অধিকার
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সীমারেখা
শেখ ইউসুফ হারুন
প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা কোন দেশ গণতান্ত্রিকভাবে কতটুকু শক্তিশালী, সেটি পরিমাপে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশক ব্যবহার করে থাকেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১. নাগরিক অধিকার, ২. অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার, ৩. নাগরিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, ৪. রাজনৈতিক দল, ৫. অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, ৬. আইনের শাসন, ৭. সামরিক বাহিনী ও পুলিশের নিয়ন্ত্রণ, ৮. সরকারের জবাবদিহি, ৯. দুর্নীতি দমন, ১০. সংবাদমাধ্যম, ১১. সরকারের প্রতিক্রিয়াশীলতা।
এগুলোর মধ্যে সংবাদমাধ্যম একটি উল্লেখযোগ্য নির্দেশক। সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয়, যে দেশের সংবাদমাধ্যম যত স্বাধীন ও সার্বভৌম, সে দেশের গণতন্ত্র তত শক্তিশালী। সংবাদপত্রকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সংবাদপত্র সার্বভৌম ক্ষমতা ভোগ করে থাকে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারগুলোর বর্ণনা করা হয়েছে। সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদের (২) উপ-অনুচ্ছেদের (খ) ধারায় যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আমাদের সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। যেনতেনভাবে এ অধিকার ক্ষুণ্ণ করা যায় না। তা ছাড়া তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্প্রতি গণমাধ্যম কর্মীদের আইনি সুরক্ষা দিতে 'গণমাধ্যম কর্মী আইন' নামক একটি আইনের খসড়া প্রণয়ন করেছে, যা সংসদে উপস্থাপনের প্রক্রিয়াধীন।
সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে তার মধ্যে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, আদালত অবমাননা, মানহানি, অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া গেলেও শালীনতা ও নৈতিকতার সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা দেওয়া কঠিন। কারণ, শালীনতা ও নৈতিকতা স্থান-কাল- পাত্র, পরিবেশ-পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে। যেমন ধরা যাক, একজন কর্মকর্তা হাফপ্যান্ট পরে তার অফিসে গেলেন। এটি নিশ্চয় শালীনতাবিরোধী কাজ। যখন তিনি হাফপ্যান্ট পরে খেলার মাঠে যান তখন কেউ তাকে অশালীন বলবে না। অতএব এসব বিষয়ে যখন একজন সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশ করেন তখন তাকে খুবই সতর্ক থাকতে হয়।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংবাদিকের ইচ্ছা- অনিচ্ছায় বিধিনিষেধের সীমারেখা অতিক্রম করতে পারে। এতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে অস্থিরতা, ক্ষোভ ও হতাশাও জন্ম নিতে পারে। সে জন্য সাংবাদিকদের হেনস্তাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রয়োজনে সংক্ষুব্ধ পক্ষ মামলা-মোকদ্দমা করতে পারে; কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হামলা বা চাপ কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন প্রকৃত ঘটনা বর্ণনা করে প্রতিবাদ ছাপানোর অনুরোধ করেন, তখন অনেক ক্ষেত্রে তা ছাপানো হয় না। আর ছাপলেও ভেতরের পাতায় এমন স্থানে ছাপানো হয় যা পাঠকের দৃষ্টিগোচর হয় না। এসব সাংবাদিকতা নীতিমালার পরিপন্থি। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়ার নজির খুব বেশি নেই।
অনাকাক্ষিত সাংবাদিকতার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সংক্ষুব্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আইনি প্রতিকারের পথ রয়েছে। যেমন দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানির সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। মানহানির উদ্দেশ্যে কোনো সংবাদ প্রকাশ করলে ৫০১ ধারায় অপরাধ হয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৭ চালু হওয়ার আগে সাধারণত সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে মানহানির জন্য দণ্ডবিধি ৫০১ ধারায় মোকদ্দমা হতো। বতর্মানে প্রায় সব সংবাদপত্র ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে থাকে। সেহেতু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর ৫৭ ধারায় মামলা করতে প্রলুব্ধ হন। একইভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর ২১, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২ ধারায় যেসব অপরাধের কথা বলা হয়েছে সেগুলো সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

সাংবাদিকতার মাধ্যমে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে 'প্রতিকার' পাওয়ার উদ্দেশ্যে এসব আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় দেখা গেছে, এসব আইনের অপব্যবহার বরং বেশি। এসব আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের 'শায়েস্তা' করার অপকৌশল বরং বেশি গৃহীত হয়। যে কারণে সাংবাদিক সমাজ এসব আইনের কিছু ধারা সংশোধন ও অপপ্রয়োগ বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে।
'মন্দের ভালো' এই যে, এ মামলাগুলো কেবল ট্রাইব্যুনালে বিচার করতে পারবে এবং পুলিশ কর্মকর্তার প্রতিবেদন ছাড়া ট্রাইব্যুনাল মামলা আমলে নিতে পারে না। আইনে অপরাধ বা শাস্তি যা-ই থাকুক; চূড়ান্ত বিচারে বাংলাদেশে কোনো সাংবাদিককে শাস্তি প্রদানের নজির নেই। তবে কোনো কোনো আইনের কিছু ধারা অজামিনযোগ্য হওয়ায় আদালত বিচারের আগে হাজতে পাঠিয়েছেন, এ রকম বহু নজির রয়েছে। আমাদের দেশে বিচার পর্যন্ত কেউ অপেক্ষা করে না; একবার হাজতে নিতে পারলেই মনে করে, 'শাস্তি' হয়েছে।
আমার মতে, সংবাদমাধ্যমের শক্তির মূল বিষয় হচ্ছে সংবাদ প্রকাশে সত্যনিষ্ঠ থাকা এবং ভারসাম্য রাখা। তারপরও কেউ যদি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা আইনের অপপ্রয়োগ করে, তাতে সামাজিক শক্তি সংবাদমাধ্যমের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু সংবাদমাধ্যম যদি ব্যক্তিস্বার্থে চালিত হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয় না। আমাদের দেশে একটি সংবাদপত্রের 'মানহানি'বিষয়ক মামলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে রয়েছে।
ঘটনাটি প্রবীণ নাগরিকদের স্মরণে থাকতে পারে। সিলেট থেকে বাংলায় 'যুগভেরী' ও ইংরেজিতে 'ইস্টার্ন হেরাল্ড' নামে দুটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো। সম্পাদক ছিলেন সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বড় ভাই আমিনুর রশীদ চৌধুরী। তিনি যেমন নির্ভীক সাংবাদিক ছিলেন, তেমনই সিলেটের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৬৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিলেট শহরের লাক্কাতুরা চা বাগানে বসবাসকারী সিলেট মেডিকেল আ্যাসোসিয়েশনের চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. জামশেদ বখতের বিরুদ্ধে জনৈক আজমান আলী সদর এসডিও কোর্টে মোকদ্দমা করেন। দরখাস্তকারী বলেন, তিনি যাত্রাপুর চা বাগানে চৌকিদার ও মালী পদে চাকরি করতেন। ডা. বখত্ তার স্ত্রীকে লাক্কাতুরা চা বাগানে নিয়ে আটকিয়ে রেখেছেন। স্ত্রীকে আনতে গেলে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং মিথ্যাভাবে ধারকৃত টাকা দাবি করা হয়। এসডিও কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ভিকটিমকে উদ্ধার করে ১৯৬৫ সালের ৮ নভেম্বর কোর্টে হাজির করার নির্দেশ দেন। পরদিন অভিযোগকারীর স্ত্রী 'ছোটবিবি' কোর্টে আত্মসমর্পণ করে জানান যে, তিনি ১২-১৩ বছর ধরে স্বেচ্ছায় অভিযুক্তের সঙ্গে রয়েছেন। তিনি অভিযুক্ত ডা. বখতকে ধর্মপিতা বলে সম্বোধন করেন। তিনি অভিযোগকারীর সঙ্গে যেতে রাজি নন। অতঃপর অভিযোগকারী আজমান আলী মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করে জানান যে, আমিনুর রশীদ চৌধুরীর পরামর্শ ও আর্থিক সহযোগিতায় তিনি মামলাটি করেন।
মোকদ্দমাটি তদন্তাধীন থাকাবস্থায় ১৯৬৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সাপ্তাহিক 'যুগভেরী' পত্রিকায় 'স্বামী বনাম ধর্মপিতা' এবং ১৯৬৫ সালের ২ অক্টোবর সাপ্তাহিক 'ইস্টার্ন হেরাল্ড' পত্রিকায় 'হাজবেন্ড ভার্সাস সোওর্ন ফাদার' শিরোনামে খবর প্রকাশ হয়। ডা. জামশেদ বখত ১৯৬৫ সালের ২৫ অক্টোবর পত্রিকা দুটির সম্পাদক আমিনুর রশীদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে মানহানির মোকদ্দমা করেন। সাক্ষ্য প্রমাণ শেষে ম্যাজিস্ট্রেট পত্রিকা দুটির সম্পাদক আমিনুর রশীদ চৌধুরীকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। যুক্তিতর্ক শুনানিকালে আসামি পক্ষের কৌঁসুলি বলেন, দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানির সংজ্ঞার চতুর্থ ব্যতিক্রমে বলা হয়েছে যে, কোর্টের প্রসিডিং পত্রিকায় ছাপানো হলে মানহানি হয় না। কাজেই আসামি কোর্টের প্রসিডিং পত্রিকায় ছাপিয়ে কোনো মানহানি করেননি। ম্যাজিস্ট্রেট রায় প্রদানকালে যুক্তি খণ্ডন করে বলেন যে, মামলা যেহেতু আমলে নেওয়া হয়নি, কাজেই এটি কোর্টের প্রসিডিং নয়।
আসামিপক্ষ জেলা ও দায়রা জজ বরাবর প্রথম আপিল করলে ম্যাজিস্ট্রেটের রায়ই বহাল থাকে। হাইকোর্টে গেলে হাইকোর্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়রা জজ আদালতের রায় সঠিক হয়নি বিবেচনা করে আসামিকে খালাস প্রদান করেন। হাইকোর্টের মূল বক্তব্য ছিল- মামলার তদন্ত কার্যক্রম দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার ৪র্থ ব্যতিক্রমের ব্যাখ্যায় 'কোর্টের প্রসিডিং'-এর আওতায় পড়ে। এটি পত্রিকায় ছেপে আসামি কোনো অপরাধ করেননি। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের আপিলেট বিভাগে যায়। লিভ আপিলের শুনানিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এফকেএম আব্দুল মুনিমের নেতৃত্বে বিচারপতি রুহুল ইসলাম, বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী ও বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের বেঞ্চ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ব্যাখ্যাকে সঠিক আখ্যা দিয়ে ১৯৮০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সর্বসম্মত রায় প্রদান করেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, তদন্তের কার্যক্রম 'কোর্টের প্রসিডিং'-এর আওতাভুক্ত নয়। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকাবস্থায় রেসপনডেন্ট উদ্দেশ্যমূলকভাবে খবর ছাপিয়ে আপিলেন্টের মানহানি ঘটিয়েছেন। কাজেই সম্পাদক আমিনুর রশীদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ বহাল হলো। শেষ পর্যন্ত সম্পাদক সেই 'শাস্তি' ভোগ করেছিলেন কিনা আমার জানা নেই।
বস্তুত, সংবাদমাধ্যম কিংবা সংবাদমাধ্যমের কারণে সংক্ষুব্ধ পক্ষ- কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেককে আইনের সীমারেখার মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তিনি সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, আমলা, আইনজীবী- যেই হোন।
শেখ ইউসুফ হারুন: নির্বাহী চেয়ারম্যান (জ্যেষ্ঠ সচিব), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)
- বিষয় :
- অধিকার
- শেখ ইউসুফ হারুন