ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

আর নয় শিশু নির্যাতন

আর নয় শিশু নির্যাতন
×

এহ্‌সান মাহমুদ

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৯:২৩

শিশুর জন্য নিরাপদ পৃথিবীর অঙ্গীকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে যে তা বেশ উপেক্ষিত- এটি দেখা গেল একটি বেসরকারি অধিকার সংস্থার এক প্রতিবেদনে। মঙ্গলবার রাজধানীতে এক সংবাদসম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন অনুসারে, বিশেষ করে শ্রমে নিযুক্ত সব শিশু কোনো না কোনোভাবে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে; বিদায়ী ২০২২ সালে শিশু নির্যাতন ২০২১ সালের তুলনায় বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। শিশুহত্যার মতো ঘটনাও গত বছর বেড়েছে বলে এতে দেখা গেছে। প্রতিবেদনটির প্রণেতা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) বক্তব্য, সমকালসহ আটটি দৈনিকে প্রকাশিত শিশু অধিকারবিষয়ক সংবাদ পর্যালোচনা করে এই তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়েছে।
তাদের মতে, ২০২২ সালে ৩১১ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে এবং অন্য ৪২ শিশুকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে। ২০২১ সালে হত্যার শিকার হয়েছিল ১৮৩ শিশু। গত বছর ৬৮ শিশু ভয়াবহ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২০২১ সালে ভয়াবহ নির্যাতনের ১৬টি ঘটনা ঘটেছে। নির্যাতনকারীদের মধ্যে আছেন গৃহকর্তা, বাবা-মা, শিক্ষক, উত্ত্যক্তকারী, স্থানীয় চেয়ারম্যান, চাকরিদাতা, প্রতিবেশী ও সৎমা। ২০২২ সালে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হারও আশঙ্কাজনক মাত্রায় বেড়েছে। ২০২১ সালে পানিতে ডুবে ৪০৫ শিশু মারা গিয়েছিল, ২০২২ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১৫২। এর মধ্যে ৫২০ মেয়েশিশু ও ৬৩২ ছেলেশিশু। যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুর সংখ্যা ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে কমলেও ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার হার বেড়েছে। ২০২২ সালে মোট ৯৬ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ছেলেশিশু ২০। ২০২১ সালে ছিল ছয়জন। বিভিন্ন কারণে গত বছর আত্মহত্যা করেছে ৪৪ শিশু।

উক্ত সময়ে শিশু নির্যাতনের যত ঘটনা ঘটেছে তার সবটাই সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে- এমন দাবি করা যাবে না। প্রথমত, অভিভাবকদের মধ্যে এ নিয়ে সচেতনতার ঘাটতি যথেষ্ট; দ্বিতীয়ত, লোকজানাজানি হলে থানা-পুলিশ করতে হতে পারে, যেক্ষেত্রে নানা ঝামেলার কথা সবারই জানা। তাই বহু অভিভাবকের সন্তান হারানোর বা সন্তানের কষ্ট দেখেও মনোযোগ থাকে কত দ্রুত তা আড়াল করা যায়।

সমাজ ও রাষ্ট্রে শিশুর প্রতি এমন মনোভাব কোনো শুভ ইঙ্গিত বহন করে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শিশুদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে প্রচলিত আইনের বাস্তবায়ন ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। এ ছাড়া শিশুর উন্নয়ন ও কল্যাণে বিনিয়োগ প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে জাতীয় বাজেটে শিশুদের জন্য সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই।
আমরা বলে থাকি, আজকের শিশুই দেশের ভবিষ্যৎ। তাহলে শিশুর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে আমরা সুন্দর ভবিষ্যৎ কীভাবে আশা করতে পারি? শিশুর প্রতি সহিংসতা বা নির্যাতন সাময়িক কোনো বিষয় নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলও আছে। শিশুরা যদি সঠিকভাবে বেড়ে ওঠে তা যেমন দেশের জন্য মঙ্গলকর, তেমনি শিশুরা সহিংসতা বা নির্যাতনের শিকার হলে এটি নানা রকম নেতিবাচক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন- শিশুরা পরিণত বয়সে সহিংস হয়ে ওঠার পাঠ পরিবার বা পারিপার্শ্বিকতা থেকেই গ্রহণ করে।
শিশুর প্রতি একটি রাষ্ট্র বা সমাজ কতটা মানবিক বা সংবেদনশীল, তা অনেকটা বোঝা যায় শিশুর প্রতি আচার-আচরণ, বিবেচনাবোধ এবং গুরুত্ব প্রদানের বিষয় থেকে। আমরা যদি সত্যিই একটি মানবিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে শিশুর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতন বন্ধের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। শিশুনিরাপত্তায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার ফলে ন্যায়বিচার আটকে যায়। যেসব কারণে শিশু নির্যাতন মামলার জট লেগে আছে, সেগুলো হলো- ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ না হওয়া, তদন্তে দুর্বলতা ও সময়ক্ষেপণ। অপরাধ করে অপরাধী পার পেয়ে গেলে শিশু নির্যাতন কমবে কীভাবে?

এহ্‌সান মাহমুদ: সহসম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×