সমাজ
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা যে বার্তা দেয়
সুলতান মাহমুদ রানা
প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১৩:২২
গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে তুলে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে। প্রতিবাদ শুরু হয়েছে সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এটি কোনো নতুন ঘটনা নয়। এমনটি সারাদেশে অহরহই ঘটছে। সেগুলোর কোনোটির খবর আমরা পাচ্ছি, কোনোটির মোটেও পাচ্ছি না। আবার কোনোটির জন্য প্রতিবাদ হচ্ছে, কোনোটির হচ্ছে না। প্রতিবাদ হলেও সেগুলোর কাঙ্ক্ষিত সমাধান আসছে না। ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলছে যে ঘটনা, সেটি কি প্রতিরোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়?
যত দিন ধরে ধর্ষণ প্রতিরোধে দেশের সচেতন মানুষ সোচ্চার ভূমিকায় রয়েছে, তত দিনে ধর্ষণ প্রবণতা কমে যাওয়াটাই ন্যায্য ছিল। তা না হয়ে বরং দিন দিন তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সহসাই এই ঘৃণ্য প্রবণতা থামবে কিনা, তা বলা মুশকিল। তবে এটি অনুমান করতে কষ্ট হয় না, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের একজন শিক্ষার্থী যখন ধর্ষিত হচ্ছে, তখন অন্য একজন সাধারণের ধর্ষিত হওয়ার ব্যাপারটি কতটা স্বাভাবিক হতে পারে! খুব স্বাভাবিকভাবেই দেশের ধর্ষণচিত্র নিয়ে চিন্তা করার আগে আমাদের ভাবতে হয়- দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীও ধর্ষিত হচ্ছে! বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে একটি দেশের ভাবমূর্তি কতটা ক্ষুণ্ণ হতে পারে, তা সবার কাছেই অনুমেয়।
নারীর নিরাপত্তা, নারী নির্যাতন প্রসঙ্গে অনেক গবেষণা চলছে। কিন্তু কোনোভাবেই নারীকে কেন যথাযথ নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না? এ জন্য প্রশ্ন আসাই স্বাভাবিক- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে না? শুধু গোপালগঞ্জে নয়, ২০২০ সালের শুরুর দিকে ঢাকা শহরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে টেনেহিঁচড়ে নির্জনে নিয়ে নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। এ থেকে কি এটি প্রমাণ হয় না, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট অবনতি ঘটেছে।
আমরা লক্ষ্য করছি, ইদানীং বাসে দলবদ্ধ ধর্ষণ, বাস থেকে নামলে ধর্ষণ- এসব ঘটনা ঘটছে। যে কোনো শহরেই বাস থেকে নামার পর যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হন, তাহলে আমরা জাতি হিসেবে কীভাবে এর দায় এড়াব? কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যদি দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন, তাহলে বুঝতে হবে আমরা জাতি হিসেবে কোথায় আছি। আমাদের দেশে রাস্তাঘাট নারীর জন্য কতটা নিরাপদ- তা নিয়ে এখন প্রতিনিয়তই প্রশ্ন ওঠে। নারীর জন্য নিরাপদ শহর ও নিরাপদ রাস্তার দাবি অনেক দিনের। দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রতিবাদ চলছে।
একজন নারীকে ধর্ষণ করে যদি নিরাপদে থাকা যায়, যদি বিচার না হয়; তাহলে তো ধর্ষকরা বেপরোয়া হবেই। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে ধর্ষণবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এমনকি দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেমন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, ধর্ষণের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এই নীতি গ্রহণ করার সময় এসেছে। প্রয়োজনে ধর্ষণবিরোধী মানসিকতা নির্মাণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে মাঠে নামতে হবে। তা না হলে ২০২১ সালে সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা যেমন ২০২০ সালের চেয়ে বেশি, তেমনি ২০২১ সালের চেয়ে ২০২২ সালের ঘটনা আরও বেশি হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। নানা ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং উদ্যোগ গ্রহণের পরও যখন আগের বছরের তুলনায় পরের বছর ধর্ষণের ঘটনা বেশি হয়, এমনকি কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হয়- তখন তা কতটা আশঙ্কাজনক এবং উৎকণ্ঠার বিষয়, তা বিশ্নেষণের অপেক্ষা রাখে না। আমাদের দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এরপরও যদি ধর্ষণ বন্ধ না হয়, তাহলে কীভাবে এর প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে? কীভাবেই বা বন্ধ হবে ধর্ষণের সংস্কৃতি?
ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পেতে অনেক ক্ষেত্রেই নির্যাতিতকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কর্তৃকও নারীর শ্নীলতাহানির ঘটনার নজির আছে। এসব ক্ষেত্রে প্রতিবাদ হলে সংশ্নিষ্টরা সাময়িক বরখাস্ত হয়; কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চূড়ান্তভাবে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয় না। এমনকি দেখা গেছে, ধর্ষিতের পক্ষে আইনি সহায়তা পেতে হয়রানির শিকার হতে হয়। নানা কটূক্তি ও ভয় প্রদর্শন করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারও কারওর পক্ষ থেকেই। তাহলে কীভাবে জনগণের আস্থা অর্জন করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী? এ ছাড়া আমরা দেখেছি, অপরাধী প্রভাবশালী হলে ধর্ষিত বা নির্যাতিত থানায় মামলা করতে গেলে মামলা না নিয়ে বরং নানা ধরনের অজুহাতে পাল্টা হয়রানি চলতে থাকে। সাম্প্রতিককালেও আমরা এমন নজির অবলোকন করেছি।
যৌন নিপীড়নের ঘটনা আদালতে পরিচালনাকারী আইনজীবী ও মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞদের মতে, ধর্ষণ মামলায় মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের শেষ পর্যন্ত সাজা হয়। অথচ আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে এসব মামলা শেষ করার কথা থাকলেও তা গড়ায় বছরের পর বছর। এমন পরিস্থিতিতে ধর্ষণ বাড়াটাই স্বাভাবিক। কাজেই রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এমন ধর্ষণ প্রবণতা কিংবা নিপীড়নের ঘটনা চলতেই থাকবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নয়, দেশের প্রত্যেক মানুষকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকায় দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যমান আইনের দ্রুত প্রয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা অমূলক হবে না।
ড. সুলতান মাহমুদ রানা: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
sultanmahmud.rana@gmail.com
- বিষয় :
- সমাজ
- সুলতান মাহমুদ রানা