ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক

পশ্চিমাদের এখনই ইউক্রেন যুদ্ধ থামানো উচিত

পশ্চিমাদের এখনই ইউক্রেন যুদ্ধ থামানো উচিত
×

ইশান থারুর

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ২৩:১৪

ইউক্রেন যুদ্ধের ফল অন্তত পশ্চিমা রাজনীতির কিছু নীতিনির্ধারকের জন্য- অস্ত্র সরবরাহের নিরিখে পরিমাপ করা যেতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার নির্মম আক্রমণের জবাব দিতে ইউক্রেন ব্যবহার করছিল বর্শা, কামান ও মর্টারের মাঝামাঝি ধরনের হাউইটজার নামক অস্ত্র, ড্রোন, অস্ত্রসজ্জিত যানবাহন, বিমানবিধ্বংসী সিস্টেম ও ১৯৯০-এর দশকে মার্কিন সেনাদের জন্য নির্মিত রকেট লাঞ্চার। অতি সম্প্রতি সেখানে যুক্ত হয়েছে ট্যাঙ্ক। প্রতিটি পর্যায়ে কিয়েভ আক্রমণকারী রাশিয়ানদের বিতাড়িত করার জন্য আরও অস্ত্র দাবি করেছে এবং প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে পশ্চিমারা ইউক্রেনের দাবি মেনে নিয়েছে। যদিও সম্ভবত ইউক্রেন যত দ্রুত তা চেয়েছে, তত দ্রুত নয়।

পরবর্তী রাউন্ডের আবদারটি হতে চলেছে বহুমুখী যুদ্ধবিমানবিষয়ক, যা কিয়েভ চায় (এখনও গুজব হলেও) সম্ভাব্য নতুন রুশ আক্রমণ ঠেকাতে এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ২০১৪ সালে দখলকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপের পাশাপাশি দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত মাসে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্বের অভিজাতদের উদ্দেশে বলেছিলেন, আমাদের আপনারা অস্ত্র দিন। আমরা এক সময় আমাদের ছিল এমন সবকিছু ফেরত আনব।

মনে হচ্ছে, পশ্চিমারা ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে তাদের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে; একই সঙ্গে কিয়েভের যুদ্ধজয়ের উচ্চাভিলাষী ভবিষ্যদ্বাণীকেও তারা আমলে নিয়েছে। অনানুষ্ঠানিক আলাপে পশ্চিমা কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, যুদ্ধটি কূটনৈতিকভাবে শেষ হওয়া উচিত (এবং সম্ভবত এভাবেই তা শেষ হতে পারে)। কিন্তু যখনই কোনো সাংবাদিক তাঁদেরকে প্রকাশ্যে তা স্বীকার করতে বলেন, তখন তাঁরা গতানুগতিকভাবে বলেন, শান্তির শর্তগুলো আসলে ইউক্রেনকেই ঠিক করতে হবে (যদিও বিদেশি সাহায্য ছাড়া ইউক্রেনের পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভবত অসম্ভব); খোলামেলা আলোচনায় রাশিয়া আগ্রহী নয় এবং এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ইউক্রেনকে পর্যাপ্ত অস্ত্র দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে আলোচনার টেবিলে তার হাতটা শক্তিশালী হতে পারে।

তবে একটি নতুন প্রতিবেদন পাশ্চাত্যের এ অবস্থানকে সমস্যাপূর্ণ মনে করে। সেখানে এ সতর্কবার্তাও দেওয়া আছে- এহেন অবস্থান বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তহীন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এমনকি পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। 'একটি দীর্ঘ যুদ্ধ এড়াতে যা হতে পারে মার্কিন নীতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের গতিপথ'- এ শিরোনামের একটি লেখায় সম্প্রতি ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক র‌্যান্ড করপোরেশন যুক্তি দিয়েছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, তত তার তীব্রতা বাড়বে, যা রাশিয়াকে ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষেও লিপ্ত করতে পারে। তেমন পরিস্থিতিতে সম্ভবত ক্রেমলিন যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপন করতে পারে। লেখকদের পরামর্শ, যুদ্ধকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে পশ্চিমা শক্তিগুলোর উচিত যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে আলোচনার দিকে ঠেলে দেওয়া।

এটি এমন একটি যুক্তি, যা এর আগেও আমরা শুনেছি, বিশেষত হেনরি কিসিঞ্জারের মতো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি-নির্ধারকদের কাছ থেকে। কিন্তু যেখানে এত দিন বেশিরভাগ থিঙ্কট্যাঙ্ক ইউক্রেন যুদ্ধকে বিশেষ করে বিশ্বমঞ্চে মার্কিন নেতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক বলে প্রশংসা করে এসেছে, সেখানে র‌্যান্ড করপোরেশনের এ প্রতিবেদন ওয়াশিংটনের নীতি পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছে। উল্লেখ্য, বেল্টওয়ে নকশার সঙ্গে ভিন্নতা ঘটিয়ে র‌্যান্ড প্রতিবেদনটিতে একবারও 'গণতন্ত্র', 'আইনের শাসন' বা 'পশ্চিমা মূল্যবোধ'-এর কথা উল্লেখ করা হয়নি।

খুব মোলায়েম ভাষায় প্রতিবেদনের লেখক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল চারাপ ও মিরান্ডা প্রিবে ইউক্রেন যুদ্ধের উদ্বেগজনক কাঠামোগত সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করেছেন। রাশিয়া বা ইউক্রেন যতই স্বপ্ন দেখুক; 'নিরঙ্কুশ বিজয়' কারোরই হবে না।


রাজনৈতিক বক্তৃতা যা-ই হোক না কেন, পশ্চিমারা কত দিন ইউক্রেনে তাদের সাহায্য ও অস্ত্রের প্রবাহ বজায় রাখতে পারবে, তা অনিশ্চিত। একটি নতুন পিউ পোল দেখায়- আগের চেয়ে আরও অধিক সংখ্যক আমেরিকান এরই মধ্যে বিশ্বাস করা শুরু করেছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের জন্য অতিরিক্ত করছে। র‌্যান্ড করপোরেশনের প্রতিবেদনটির লেখকরাও এ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া মানে ইউক্রেনীয়দের জন্য আরও বেশি দুর্ভোগ এবং ইউরোপে আরও বেশি অর্থনৈতিক দুর্যোগ।

এর সঙ্গে আছে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রশ্ন। কয়েক মাস ধরে ইউক্রেন ও তার মিত্ররা তাদের সমর্থকদের রুশ প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনের পারমাণবিক যুদ্ধের বিক্ষিপ্ত হুমকি উপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দাপ্রধান মেজর জেনারেল কিরিলো বুদানভ সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের এক সাংবাদিককে কিয়েভে বলেছেন, 'এটি রাশিয়ার একটি ভয় দেখানোর কৌশল।'

কিন্তু চারাপ ও প্রিবে স্পষ্ট করেই বলেছেন, 'বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রাগার রয়েছে এমন একটি দেশের সঙ্গে একটি যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার ঝুঁকি মারাত্মক হতে পারে।' লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ত্রুটি বা অন্যান্য কৌশলগত ভুল গণনার কারণে যদি রাশিয়ার সঙ্গে শত্রুতা বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা দ্রুত ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে রাশিয়ার সঙ্গে খোলামেলা সংঘর্ষে টেনে আনতে পারে। তাঁরা আরও লিখেছেন, 'রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ এড়ানো কঠিন হবে, বিশেষ করে যখন রাশিয়ার প্রচলিত সামরিক বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়েছে।' তাঁরা লিখেছেন, 'কিছু বিশ্নেষক সন্দেহ করছেন, রাশিয়া একটি ন্যাটো দেশকে আক্রমণ করার সাহস পাবে না। যেহেতু দেশটি এরই মধ্যে ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে মার খাচ্ছে এবং তখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জোটের বিরুদ্ধে তাকে যুদ্ধ করতে হবে। তবে যদি ক্রেমলিন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়- দেশের জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিপন্ন, তাহলে ভালো কোনো বিকল্পের অভাবে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ন্যাটোর সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারে।'

কেন এ ধরনের একটি পরিস্থিতি জেনেশুনে ডেকে আনা হবে- এমন প্রশ্ন তুলে লেখকদের যুক্তি, এমনকি সংঘাতের বর্তমান অবস্থায়ও যদি তা থামানো যায়, তবে রাশিয়ার উল্লেখযোগ্য পরাজয় হবে। তাঁরা লিখেছেন, 'যুদ্ধটি এরই মধ্যে রাশিয়ার জন্য এতটাই ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে যে, তাকে আরও দুর্বল করার চেষ্টা মার্কিন স্বার্থের জন্য বাড়তি কোনো সুবিধা না-ও আনতে পারে। রাশিয়ান সামরিক বাহিনী এবং অর্থনীতি ইতোমধ্যে যে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে তাদের কয়েক বছর, এমনকি সম্ভবত কয়েক দশক লাগবে।'

দ্য ইকোনমিস্ট সাময়িকীর জন্য একটি পৃথক লেখায় কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের পরিচালক ক্রিস্টোফার চিভভিস একই রকম দাবি করেছেন- 'আলোচনা যদি যুদ্ধ এখন যে পর্যায়ে রয়েছে সেখানে শুরু হয়, তাহলে পুতিনকে খুব সীমিত লাভের বিনিময়ে খুব বেশি মূল্য দিতে হবে।' তিনি লিখেছেন, 'তার সশস্ত্র বাহিনী সারাবিশ্বের কাছে তাদের অক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। রাশিয়া বিশ্বপরিসরে এখন একটি একঘরে রাষ্ট্র এবং ইউরোপের সঙ্গে তার শতাব্দীপ্রাচীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ধ্বংস হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগামী বহু বছরের জন্য মন্থর করবে, এমনকি যদি ক্রেমলিন কোনোভাবে পশ্চিমাদের সঙ্গে আপসরফাও করে।'

র‌্যান্ড করপোরেশনের লেখকরা পরামর্শ দিয়েছেন, অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত রাশিয়াকে একটি রোডম্যাপ অফার করা, যাতে চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা উপশমের শর্তগুলো দেওয়া থাকবে। আর চিভভিসের দাবি- এমনকি পুরো নিখুঁত না হলেও যে কোনো ধরনের সমঝোতা আলোচনা এখনই শুরু করা দরকার, যা অন্তত এ ধারণার চেয়ে ভালো হবে যে রাশিয়াকে ইউক্রেনের ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করা যেতে পারে।

তিনি লিখেছেন, 'হ্যাঁ, ইউক্রেন আরও কিছু ভূখণ্ড ফিরে পেলে ভালো হবে। কিন্তু কী মূল্যে এবং কী কৌশলগত লাভের জন্য তা হবে? এমনকি পশ্চিমারা বহু বছর ধরে ইউক্রেনকে সমর্থন করে শেষ পর্যন্ত রাশিয়াকে পুরো ইউক্রেন ভূখণ্ড থেকে বের করে দিতে বাধ্য করার অসম্ভব ঘটনাও যদি ঘটে, রাশিয়া সম্ভবত তার হারানো সম্পদ ও খ্যাতি পুনরুদ্ধারের জন্য কোনো এক সময় আবার যুদ্ধ শুরু করবে।'

চারাপ ও প্রিবেও মনে করেন না- ইউক্রেনের স্বার্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সমার্থক।

ইশান থারুর: ওয়াশিংটন পোস্টের কলাম লেখক; ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর সাইফুর রহমান তপন

আরও পড়ুন

×