মূল্যস্ফীতি তাহলে কমবে কীভাবে?
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:৫২
রাষ্ট্রায়ত্ত যেসব চিনিকল এখনও চালু আছে– সেগুলো কী পরিমাণ চিনি উৎপাদন করে, তা আমাদের জানা। এগুলোর উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি, সেটিও অজানা নয়। এসব চিনিকল বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের একটি চিন্তা রয়েছে, তারও ইঙ্গিত মিলেছে সম্প্রতি। প্রসঙ্গটি এলো এসব চিনিকলে উৎপাদিত পণ্যের দাম হঠাৎ করে কেজিপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর কাণ্ডে। কয়েক ঘণ্টা পরই অবশ্য সিদ্ধান্তটি বাতিল হয়। এতে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন এবং শিল্প মন্ত্রণালয় জড়িত। তাদের কারা কী ভূমিকা এ ক্ষেত্রে রেখেছে, সেটি সরকারের উচ্চপর্যায়ই কেবল বলতে পারে।
এদিকে এনবিআর সম্প্রতি যে চারটি খাদ্যপণ্যে কর-শুল্ক কমিয়েছে, তার মধ্যে ছিল চিনি। চিনিতে শুল্ক অবশ্য সামান্যই কমানো হয়। তাতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ বরং তৈরি হয়েছে, এমন পদক্ষেপে রমজানে চিনির দামে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা। পদক্ষেপটি নিতে সরকার দেরি করে ফেলেছে বলেও সমালোচনা রয়েছে। গোটা মুসলিম বিশ্বে এ সময়ে চিনির মতো পণ্যের চাহিদা লাফিয়ে বাড়তে দেখা যায়। সে জন্য কম দামে আগেভাগে আমদানির চেষ্টা করাই ভালো। তবু দেরিতে হলেও সরকার একটি পদক্ষেপ তো নিয়েছে এবং এর লক্ষ্য নিশ্চিতভাবে দাম কমানো। অনেক দিন ধরেই চিনির দাম বেড়ে আছে, কমার কোনো প্রবণতা নেই। এ অবস্থায় শুল্ক হ্রাসে এমন উদ্দেশ্যও থাকতে পারে– দাম অন্তত না বাড়ুক!
এর মধ্যে সরবরাহে অবদান যত কমই থাকুক– রাষ্ট্রায়ত্ত মিলের চিনির দাম আকস্মিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার মানে কী? এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা কি চাইছিলেন, রমজানে চিনির দাম বাড়বে– এমন একটি সংকেত যাক বাজারে? তাও ভালো, সিদ্ধান্তটি দ্রুত বাতিল হয়েছে। নইলে আমদানীকৃত চিনির মূল বাজারটা অস্থিতিশীল হতো। মাঝখান দিয়ে কাঁচা টাকা কামিয়ে নিত তারা, যাদের হাতে চিনির ভালো মজুত আছে। পকেট কাটা যেত ভোক্তাদের, যাদের জোরালো ‘ভয়েস’ নেই। এ কারণে ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার।
চিনিকলগুলো কম ব্যয়ে উৎপাদনে অক্ষম বলেই যদি তাদের চিনির দাম বাড়ানো হয়ে থাকে, তবে কোনো যুক্তিশীল ভোক্তা সেটি কিনবে না। সন্দেহ নেই, এর ভালো চাহিদা রয়েছে। আখের ‘লাল চিনি’ লোকে একটু বেশি দামেও কিনতে চায়। স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় কেনাকাটার এ প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হলে তারাও সেটি কিনবে না। আর এ মুহূর্তে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে চিনির মতো পণ্যের দাম বাড়ানোর তো কোনো সুযোগ নেই। কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেশিতে বিক্রি হলেও ওইসব চিনিকলের আয়ই বা কতটা বাড়ত? যাহোক, তাদের এখন উচিত হবে আগের দামে যতটা সম্ভব বেশি চিনি জুগিয়ে চাহিদা মেটানো। সরকারের উচিত হবে শুল্ক ছাড়ের যেটুকু প্রভাব চিনির বাজারে পড়ার কথা, সেটি নিশ্চিত করা। সঙ্গে এনবিআর কেন আরও বেশি শুল্ক ছাড় দিল না, সেটি তাদের জিজ্ঞেস করা।
রমজান সামনে রেখে চিনিতে আরেকটু বেশি শুল্ক ছাড় দিলে কতটাই বা রাজস্ব হারাত এনবিআর? নাকি তারা মনে করেন, এতে বাজারে কোনোই প্রভাব পড়বে না; রাজস্ব হারানোটাই হবে সার! তাহলে তো খতিয়ে দেখতে হয়– অন্য যে তিনটি খাদ্যপণ্যে বড় শুল্ক ছাড় দেওয়া হলো, তাতে কী ঘটছে? ইতোমধ্যে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে অবশ্য। কিন্তু খেজুরের বাজারে অস্থিরতা কাটছে না। শুল্কায়ন জটিলতায় আমদানীকৃত অনেক খেজুর নাকি পড়ে আছে বন্দরে। শুল্ক কমাতে চাপ সৃষ্টির চেষ্টায়ও বিভিন্ন জরুরি পণ্যের আমদানিকারকরা অনেক সময় পণ্য খালাসে দেরি করে। রমজান সামনে রেখে এ প্রবণতা বাড়লে অবাক হওয়া যাবে কি?

খাদ্যপণ্য আমদানিতে যে দেশের ওপর আমরা বেশি নির্ভরশীল, তারা নিজ পরিস্থিতি সামলাতে বেশি সতর্ক বলেও এখানে কিছু বাড়তি অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছে। চট করে আমদানি করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির ‘কোটা’ পাওয়ার খবর মিললেও বাজারে এর প্রভাব তেমন নেই। কারণ আমদানি হবে কম। অগত্যা স্থানীয় সরবরাহের ওপরই নির্ভর করে থাকতে হচ্ছে। এতে অবশ্য দেশীয় উৎপাদকদের ভালো দাম পাওয়ার আশা। এদিকে দ্রুত আমদানির ক্ষেত্রে তো ডলার সংকট মোকাবিলা করতেই হচ্ছে। সরকার অবশ্য বলছে, খাদ্যপণ্য আমদানিতে এলসি জটিলতা নেই। তা হয়তো নেই; খাদ্যপণ্য আমদানি নির্বিঘ্ন রাখতে নিশ্চয় সতর্ক আছে সরকার। এটাও ঠিক, ডলারের দাম এখনও চড়া বলে আমদানি ব্যয় বেশি পড়ে যাচ্ছে। পণ্যের দামে সেটি হচ্ছে প্রতিফলিত। এদিকে খাদ্যপণ্য আমদানি স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর আমদানি করতে হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ। এতে শিল্পের কাঁচামালসহ জ্বালানি আমদানি কমে গেলে পরিস্থিতিটা কী দাঁড়ায়? এর প্রভাব কি নেই কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে? প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়লে কর-রাজস্ব আহরণও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সন্দেহ নেই।
অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এনবিআরের রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি অবশ্য খুব হতাশাজনক নয়। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি আছে। তবে সেটি আবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি দেখে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা কমানোও হচ্ছে। না কমালেও আহরণ কমবে। চার খাদ্যপণ্যে শুল্ক ছাড়ের পরও আরও ছাড় হয়তো তাকে দিতে হবে। যেমন জ্বালানি পণ্যের দাম কমানোর দাবি রয়েছে– যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম এখন কম। এ ক্ষেত্রে কর-শুল্ক কমানো হলে দাম কমানো যাবে সহজেই। তাতে বিশেষ করে প্রভাব পড়বে পরিবহন ব্যয়ে, এমনকি জ্বালানি তেল দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতে। মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরার এটি একটি কার্যকর উপায়। সুদের হার বাড়িয়ে বাজারে অর্থ সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় (সঙ্গে চাঁদাবাজি) একই থাকলে; তার ওপর বিদ্যুতের দাম নতুন করে বাড়লে মূল্যস্ফীতি কমানোর পদক্ষেপ সুফল দেবে কীভাবে? সুদের হার বাড়ানোয় আমদানীকৃত পণ্যের দামও বাড়তে পারে। দেশীয় শিল্প খাতে ব্যয় বৃদ্ধির চাপে তার উৎপাদিত পণ্যের দামও বাড়বে। গ্যাস সংকটও মোকাবিলা করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। গ্যাসের দাম মাঝে অনেক বাড়ানো হয়েছিল। তারপরও ‘নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ’ করা যাচ্ছে না নিশ্চিত। এর প্রভাব কি থাকবে না এমনকি রপ্তানিমুখী খাতে? তার ঋণ পরিশোধে? খেলাপি ঋণ পরিস্থিতিও কি অজানা?
সরকার নিজেও ঋণগ্রস্ত! বিদেশি ঋণ ও বকেয়া বিল পরিশোধের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে উচ্চসুদে বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করতে হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। জোর তাগিদ রয়েছে বার্ষিক বাজেট হ্রাস, বিশেষত ‘অপ্রয়োজনীয় ব্যয়’ কমানোর। এনবিআর অনেক বেশি রাজস্ব আহরণ করতে পারলেও সরকারের উচিত অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো। কিন্তু তার আলামত দেখা যাচ্ছে না। অব্যাহত ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় ‘করবহির্ভূত আয়’ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর উদ্যোগের কথা বরং জানা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে চারটি জাতীয় মহাসড়কে টোল আদায়। এর প্রভাব কি পড়বে না মূল্যস্ফীতিতে? স্বাস্থ্য খাতে মানহীন সেবার ফিও কি বাড়ানো হবে? ওষুধের দাম কিন্তু দফায় দফায় বাড়ছে!
হাসান মামুন: সাংবাদিক, বিশ্লেষক