মূল্যস্ফীতি তাহলে কমবে কীভাবে?
অর্থনীতি
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৪ | ০০:১৭ | আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৪ | ০০:১৮
জ্বালানি তেল, বিশেষত ডিজেলের দাম এত সামান্য কমানো হয়েছে যে, অর্থনীতিতে এর কোনো প্রভাবই পড়েনি। অথচ ডিজেল হলো সেই পণ্য, যা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, তাই এর দাম মূল্যস্ফীতিতে রাখে বড় ভূমিকা। উচ্চ পর্যায়ে থাকা মূল্যস্ফীতি কমানো সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য বলেই মনে করা হচ্ছিল। বিশেষত ডিজেলের দাম তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমিয়ে আনা হবে। তেমনটি ঘটতে দেখা গেল না।
একই সময়ে আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো গড়ে সাড়ে ৮ শতাংশ। ডিজেলের দাম কমানো হলো লিটারে ৭৫ পয়সা। ভেজালের আশঙ্কায় কেরোসিনের দামও ডিজেলের সমান রাখা হলো। ভেজাল ও পাচারের আশঙ্কায় জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ‘ট্র্যাডিশন’ রয়েছে। এসব রোধে যেন কোনো কর্তৃপক্ষ নেই! পেট্রোল, অকটেনের দাম অবশ্য কিঞ্চিৎ বেশি কমানো হয়েছে। এতে প্রাইভেটকার মালিকের পাশাপাশি বাইকাররা কিছুটা সুবিধা পাবেন। বাইকে যাত্রী পরিবহনকারীরা আরও কিছুটা উপকৃত হতেন পেট্রোল-অকটেনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হলে। লিটারে ৩-৪ টাকা কমানোটা বড় খবরও হয়নি।
২০২২ সালের আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম গড়ে এক লাফে ৪২ শতাংশ বেড়ে যায়। তখন ডিজেলের দাম বাড়ে লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা। এর কিছুদিন আগে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানোর ঘটনাও স্মরণযোগ্য। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার ‘অজুহাতেই’ ওইসব ঘটানো হয়; যদিও ওই মুহূর্তে দাম হয়তো ছিল স্থিতিশীল কিংবা নিম্নগামী। আসলে বিপিসির ‘পুঞ্জীভূত লোকসান’ কমাতে বা দ্রুত সরকারের আয় বাড়াতেই নেওয়া হয়েছিল ওইসব পদক্ষেপ। রেকর্ড বৃদ্ধি ঘটিয়ে ওই মাসেই, অবশ্য লিটারপ্রতি ৫ টাকা জ্বালানি তেলের দাম কমানোর ঘটনাও ঘটে। সমালোচনার মুখে দামে কিছুটা সংশোধনের পদক্ষেপ অবশ্যই ইতিবাচক।
এর মধ্যে করোনাকালে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, বিশেষত ডিজেলের দাম তলানিতে নেমে এলেও দেশে এর দামে ‘নিম্নমুখী সমন্বয়’ করা হয়নি। হলে এর সুফল মিলত মূল্যস্ফীতি হ্রাসের ঘটনায়। তখন মূল্যস্ফীতি অবশ্য অত বেশি ছিল না। তবে লকডাউনসহ অর্থনীতিতে গতিশীলতা কমে যাওয়ায় রুজি-রোজগারে বড় ধাক্কা এসেছিল। তখনও জ্বালানির উচ্চ মূল্য বহাল রাখে সরকার। তাতে এর ব্যবসা করা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি অনেক মুনাফা করে। মাঝে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির বাজার চড়ে যাওয়ার সময়টা বাদে সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ৯ বছরের মধ্যে আট বছরই বিপিসি মুনাফা করেছে বলে খবরে প্রকাশ। সরকারকে লভ্যাংশও দিয়েছে।
এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দামে নামমাত্র হ্রাসের খবর মোটেও উৎসাহজনক হয়নি। এ মুহূর্তে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে যে বিরাট ঊর্ধ্বগতি রয়েছে, তাও নয়। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিসহ বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিতে নতুন করে গতিশীলতা সৃষ্টির প্রবণতায় জ্বালানির চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে অবশ্য। ওপেকভুক্ত দেশগুলোও জ্বালানি উৎপাদন কমিয়ে এর দাম বাড়ানোর চেষ্টায় আছে। এসব কারণে সামনে ডিজেলসহ জ্বালানির দাম বাড়ার প্রবণতা থাকবে বলে রয়েছে প্রক্ষেপণ। তবে এখন পর্যন্ত বিশ্ববাজার স্থিতিশীল। এমন একটা অবস্থায় আমাদের মতো যে দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করছে, সেখানে আরও বেশি হারে জ্বালানির দাম কমিয়ে স্বস্তি জোগানোর সুযোগ ছিল বৈকি।
এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম নতুন করে বাড়ানোয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধির যে প্রবণতা দেখা দেবে, সে প্রেক্ষাপটেও জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এতে একটা বিপরীতমুখী প্রভাব ফেলা জরুরি ছিল। গেল বছরের প্রথম তিন মাসেও কিন্তু বিদ্যুতের দাম ৫ শতাংশ করে বাড়ানো হয়। আর এবার মার্চ থেকে বাড়ানো হবে বলে শেষ মুহূর্তে এর দাম বাড়ানো হলো ফেব্রুয়ারি থেকে। রমজানের আগ দিয়ে যখন মূল্যস্ফীতি আরেক দফা বাড়ার শঙ্কা থাকে, তখনই এমনিভাবে বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম। এসব ‘সাহসী’ পদক্ষেপ নিয়ে দাবি করা যাবে না, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই এ মুহূর্তে প্রধান লক্ষ্য। বরং বলা যেতে পারে, যে কোনো মূল্যে সরকারের আয় বৃদ্ধিই লক্ষ্য।
ডিজেলসহ জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হলে বিপিসির মুনাফা কমে গিয়ে সরকারের আয় কমে যেত, এটা বলা যেতেই পারে। আর্থিক হিসাব মেলানো আরও কঠিন হতো তার পক্ষে। সে কারণেই হয়তো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দাম সেভাবে কমানো হয়নি। বিশেষত ডিজেলের দাম এত কম কমানো হয়েছে যে, তা দেখে অনেকে মুচকি হেসেছেন।
তবে এর ভেতর দিয়ে সরকার অবশ্য বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের পর্বে প্রবেশ করল। গত সেপ্টেম্বর থেকেই পদ্ধতিটি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এতে বিশ্ববাজারে দামের হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে দেশেও সে অনুযায়ী দাম নির্ধারিত হবে। এর একটি ‘ফর্মুলা’

অনুমোদিত হয়েছে। উদ্দেশ্য– জ্বালানি পণ্যে জোগানো ভর্তুকি থেকে সরে আসা। এটা ঋণসহায়তা জোগানো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা আইএমএফের অন্যতম শর্তও বটে। সরকারেরও গৃহীত নীতি।
বিদ্যুতের দাম যে দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে, তারও লক্ষ্য হলো, ক্রমে এ খাতে জোগানো ভর্তুকি থেকে মুক্তি। গ্যাস খাতেও একযোগে বড় দাম বাড়ানো হয় এর মধ্যে, বিশেষত বিদ্যুৎ ও শিল্পে। গেল বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেটা কার্যকরের পর চলতি বছরেও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময়ে আরও কিছু বাড়ানো হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম। সরকার যে ‘নিরবচ্ছিন্নভাবে’ ও ‘নির্দিষ্ট চাপে’ গ্যাস জোগাতে পারছে, তাও নয়। তারপরও গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে এবং সে ক্ষেত্রেও লক্ষ্য হলো সরকারের আয় বৃদ্ধি। তবে এসবের নেতিবাচক প্রভাব যে পণ্য ও সেবার মূল্যের ওপর পড়ছে, তাও মনে রাখতে হবে।
উৎপাদনে ব্যয় বেশি পড়ে যাওয়ায় সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে, বলা হচ্ছে। তবে ব্যয় কমিয়ে কীভাবে ওইসব উৎপাদন করা যায়, তার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা ‘ব্যয়বহুল জ্বালানিনীতি’ অনুসরণ থেকে দ্রুত সরে আসার ওপর জোর দিচ্ছেন। বিদ্যুৎ খাতে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ ও গ্যাস খাতে ‘এলএনজি-নির্ভরতা’ পরিহারের কথা এ অবস্থায় বেশি করে বলা হচ্ছে। কিন্তু সে ধারায় আসার প্রবণতা অনুপস্থিত, বলা যায়। উচ্চ ব্যয় অনুযায়ী অব্যাহতভাবে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে চলার প্রবণতা বরং স্পষ্ট। চটজলদি দাম বাড়াতে ‘গণশুনানি’র বাধ্যবাধকতাও বাতিল করেছে সরকার। নির্বাহী আদেশে চলার প্রবণতা বেড়ে উঠেছে।
এখন মাসে মাসে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারিত হওয়ার কথা। তাতে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, কে জানে! এ অবস্থায় ডিজেলসহ জ্বালানি তেলে উচ্চ হারে আরোপিত শুল্ক-কর কমানোর দাবিটা নতুন করে সামনে আসবে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিপিসির ‘মনোপলি’ বহাল থাকলে তাকে কেন মুনাফা করতে হবে, সে প্রশ্নও উঠেছে। এ ক্ষেত্রে কেবল ভ্যাট বহাল রেখে জ্বালানির দাম সহনীয় রাখার ওপর দেওয়া হচ্ছে জোর। কেননা, এটা কৌশলগত পণ্য, যার সরাসরি প্রভাব রয়েছে মূল্যস্ফীতিতে। বিপিসির ‘অব্যবস্থাপনাজনিত ব্যয়’ও জনগণ টানবে কেন– প্রশ্ন রয়েছে। এ খাতে প্রতিযোগিতা ও দক্ষতা বাড়াতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টিও বোধ করি হয়ে উঠবে বড় বিবেচনার বিষয়।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, বিশ্লেষক