আন্তর্জাতিক
আফগানিস্তানে মার্কিন জঞ্জাল সাফ করছে চীন
এফ এম শাকিল
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
গত সপ্তাহে ইরান, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে প্রথমবারের মতো ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা সংলাপের আয়োজন করেছিল বেইজিং। ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি সীমান্ত সংঘর্ষ ঘটেছে। তা ছাড়া তালেবান সরকার তার সীমানার মধ্যে সক্রিয় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণে রাজি হচ্ছিল না। এ দুই প্রেক্ষাপটে ওই নিরাপত্তা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, সংলাপের উদ্দেশ্য ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরিপ্রক্ষিতে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে ‘আফগানবিষয়ক নজরদারি’ চালানো নয়; স্থানীয় নিরাপত্তা সমস্যা মোকাবিলা করাই এর উদ্দেশ্য। তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ আলোচনা শেষ পর্যন্ত চীন, ইরান, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে যুক্ত করে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির দিকে গড়াবে। এটি দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধিতেও সহায়তা করবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি সূত্র দ্য ক্রেডলকে জানিয়েছে, আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা বৃদ্ধি পাকিস্তান, ইরান, চীনসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাই নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনটি দেশ তালেবান নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়িয়েছে। মস্কোভিত্তিক
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু কোরিবকো বিষয়টিকে আরও গভীরে গিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, নিরাপত্তা বিষয়টি ওই সংলাপের শীর্ষ এজেন্ডা হলেও ভারতের জন্য চিন্তার কারণ অন্য। চীন-ইরান বাণিজ্য রুট পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে যেতে পারে এবং তা চীন ও পাকিস্তানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে বিচলিত করতে পারে। ইরান ও পাকিস্তানের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা বেইজিংকে এই দীর্ঘ লালিত লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ করে দিতে পারে।
পাকিস্তান ইতোমধ্যে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান তথা টিটিপি জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে কাবুলের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। দীর্ঘদিনের পানি সমস্যা নিয়ে আফগান-ইরান সীমান্ত সংঘর্ষও ঘটেছে। অন্যদিকে একই সময়ে কোরিবকোর মতে, ‘ইরান-পাকিস্তান সম্পর্ক গত মাসে নাটকীয়ভাবে উন্নত হয়েছে। দুই দেশের নেতাদের যৌথভাবে মান্ড-পিশিন সীমান্ত বাজার উদ্বোধন এরই প্রমাণ। এই উন্নতি ঘটেছে মার্চের মাঝামাঝি চীনের মধ্যস্থতায় ইরান-সৌদি সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার পর। এ ঘটনা শুধু সৌদির মিত্র পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকটেরই সমাধান দেয়নি; ইরানের সঙ্গে আরও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের জন্য জায়গা তৈরি করেছে।’
অন্যদিকে চীন শুরু থেকেই তালেবানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও অর্থনীতিকেন্দ্রিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ফলে এ অঞ্চলে নিরাপত্তা ও বাণিজ্য সমস্যা সমাধানে তারাই আদর্শ মধ্যস্থতাকারী। এ অঞ্চলে বেইজিংয়ের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হলো, ইরান-পাকিস্তান সম্পর্ককে যে কোনো উপায়ে রক্ষা করা। কারণ, উভয় দেশই চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। চীন ২০২১ সালে পরের ২৫ বছরে ইরানে ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পাকিস্তানে বিআরআইর ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) বাস্তবায়নও দেশটিই করেছে। বেলুচিস্তানে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ গদর সমুদ্রবন্দরের পেছনে তার বিনিয়োগ রক্ষা করার জন্যও আঞ্চলিক শান্তি পুনরুদ্ধার জরুরি।
ইসলামাবাদভিত্তিক ফাটা রিসার্চ সেন্টারের প্রধান মনসুর খান মাহসুদ বলেছেন, ‘আঞ্চলিক বিষয়ে নতুন খেলোয়াড় হিসেবে চীনের জন্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যারা দীর্ঘদিন এখানে খেলে গেছে সেই যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা নিজস্ব স্বার্থ এগিয়ে নিতে আঞ্চলিক রাজনীতি ব্যবহার করেছিল। ফলে এখানে এখনও তাদের গোপন বাহিনী থাকাটা অস্বাভাবিক নয়, যারা বাণিজ্যকেন্দ্রিক বেইজিংয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা খর্ব করতে তালেবানকে প্রভাবিত করতে পারে।’
মাহসুদ আফগানিস্তান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সরে আসা নিয়েও সন্দেহ পোষণ করেন। তাঁর মতে, কয়েক দশক এখানে থাকার পর পেন্টাগন কি হঠাৎ বুঝল যে, এটা মার্কিন অর্থনীতির ওপর বোঝা বাড়াচ্ছে? তাই তাড়াহুড়ো করে তারা চলে গেল? বিষয়টা স্বাভাবিক নয়। তিনি বলেন, ‘আফগানিস্তানের অর্থনীতি এখনও তার চেয়ে অনেক শিল্পোন্নত প্রতিবেশী পাকিস্তানের তুলনায় ভালো চলছে। অথচ শিল্প-ভিত্তি বলতে তার তেমন কিছুই নেই এবং আন্তর্জাতিক সহায়তাও হয় একেবারে পাচ্ছে না বা খুব কম পাচ্ছে।’ তাঁর মতে, ‘এর অর্থ, আফগানিস্তান কোথাও থেকে বিশাল তহবিল পাচ্ছে।’ প্রশ্ন হলো, ‘কারা তালেবানকে অর্থায়ন করছে এবং ঠিক কী উদ্দেশ্যে?’
মার্কিনপন্থি শক্তিগুলোর দ্বারা ইরান, পাকিস্তান ও তালেবান সরকারের মধ্যে রোপণ করা বিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান টিটিপি ইস্যুতে তালেবানের সঙ্গে যুদ্ধ কোনো রকমে এড়িয়ে গেছে। আর ইরান পানির অধিকার নিয়ে গুরুতর সীমান্ত সংঘর্ঘে জড়িয়ে বেশ হতাহতের সম্মুখীন হয়েছে।
নিরাপত্তা ছাড়া কোনো নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য সম্প্রসারণ হতে পারে না। এ কারণে বেইজিং ২০১৮ সালের শেষের দিক থেকে সক্রিয়ভাবে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে একই ধরনের প্রক্রিয়া চালু করেছে। এ বছরের মে মাসে চীন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসলামাবাদে এক বৈঠক করেন। সেখানে তাঁরা যৌথভাবে শি জিনপিংয়ের বৈশ্বিক উন্নয়ন, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সভ্যতা উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাঁদের প্রচেষ্টার বিষয়ে অঙ্গীকার করেছেন। এপ্রিলে ইরান, রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উজবেক শহর সমরখন্দে চার দিনের আলোচনায় বসেন এবং আফগানিস্তান-সংক্রান্ত সমস্যা ও উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা করেন।
চীনের বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা ক্রমাগতভাবে প্রসারিত হচ্ছে। কিছু পশ্চিমা মিডিয়া সন্দেহ পোষণ করলেও, এটা স্পষ্ট– অর্থনৈতিক স্বার্থই এর মূল উদ্দেশ্য। আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ত্রিপক্ষীয় বা চতুর্ভুজ স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা সম্মেলনে বেইজিংয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশটিকে এ অঞ্চলে নতুন এক ভূমিকায় অবতীর্ণ করেছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত এশিয়া ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, ১৫টি দেশ নিয়ে গৃহীত হার্ট অব এশিয়া উদ্যোগে জড়িত থাকার কারণে ওই কাঠামোর মধ্যে চীনের প্রভাব আরও গভীর ও বিস্তৃত হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈচিত্র্য বিদ্যমান থাকলেও সামগ্রিকভাবে ত্রিপক্ষীয় কাঠামো এবং বিশেষ করে আফগানিস্তান, ইরান ও পাকিস্তান নিয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থাতেই এ অঞ্চলের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর সম্ভাব্য সমাধান নিহিত। ২০০৯ সাল থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থার (ইসিও) মধ্যে আলোচনার পাশাপাশি আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় মেলামেশা রাজনৈতিক, নিরাপত্তা, আর্থসামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে।
অবশ্য, এই ত্রিপক্ষীয় মিথস্ক্রিয়া সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চর্চার কারণে কিছুটা কমে গেছে। প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, আফগান সরকার প্রধানত ত্রিপক্ষীয় ফোরামকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর বদলে পাকিস্তান ও ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে উৎসাহী।
বৈশ্বিক অঙ্গনে প্রভাবশালী হয়ে ওঠার পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে প্রধান এক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পরও ত্রিপক্ষীয় ফোরামে চীন সক্রিয় থাকছে। এটা নিঃসন্দেহে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রতি তার প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন। ফলে এশিয়াজুড়ে শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি লালনের সহায়ক পরিবেশ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
এফ এম শাকিল: পাকিস্তানি সাংবাদিক; দ্য ক্রেডল থেকে ভাষান্তর সাইফুর রহমান তপন
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক
- এফ এম শাকিল