সরকারের আন্তরিকতা ছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়
বাজার
আবু তাহের খান
আবু তাহের খান
প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০২৪ | ২৩:০৩
নিত্যপ্রয়োজনীয় ২৯টি পণ্যের দর বেঁধে দিয়ে গত ১৫ মার্চ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। এ প্রজ্ঞাপন জারির পর বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ১৭ মার্চ সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদন ছিল– দাম বেঁধেই দায় শেষ, বাস্তবায়নে ঠনঠন। পণ্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের যে নাভিশ্বাস অবস্থা, তাতে এ ধরনের খবর বেশ উদ্বেগজনক হলেও এতে কেউ অবশ্য এতটুকু বিস্মিত হননি। বরং এমনটিই হবে– অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে তা অনুমিতই ছিল। ২০২১ সালেও একই অধিদপ্তর থেকে একইভাবে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল এবং তখনও এতে কোনো লাভ হয়নি।
প্রথম কথা হচ্ছে, উল্লিখিত ২৯টি পণ্যের সবই কৃষিজাত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেশের সাধারণ কৃষকই এসবের উৎপাদক। কিন্তু এসব পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার কি সাধারণ উৎপাদক বা কৃষকের রয়েছে? মোটেও নেই। যদি থাকত তাহলে সরকার ওইসব পণ্যের দাম নির্ধারণ না করে দিলেও তা যৌক্তিক পরিসীমার মধ্যেই থাকত। মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার পর সেটি হতো তাদের (কৃষক) জন্য সোনায় সোহাগা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এখন দাম নির্ধারণ করেন ব্যবসায়ীরা। পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত কৃষককে তার উৎপাদিত পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার মধ্যেই বস্তুত নিহিত পণ্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার বর্তমান প্রবণতার গূঢ় রহস্য।
ব্যবসায়ীরা শুধু কৃষিপণ্যের সরবরাহ ও দামই নিয়ন্ত্রণ করছেন না; বরং বাজারে থাকা অধিকাংশ দেশি-বিদেশি পণ্যের নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে। মোট কথা, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মূল্য নির্দেশনা যাদের মেনে চলার কথা; আড়ালে থেকে লোক দেখানো এসব নির্দেশনা প্রকৃতপক্ষে তারাই দিচ্ছেন। ফলে এসব নির্দেশনা আসলে তারা মানা বা অনুসরণের জন্য দিচ্ছেন না; দিচ্ছেন লোকজনকে দেখানো বা বলার জন্য– মূল্য নিয়ন্ত্রণে তারা কাজ করছেন। নইলে পণ্যমূল্য নির্ধারণের কাজটি শুধু রোজার মাসে কেন? অন্য মাসেও নয় কেন? অন্য মাসে কি পণ্যমূল্য যথাযথ থাকে? পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে দাম নির্ধারণ করে দেওয়াই কি যথেষ্ট? বেঁধে দেওয়া দামে বাজারে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কিনা, সেটি কে তদারক করবে? এ বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, ম্যাজিস্ট্রেটের অভাবে তারা বাজারে অভিযান চালাতে পারছে না। যদিও ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত সাত মাসের মধ্যে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে তাদের কাছে কেউ কোনো ম্যাজিস্ট্রেট চায়নি (সমকাল, ১৭ মার্চ ২০২৪)। এদিকে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দশাও প্রায় একই রকম। তারাও বৃহৎ মজুতকারীদের এড়িয়ে লোক দেখানো হম্বিতম্বি করে বেড়াচ্ছে খুচরা ব্যবসায়ীদের জরিমানা করে। গত ১৬ মার্চ তারা ৫৫টি অভিযান চালিয়ে ১৪১ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জরিমানা আদায় করেছে ৭ লাখ ৫২ হাজার টাকা।
আসলে এসব মৌসুমি প্রজ্ঞাপন জারি করে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বা হ্রাস করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সমস্যার মূলে হাত দেওয়া। রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যবসায়ীরা যদি যার যার কর্তৃত্বের আওতাধীন ব্যবসায়িক কার্যক্রম সততা ও নৈতিকতার সঙ্গে পরিচালনা করেন, তাহলে পণ্যমূল্য এমনিতেই কমে আসবে। বর্তমানে সংসদ সদস্যের অধিকাংশই ব্যবসায়ী। তারা যদি সিদ্ধান্ত নেন– পণ্যমূল্য হ্রাসে সহায়তা করবেন, তাহলে দেশের বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসার কোনো কারণ নেই। বাজার পরিস্থিতি বা পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে এ মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হচ্ছে রাজনৈতিক দল-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছা ও সহযোগিতার বিষয় নিশ্চিত করা।
পণ্যমূল্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক সময়ের একটি বহুল আলোচিত ‘জনপ্রিয়’ উদ্যোগ ও কৌশল হচ্ছে, বিভিন্ন পণ্য বিশেষত আমদানি পণ্যের ওপর থেকে কর ও শুল্ক হ্রাস করা, যা ভোগ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা সারাক্ষণ মুখিয়ে থাকেন। কিন্তু অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এ ধরনের কর ও শুল্ক ছাড়ের মধ্য দিয়ে পণ্যমূল্য বিন্দুমাত্র হ্রাস তো পায়ই না; উল্টো সে অর্থ চতুর ব্যবসায়ীর পকেটে ঢুকে তাঁর একচেটিয়া মুনাফার ভান্ডারকে আরও স্ফীত করে। তা ছাড়া এ ধরনের কর ও শুল্ক হ্রাসের ফলে রাষ্ট্রের রাজস্ব তহবিলে যে ঘাটতি দেখা দেয়, সেটিও তখন পূরণ করা হয় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি কর চাপিয়ে দিয়ে। ফলে এটি পণ্যমূল্য হ্রাস না করে বরং নতুন করে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিচের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য করে। অতএব, এ প্রসঙ্গে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, পণ্যমূল্য হ্রাসের লক্ষ্যে আর যে ব্যবস্থাই নেওয়া হোক; কোনো অবস্থাতেই কর-শুল্ক হ্রাসের মতো একটি জনস্বার্থবিরোধী উদ্যোগ যেন না নেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে এই– সরকারি দর মানাতে সরকারের আন্তরিকতা সর্বাগ্রে জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে তা করতে হবে। সৃষ্ট বাস্তবতায় প্রশাসনিক বা অন্য কোনো উদ্যোগ বা ব্যবস্থার আওতায় এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। দেশে বিদ্যমান অসহনীয় বাজার পরিস্থিতিকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে পুরো বিষয়কে রাজনৈতিক প্রেক্ষিত থেকে বিবেচনায় নিয়ে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আবু তাহের খান: গবেষক ও প্রাবন্ধিক
- বিষয় :
- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ
- বাজার