ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মানবসম্পদ

শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও পরিবর্তনশীল সমাজ

শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও পরিবর্তনশীল সমাজ
×

মো. ছাদেকুল আরেফিন

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৯:১৯

আপাতদৃষ্টিতে সমাজ দ্রুত পরিবর্তনশীল মনে হলেও সামাজিক পরিবর্তন প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি। বর্তমান সময়ে সমাজের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা গেলেও এ পরিবর্তনগুলো দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাস্তবিক অর্থে দৃশ্যমান পরিবর্তন ও তার প্রভাব আলোচনা করতে গেলে সমাজ ও পরিবর্তন-সংশ্নিষ্ট কিছু তাত্ত্বিক বিষয়ের যোগসূত্রে আলোচনা করা প্রয়োজন। মূলত একটি সমাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশ, এমনকি মনস্তাত্ত্বিকসহ সামগ্রিক পরিবর্তন দৃশ্যমান। এই দৃশ্যমান পরিবর্তনের সমন্বিত রূপই স্থানান্তর। অর্থাৎ সমাজের সামগ্রিক অবস্থার স্থানান্তর। এই দৃশ্যমান স্থানান্তরকে সমাজবিজ্ঞানী হাবার্ট স্পেনসর বলেছেন, একটি জটিল কাঠামোতে ক্রমান্বয়ে রূপান্তরিত হওয়া, যা সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সমাজের রূপান্তর বা অবস্থান্তর। এই অবস্থান্তরকে সামগ্রিক অর্থে স্থানান্তর বলা যায়। সংগত কারণেই পরিবর্তনশীলতার প্রভাবে উল্লিখিত স্থানান্তর অবস্থায় সমাজের বহুমুখী প্রভাব দৃশ্যমান। এই দৃশ্যমান প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের মানসিকতার ওপর ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় ধরনের রেখাপাত করে। পরিবর্তনশীল সমাজে বিরাজমান সমাজ কাঠামোর পরিবর্তনসহ এ সংশ্নিষ্ট সব কার্যক্রমের এক ধরনের পরিবর্তন, মূল্যবোধ ও আদর্শের পরিবর্তন, আচরণগত পরিবর্তন, পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তন, সর্বোপরি মনোভাবের পরিবর্তন বা মানসিকতার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান।

পরিবর্তনশীলতার কার্যকারণ আলোচনা করতে গেলে দেখা যায়, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন, তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সহজলভ্যতা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ উন্নয়ন, উৎপাদন খাত তথা বিদ্যুৎ, কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্যসুবিধা প্রাপ্তি, কর্মসংস্থানে জীবনযাত্রার মান, বাণিজ্য সুবিধায় অর্থনীতির গতিশীলতা ইত্যাদির প্রভাবে মানসিকতায় পরিবর্তন ও মূল্যবোধের পরিবর্তন। আবার নেতিবাচক প্রভাবে সামগ্রিক অস্থিরতা, মানসিকতার নেতিবাচক পরিবর্তন, মূল্যবোধের অবক্ষয়, মন ও মননে অস্থিরতা সৃষ্টি, সর্বোপরি মানসিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব। উল্লিখিত দুটি ক্ষেত্রেই কার্যকারণ সম্পর্ক বিদ্যমান। এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের মানসিকতার ওপর নেতিবাচক কার্যকারণ সম্পর্কীয় আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্ববহ এবং প্রয়োজনীয়। কেননা, নেতিবাচক প্রভাবগুলো শিক্ষার্থীদের মন ও মানসিকতার ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি করে। ফলে সৃষ্টি হয় আস্থিরতার। এর প্রভাবে মূল্যবোধ হয় পরিবর্তিত। বর্তমান সমাজে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ও সহজ প্রাপ্তি যেমন ইতিবাচক, তেমনি এর যথাযথ ব্যবহারের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার যদি সঠিক এবং ইতিবাচক উদ্দেশ্যে না হয়, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব অবশ্যই উদ্বেগের কারণ। তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সংশ্নিষ্ট অন্য সব ক্ষেত্রের ব্যবহার অবাধ হলে বেশ কিছু ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব অবশ্যম্ভাবী। যা কিছু ক্ষেত্রে লক্ষণীয়।

মানসিক উন্নয়নের ধাপগুলো রুদ্ধ হতে থাকে। নানা ধরনের মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। তাই সংগত কারণেই সেটি মানসিক পরিবর্তনে প্রভাবদায়ক হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান সমাজে এই পরিবর্তন লক্ষণীয়। প্রসঙ্গত, বর্তমানে আমাদের দেশে সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন তথা স্থানান্তর ঘটছে। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে পরিবর্তন। সামাজিক ক্ষেত্রে শিক্ষার হার বৃদ্ধি, জনসংখ্যা ও মাতৃমৃত্যুহার হ্রাস, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার, আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা ও পয়ঃনিস্কাশনের সুবিধা বৃদ্ধি, সংস্কৃতি, পরিবেশসহ সব খাতের সমন্বিত উন্নয়ন তথা সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নের মধ্য দিয়ে সমাজে পরিবর্তন ও সমাজের এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় স্থানান্তর আজ দৃশ্যমান। এই ইতিবাচক দিকের বিপরীতে বেশ কিছু নেতিবাচক বিষয়ও এর মধ্যে রয়েছে। ফলে সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি সমাজস্থ সব মানুষের ওপর প্রতিফলিত। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মানসিকতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনাযোগ্য। কেননা, বর্তমানে আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ হলো শিশু, তরুণ ও যুবা জনগোষ্ঠী, যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। এই শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা গঠন পর্যায়ে সমাজের পরিবর্তন প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে। যেহেতু শিক্ষার্থীদের মন ও মানসিক অবস্থা থাকে গঠন পর্যায়ে, সেহেতু সমাজের পরিবর্তনগুলো দ্রুত তাদের প্রভাবিত করে থাকে। সে ক্ষেত্রে সমাজের বিদ্যমান অবস্থা ও পরিবর্তনগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে নানামুখী ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ করে সঠিক নির্দেশনা অতি জরুরি। আগেই উল্লেখ করেছি, বর্তমান সমাজের পরিবর্তনগুলো সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে, যা শিক্ষার্থীদের মানসিকতার ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয় বরং দ্রুততার সঙ্গে প্রভাবিত হয় শিক্ষার্থীরা। ফলে শিক্ষার্থীদের মন, মনন এবং মূল্যবোধে পরিবর্তন আসে সহজেই। এ ক্ষেত্রে সমাজের নেতিবাচক পরিবর্তন ও প্রভাবের ক্ষতিকর দিকগুলো বিশেষভাবে গ্রাহ্য। সমাজের নেতিবাচক ও ক্ষতিকর প্রভাবগুলো অগ্রাহ্য করলে দীর্ঘমেয়াদি ফলস্বরূপ তা শিক্ষার্থীদের সঠিক ও সুস্থ মানসিকতা গঠনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে এবং ভয়াবহ রূপ নেবে- এটি অবধারিত। কেননা, শিক্ষার্থীদের মন, মনন এবং মানসিকতা থাকে কোমল ও কৌতূহলপ্রবণ। ফলে নতুন যে কোনো বিষয় সামনে এলে বা কোনো পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়ে উপস্থাপিত হলে তার প্রতি শিক্ষার্থীদের কৌতূহল ও আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায় এবং সেটি গ্রহণ ও ব্যবহারের চেষ্টাও করে থাকে। ফলে সমাজের নেতিবাচক ও ক্ষতিকর পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে যদি শিক্ষার্থীদের পরিস্কার ধারণা না দেওয়া যায়, তাহলে সেটি গ্রহণে তারা বিরত থাকবে না।

এ ক্ষেত্রে সমাজের স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে যথাযথ নীতিমালা গ্রহণ ও উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম সক্রিয় করতে হবে। এই স্থানীয় উদ্যোগের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাকে সংশ্নিষ্ট ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করতে হবে। সর্বোপরি তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মন, মনন, ও মানসিকতা সুস্থ-সবল ও দৃঢ় করতে হবে।
অধ্যাপক ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন: উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×