুন

×