ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অর্থনীতি

নতুন মুদ্রানীতির পুরোনো চ্যালেঞ্জ

নতুন মুদ্রানীতির পুরোনো চ্যালেঞ্জ
×

আতিউর রহমান

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ০৩:৩৬

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বর্তমান অর্থবছরের দ্বিতীয় ভাগের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছেন। বছরে দু'বার মুদ্রানীতি ঘোষণার সংস্কৃতি পুনরায় চালু করার জন্য তাঁকে বিশেষ ধন্যবাদ। দেশের এবং বিশ্বের অর্থনীতি যেভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে তাতে বছরে দু'বার কেন, আরও ঘন ঘন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা গেলে ভালো হতো। পাশের দেশ ভারতেও বছরে ছয়বার অর্থাৎ দুই মাসে একবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। কী বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক মাঝের বছরগুলোতে বছরে একবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা এখনও আমার কাছে বোধগম্য নয়। এতে করে মুদ্রানীতি তার স্বকীয়তা খানিকটা হারিয়েছিল। বাজেটের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল মুদ্রানীতি। এখনও মুদ্রানীতি তার স্বকীয়তা রক্ষা করতে চাইলে প্রতি দু'মাসে অভ্যন্তরীণ বিচার-বিশ্নেষণ সাপেক্ষে নীতিসূচকগুলোর পরিবর্তন করার উদ্যোগ নিতে পারে। সময়ের চাহিদা মাথায় রেখে এটা করা গেলে এই নীতি আরও বাস্তবানুগ করা সম্ভব।

তবে মানতেই হবে, এবারের মুদ্রানীতিটি সমকালীন বাস্তবতায় অনেকটাই প্রাসঙ্গিক হয়েছে। মুদ্রানীতির রূপরেখাটিও বেশ যুক্তিসম্মত হয়েছে। বরাবরের মতো শুরুতেই বিশ্ব অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিত তুলে ধরা হয়েছে। যথার্থই বলা হয়েছে- ইউক্রেন যুদ্ধ, চীনের 'জিরো কভিড'নীতি, ইউরোপে জ্বালানি সংকট, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সংরক্ষণবাদী নীতি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর আকাশচুম্বী ঋণের বোঝা বিশ্ব অর্থনীতিকে বিরাট সমস্যার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। পাশাপাশি চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, রাশিয়াসহ উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় নতুন করে কভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশও এই বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থার বাইরে নয়। বাংলাদেশেও গত কয়েক মাস ধরেই বহিঃঅর্থনীতির প্রভাবে উচ্চ মূল্যস্ম্ফীতি, তারল্য এবং বিনিময় হারে বড় ধরনের চাপ অনুভূত হতে দেখা গেছে। এসব চাপ আরও ঘনীভূত হয়েছে ব্যাংক ও অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ এবং সুশাসনের চ্যালেঞ্জের কারণে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ছিল নীতি সুদহার (রেপো) বাড়ানো (বাজারে প্রচুর ডলার বিক্রি করে টাকা তুলে নেওয়ার মাধ্যমে মুদ্রার সংকোচন সত্ত্বেও), ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে রেপো ও অন্যান্য তারল্য সমর্থন প্রদান এবং তারল্য সংকটকে সামলাতে বিশেষ বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিকে জোরদার করা (যেমন- কৃষি, এমএসএমই খাতে পুনঃঅর্থায়ন), বিলাসপণ্য ও অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমিয়ে ফেলা এবং রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু সহায়ক প্রণোদনামূলক উদ্যোগ নেওয়া। এ ছাড়া আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণ এবং সুশাসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সমস্যাকবলিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাদা করে বসা এবং মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটেই বর্তমান মুদ্রানীতিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক তার সর্বশেষ এই মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় নিচের বিষয়গুলো নজরে রেখেছে-

এক. সর্বশেষ সমন্বয় কমিটির সভায় নেওয়া চলতি অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মুদ্রাস্ম্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ;
দুই. আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার, বিশ্ব ও স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গবেষক, সাবেক ও বর্তমান নীতিনির্ধারক, সাংবাদিক এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের বিশ্ব ও দেশীয় ম্যাক্রো অর্থনৈতিক সূচকগুলোর বিষয়ে মতামতও নেওয়া হয়;
তিন. বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব গবেষণা এবং ম্যাক্রো অর্থনীতির সূচকগুলোর প্রক্ষেপণের ফলাফলের অবলোকন।

এসব বিষয় মাথায় রেখেই বর্তমান মুদ্রানীতিতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত টানা হয়। দাবি করা হয়, বিশ্বে পণ্যমূল্য কমার প্রবণতা এবং আমন ধানের বাম্পার উৎপাদন এবং সেভাবেই বোরো ধানের ওপর নীতি সমর্থন ও তত্ত্বাবধায়ন সাপেক্ষে বাড়তি উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশেও পণ্যমূল্য পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার ও আমদানি চাহিদা কমে আসার কারণে কয়েক মাসের মধ্যে স্থিতিশীল হবে। এই প্রেক্ষাপটেই বর্তমান মুদ্রানীতিকে সতর্ক ও সংকুলানমূলক আখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে- মূল্যস্ম্ফীতি এবং বিনিময় হারের চাপ সহনীয় করে ফেলা, কাঙ্ক্ষিত হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে ধরে রাখা এবং উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনৈতিক এজেন্টদের কাছে আর্থিক প্রবাহ নিশ্চিত করা।

এই লক্ষ্য পূরণে নীতি সুদহার আরও বাড়ানো (২৫ বেসিস পয়েন্ট) হয়েছে। লক্ষ্য- বাজারকে উপযুক্ত সিগন্যাল দেওয়া, মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত পথেই হাঁটা। একই সঙ্গে এ কথাও মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, বাজার থেকে প্রচুর তারল্য তোলা হয়েছে। ব্যাংক থেকে ব্যাংকে 'ওভারনাইট' যে ঋণ নেওয়া হয় তার নাম কলমানি রেট। এই রেট এখন বেশ বাড়ন্ত। তাতেই প্রমাণ হয়- তারল্যে চাপ রয়েছে। সে কারণেই সদ্যঘোষিত মুদ্রানীতি মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু বিকল্প নীতি-উদ্যোগ নিয়েছে। পুনঃঅর্থায়ন বাড়িয়ে এবং বাণিজ্য অর্থায়ন (এলসি সম্পাদন) মনিটর করে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃঅর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের ভেতরে আমদানি-বিকল্প শিল্পের প্রসারে বাংলাদেশ ব্যাংক নানামুখী প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে।
আগেই যেমনটি বলেছি, এবারের মুদ্রানীতিতে রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। রিভার্স রেপো রেটও অনুরূপ হারে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। ঋণের হারের ওপর যে সিলিং দেওয়া আছে, তা আংশিকভাবে আগেই তোলা হয়েছিল। ভোক্তা ঋণের হার মৌখিকভাবে ১২ শতাংশ করা হয়েছিল। কিন্তু তার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল না। মুদ্রানীতিতে এ বিষয়টি আসায় তা আনুষ্ঠানিক রূপ নিল। তা ছাড়া ক্রেডিট কার্ডে নেওয়া ঋণের সুদের হারে কোনো সিলিং আগে থেকেই নেই। বাদবাকি ঋণের সুদ হারের সিলিং থেকেও বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতির উন্নতি সাপেক্ষে সরে আসবে বলে জানিয়েছে। আমানতের ওপর সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ লভ্যাংশের সিলিং পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নিশ্চয় অভ্যন্তরীণ তারল্য পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি হবে। তবে শিল্প ও অন্যান্য ঋণের সুদ হারে সর্বোচ্চ সিলিং বজায় রেখে ডিপোজিট হারকে উন্মুক্ত করে দেওয়ার ফলে সুশাসনের অভাবে জর্জরিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেশি হারে 'অ্যাগ্রেসিভলি' আমানত সংগ্রহ করতে পারে। এর ফলে নতুন করে চাহিবামাত্র আমানত ফেরত না পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঝুঁকির কথা না মনে রেখেই দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বেশি করে অর্থ জমা করার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়তে পারে। এদিকটায় অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চয় খেয়াল রাখবে। সরকারি অর্থ ব্যাংকে জমা দেওয়ার সুস্পষ্ট নিয়মনীতি আছে। সেগুলো যেন মানা হয়। আর বাংলাদেশ ব্যাংকও তার তত্ত্বাবধান এসব ক্ষেত্রে জোরদার করবে বলে আমার বিশ্বাস। তা না হলে সাবেক 'ফারমার্স ব্যাংক'-এর মতো অবস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।

মুদ্রানীতির 'ব্যালান্স অব পেমেন্ট' নিয়ে বেশ কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। এগুলো নিয়ে সার্বক্ষণিক বিশ্নেষণ ও মনিটরিং অপরিহার্য। বিশেষ করে বলা হয়েছে, বর্তমান অর্থবছর শেষে বাণিজ্য ভারসাম্য নেগেটিভ ২০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার হবে। চলতি হিসাব ভারসাম্য নেগেটিভ ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার এবং ওভারঅল ব্যালান্স ৫ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার হবে। দিন শেষে রপ্তানি বৃদ্ধির হার হবে ১০ শতাংশ। আমদানি কমবে ৯ শতাংশ হারে। প্রবাসী আয় বাড়বে ৪ শতাংশ হারে। এসবের যোগফল হিসাবে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়াবে ৩৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের হিসাব মেনে নিলেও তা ২৮ বা ২৯ বিলিয়ন ডলারে থিতু হবে। আরেকটি হিসাবে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়বে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ হারে। সরকারি ঋণ বাড়বে প্রায় ৩৮ শতাংশ হারে। ব্যক্তি খাতের ঋণ বাড়বে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। সরকারি খাতের ঋণ এই হারে বাড়লে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ মানিও যে দ্রুত বাড়বে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এর প্রভাব মূল্যস্ম্ফীতির ওপর নিশ্চয় পড়বে। সব মিলিয়ে এক মিশ্র আউটলুক মাথায় নিয়েই এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়ে যাবে। নেট ফরেন অ্যাসেট ১১ শতাংশ হারে কমা সত্ত্বেও এই আশাবাদ বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ধন্যবাদ পেতেই পারে। তবে মুদ্রানীতিতে বেশ কিছু শর্তসাপেক্ষে এই আশাবাদ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ কদ্দিন চলবে এবং কতটা গভীর হবে? খ. ফেড তার নীতি হার বাড়ানোর দৌড় কবে থামাবে? এবং গ. কভিড-১৯ সারাবিশ্বে কি আবার ছড়িয়ে পড়বে? (চীনের পরিস্থিতি সাপেক্ষে)। এসব ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতি হলে নিশ্চয় বাংলাদেশের অর্থনীতির সূচকগুলোর উন্নতি হবে। যদি বিপরীত ঘটনা ঘটে, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির সহিষুষ্ণতা এবং আত্মশক্তির ওপর অনেকটাই নির্ভর করে টিকে থাকার পথ খুঁজে নিতে হবে।

নিঃসন্দেহে ধেয়ে আসা বিশ্বমন্দার প্রেক্ষাপটে দেওয়া এই মুদ্রানীতি বাস্তবতার কাছাকাছি। চলমান আইএমএফ ঋণ আলোচনার কথাও বাংলাদেশ ব্যাংককে মনে রেখেই এই মুদ্রানীতি তৈরি করতে হয়েছে। তাই যেসব লক্ষ্য মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য। প্রকৃত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির জন্য ঋণের প্রবাহ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা যে মুদ্রানীতি প্রণেতারা ভোলেননি তার প্রমাণ মেলে 'আর্থিক অন্তর্ভুক্তি' ও 'ক্যাশলেস' সমাজ গড়ার অঙ্গীকার বিষয়ে সুস্পষ্ট উচ্চারণের মাধ্যমে।

মানুষের কাছে সহজেই নিয়ে যাওয়া যায়, কম খরচে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রসারের জন্য যে নীতি পরিবেশের ওপর জোর দিয়ে এই মুদ্রানীতি প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারা যে সত্যি সত্যি উন্নয়নমুখী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঐতিহ্য ধারণ করছে, তার প্রমাণ রেখেছে এই মুদ্রানীতি। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক বিগত বিশ্ব আর্থিক মন্দার পর থেকেই প্রকৃত অর্থনীতির উন্নয়নের দিকে তার অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন কৌশলের সূচনা করেছে। কৃষি, খুদে ও মাঝারি ও সবুজ উদ্যোগে কম সুদের অর্থ ঢেলে বাংলাদেশ ব্যাংক মাইক্রো ও ম্যাক্রো উভয় অর্থনীতিকেই স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই কৌশল কভিডে আক্রান্ত অর্থনীতিকে সচল রাখার ধারাকে আরও গতিময় করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তার মোকাবিলাতেও উন্নয়নমুখী কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার পারদর্শিতা দেখিয়ে চলেছে। বর্তমান মুদ্রানীতিও সেই কৌশলকে ধারণ করেছে। মূল্যস্ম্ফীতিই আমাদের একমাত্র সমস্যা নয়; আমাদের অল্পস্বল্প আয়-রোজগারের মানুষের অর্থনৈতিক চাকাকেও সচল রাখতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনে পর্যুদস্ত মানুষকেও বাঁচাতে হয়।

সরকার একা তার বাজেটের মাধ্যমে এই বহুমুখী মানবিক উন্নয়ন করে উঠতে পারে না। সে কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে পুরো ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতকে সহযোগী হতে হয়। এমনকি পুঁজিবাজারকেও উন্নত করার কাজে ব্যাংকিং খাতকে তারল্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হয়। এই বহু লক্ষ্যভেদী মুদ্রানীতির প্রচলন বাংলাদেশ ব্যাংকই শুরু করেছে। এখন সারাবিশ্বে তা ছড়িয়ে পড়ছে। তাই ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে যখন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার (বার্কলে) প্রফেসর ব্যারি আইচেনগ্রিন লেখেন- 'মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও লেনদেন ব্যবস্থার বাইরেও জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈষম্যের নেতিবাচক প্রভাব দূর করার ক্ষেত্রে মুদ্রানীতির কাজ করার সুযোগ রয়েছে' তখন এই ভেবে ভালো লাগে, বাংলাদেশ ব্যাংক এক দশকেরও বেশি সময় আগে মুদ্রানীতিকে এই লক্ষ্যে নয়া আদলে সাজাতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এই ঐতিহ্য বাংলাদেশ ব্যাংক বহন করে চলেছে। সবশেষে মুদ্রানীতিতে এই বহুমুখিনতা বেশ স্পষ্ট করেই ধরা পড়েছে।

তবে এই মুদ্রানীতি কতটা সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করছে বিদ্যমান রাজনৈতিক অর্থনীতির ওপর। যদি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদগুলো সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে বিদ্যমান তারল্য সমস্যা ও অব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক করতে মনোযোগী হয়, সরকারের রাজস্বনীতি যদি বাজেট ব্যবস্থাপনায় একইভাবে মনোযোগ দিয়ে অতিরিক্ত সরকারি ঋণ গ্রহণ না করার সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে, তাহলে নিশ্চয় এই মুদ্রানীতির লক্ষ্যগুলো পূরণ করা কঠিন হওয়ার কথা নয়। পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়ানোর দিকেও সবাইকে মনোযোগ দিতে হবে। আশার কথা, আন্তর্জাতিক অংশীজনরাও বাংলাদেশের স্বকীয় উন্নয়ন কৌশলের গুরুত্ব অনুধাবন করে আমাদের মুদ্রানীতির লক্ষ্যগুলো পূরণে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। সরকারসহ সব অংশীজন মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে তাদের সহযোগিতার এই হাত বাড়িয়ে দিলে নিশ্চয় অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল ও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

ড. আতিউর রহমান :বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

আরও পড়ুন

×