ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দিবস

হাজারে যদি দু’জন মিলত!

হাজারে যদি দু’জন মিলত!
×

শাকিল সামস

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৩ | ১৮:০০

মানবদেহের অপরিহার্য উপাদান রক্ত। রক্তের বিকল্প শুধু রক্তই। চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনও এর বিকল্প আবিষ্কার করতে পারেনি। রক্তের অভাবে যখন কেউ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন কেবল অন্য একজনের দান করা রক্তই জীবন বাঁচাতে পারে। নিরাপদ রক্ত নিশ্চিতকরণ ও স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের উৎসাহ দিতে ২০০৪ সাল থেকে ১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস পালিত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর ৮-১০ লাখ ব্যাগ রক্ত ও রক্ত উপাদানের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের এ দেশে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা খুবই কম; চাহিদার মাত্র ২৬ শতাংশ রক্ত আহরিত হয় স্বেচ্ছায় রক্তদাতার মাধ্যমে। বাকি ৭৪ শতাংশ রক্তের জন্য ছুটতে হয় আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজনের কাছে। সেখানেও ব্যর্থ হলে পেশাদার রক্ত বিক্রেতার শরণাপন্ন হতে হয়।
প্রশ্ন ওঠে, পেশাদার রক্ত বিক্রেতার রক্ত কতটা নিরাপদ? এদের রক্ত ব্যবহারের ফলে রোগীর দেহে ঘাতক ব্যাধির জীবাণু সংক্রমিত হয়ে জীবন বিপন্ন হতে পারে। এ জন্য স্বেচ্ছা রক্তদাতার রক্তই সবচেয়ে নিরাপদ। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতি হাজারে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ জন স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। অথচ ইউরোপে প্রতি হাজারে স্বেচ্ছায় রক্তদাতা ৬০ থেকে ৮০ জন। সুইজারল্যান্ডে এ সংখ্যা বিশ্বের সর্বোচ্চ– ১১৩। বিশাল জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে প্রতি হাজারে মাত্র দু’জন রক্ত দিলেই মোট চাহিদা পূরণ সম্ভব।

হতাশার বিষয়, রক্তদান সম্পর্কে ভুল ধারণা, ভয়, অজ্ঞতা ও কুসংস্কার, পরিবারের সদস্যদের বাধা, সুযোগের অভাব, সুচভীতি, উদ্বুদ্ধকরণের অভাব, সামাজিক স্বীকৃতির অভাব ইত্যাদি কারণে এ দেশে স্বেচ্ছা রক্তদান আন্দোলন প্রতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। অথচ পশ্চিমবঙ্গে ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ভলান্টারি ব্লাড ডোনার্স’ পুরো ভারতের স্বেচ্ছা রক্তদান আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমাদের দেশেও স্বেচ্ছা রক্তদান আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে সন্ধানী, রেড ক্রিসেন্ট, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, বাঁধন, অরকাসহ আরও কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
অথচ রক্তদানে রয়েছে বহুবিধ উপকারিতা। কারণ রক্তদানের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরের মধ্যে অবস্থিত ‘বোন ম্যারো’ নতুন কণিকা তৈরির জন্য উদ্দীপ্ত হয় এবং রক্ত দান করার দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন রক্তকণিকা জন্ম হয়ে এ ঘাটতি পূরণ করে। বছরে তিনবার রক্তদান রক্তদাতার লোহিত কণিকাগুলোর প্রাণবন্ততা বাড়িয়ে দেয় এবং শরীরে আয়রনের ভারসাম্য বজায় থাকে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়, বাংলাদেশ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো দেশেই পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের রক্ত কেনাবেচা হয় না। এ সুযোগে অনিরাপদ ও দূষিত রক্ত কেনাবেচার জন্য ঢাকাসহ সারাদেশে গড়ে উঠেছে অবৈধ ব্লাড ব্যাংক বাণিজ্য। এ দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। স্বেচ্ছা রক্তদান আন্দোলনে মানুষকে ব্যাপকভাবে সচেতন ও উদ্ধুদ্ধ করতে হবে। এর মাধ্যমে বন্ধ হবে রক্তের কেনাবেচা। রক্তের অভাবে কোনো মুমূর্ষু মানুষ মারা যাবে না; দূষিত রক্ত নিয়েও দুরারোগ্য ব্যাধিতে কাউকে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে না। তাই নিয়মিত রক্তদানের মাধ্যমে আমাদের পরিপূর্ণ সুস্থ থাকা ও প্রাণবন্ত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হবে।

ডা. শাকিল সামস: সহযোগী অধ্যাপক, অ্যানাটমি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ


আরও পড়ুন

×