ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক

গ্লোবাল সাউথ কেন রাশিয়াকে সমর্থন করে

গ্লোবাল সাউথ কেন রাশিয়াকে সমর্থন করে
×

জরগে হেইন

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৩ | ০৫:০০

ইউক্রেন যুদ্ধে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার নেতৃস্থানীয় অনেক দেশ ন্যাটোর পাশে দাঁড়াতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছে। তাদের এই অনিচ্ছাই ‘গ্লোবাল সাউথ’ পরিভাষাটি আবার সামনে নিয়ে এসেছে।  ইউরোপের এক সংবাদমাধ্যমে সম্প্রতি একটা শিরোনাম দেখা গেল–‘গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ কেন রাশিয়াকে সমর্থন করে?’। অন্য আরেকটি শিরোনাম ছিল এমন– “ইউক্রেন  রাশিয়াকে চ্যালেঞ্জ করতে ‘গ্লোবাল সাউথ’কে কাছে পেতে চাইছে”।

প্রথমে বলা দরকার ‘গ্লোবাল সাউথ’ মানে কী। গ্লোবাল সাউথভুক্ত দেশগুলোকে কখনও বলা হয় ডেভেলপিং বা উন্নয়নশীল, কখনও লেস ডেভেলপ্ড বা কম উন্নত কিংবা আন্ডার ডেভেলপ্ড বা অনুন্নত। এসব দেশের অনেকই, যদিও সব নয়; দক্ষিণ গোলার্ধ, মূলত আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকায় অবস্থিত। সাধারণভাবে বলা যায়, যেসব দেশ অপেক্ষাকৃত দরিদ্র, সে দেশগুলোতে বড় আকারে আয় বৈষম্য রয়েছে। একই সঙ্গে সেসব দেশের মানুষের গড় আয়ু কম। ‘গ্লোবাল নর্থ’-এর মানুষের তুলনায় তাদের জীবনযাপন অতটা আরামপ্রদ নয়। ‘গ্লোবাল নর্থ’ হলো ধনী দেশ, যেগুলো প্রধানত উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে অবস্থিত। আর ওশেনিয়া ও অন্যত্র কিছু দেশ রয়েছে।

সমাজতাত্ত্বিক পিটার ওয়ারসলি ১৯৬৪ সালে একটি বই লিখেন– দ্য থার্ড ওয়ার্ল্ড: অ্যা ভাইটাল নিউ ফোর্স ইন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স। এই বইয়ের মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্ব পরিভাষাটি জনপ্রিয় হয়। বইতে সেই ‘তৃতীয় বিশ্বের’ কথা উল্লেখ রয়েছে, যেগুলো ছিল ন্যাম তথা জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন গঠনের মেরুদণ্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধকালীন পুঁজিবাদী দেশগুলোর জোট ন্যাটো এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর জোট ওয়ারশ থেকে নিরপেক্ষ হিসেবে ন্যামের জন্ম হয়।

যদিও ওয়ারসলির এই ‘তৃতীয় বিশ্ব’ ধারণা ছিল ইতিবাচক, পরিভাষাটি এর পর দারিদ্র্য, অস্বস্তিকর এবং অস্থিতিশীলতায় জর্জরিত দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ‘তৃতীয় বিশ্ব’ স্বৈরশাসকদের দ্বারা শাসিত ‘বানানা রিপাবলিক’-এর প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে। বিশেষত তা পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে ব্যঙ্গচিত্র হিসেবে প্রকাশ হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে তথাকথিত দ্বিতীয় বিশ্বের সমাপ্তি ঘটে। এর পর ‘তৃতীয় বিশ্ব’ পরিভাষাও অদৃশ্য হওয়ার পথে এবং নব্বইয়ের দশকে পরিভাষাটির ব্যবহার দ্রুত হ্রাস পায়।

উল্লেখ্য, উন্নত, উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত পরিভাষাগুলোর ইতোমধ্যে সমালোচনা রয়েছে। তাদের পশ্চাৎপদ হিসেবে চিত্রিত করার উপলক্ষ তৈরি হয়েছে। এ কারণে সেই শব্দগুলোর পরিবর্তে একটি নিরপেক্ষ শব্দ ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর সেটিই হচ্ছে ‘গ্লোবাল সাউথ’।

বলার অপেক্ষা রাখে না, গ্লোবাল সাউথ পরিভাষাটি ভৌগোলিক কোনো বিষয় নয়। এমনকি গ্লোবাল সাউথের বড় দুটি দেশ চীন ও ভারত পুরোপুরিভাবে উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত। বরং গ্লোবাল সাউথ-এর জাতিগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক, ভূ-কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক মিশ্রণ রয়েছে।

গ্লোবাল সাউথের দেশ বেশিরভাগই সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ দিকে ছিল। আফ্রিকান দেশগুলো সম্ভবত এর সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ। তাত্ত্বিকরা বিশ্ব রাজনৈতিক অর্থনীতিতে কেন্দ্র এবং পরিধির মধ্যে সম্পর্ক হিসেবে একে বর্ণনা করেছেন। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ‘পশ্চিম এবং বাকিদের’ মধ্যে সম্পর্ক হিসেবে এটি তাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। গ্লোবাল সাউথ এবং গ্লোবাল নর্থের অনেক দেশের মধ্যে অতীতে ভারসাম্যহীন সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে  সাম্রাজ্যবাদ ও শীতল যুদ্ধের সময়ে। ফলে এটি আশ্চর্যের কিছু নয় যে, এখন অনেকেই বড় শক্তির প্রতি সেভাবে ঝুঁকে পড়ছে না।

‘তৃতীয় বিশ্ব’ এবং ‘অনুন্নত’ পরিভাষার মাধ্যমে যেখানে অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্ষমতাহীন হওয়ার দৃশ্য চিত্রায়িত হয়, গ্লোবাল সাউথের ক্ষেত্রে তা খাটে না। একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে– বিশ্বব্যাংক যেমন উল্লেখ করেছে– সম্পদের মালিকানায় পরিবর্তন ঘটছে। অর্থাৎ উত্তর আটলান্টিক থেকে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এখন বিশ্বের সম্পদ দেখা যাচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের চারটির শীর্ষ অর্থনীতির দেশের মধ্যে তিনটিই হবে গ্লোবাল সাউথের। তালিকার ক্রমটি এমন– চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইন্দোনেশিয়া। ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে যে জিডিপি রয়েছে, সেখানে গ্লোবাল সাউথের ব্রিকসের দেশগুলো (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) গ্লোবাল নর্থের জি৭ ক্লাবকে (জাপান, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র) ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির চেয়ে চীনের বেইজিংয়ে বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা বেশি।  

স্পষ্টতই গ্লোবাল সাউথের উত্থান অপ্রতিরোধ্য। বর্ধিত রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে অর্থনৈতিক এই পরিবর্তন হাত ধরাধরি করে এগোচ্ছে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে বৈশ্বিক অবস্থানে নিজেদেরকে প্রকাশ করছে। সেটা যেমন ইরান ও সৌদি আরবের সমঝোতায় চীনের মধ্যস্থতায় প্রকাশ পাচ্ছে, তেমনি ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি শান্তি পরিকল্পনার জন্য ব্রাজিলের প্রচেষ্টাও তার বাইরে নয়।

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের এই পালাবদলের কারণে পরাগ খান্না ও কিশোর মাহবুবানির মতো ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ লিখছেন, আগামী শতাব্দী হবে ‘এশীয় শতাব্দী’। অলিভার স্টুয়েনকেলের মতো অন্য রাজনীতিবিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে ‘পোস্ট-ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড’ পশ্চিমা আধিপত্য-পরবর্তী বিশ্ব সম্পর্কে কথা বলা শুরু করেছেন। 

একটি বিষয় তো নিশ্চিত– গ্লোবাল সাউথ বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিধরদের নমনীয় করতে পারছে, যে শক্তি ‘উন্নয়নশীল দেশ’ এবং ‘তৃতীয় বিশ্বের’ কখনও ছিল না।

জরগে হেইন: বোস্টন ইউনিভার্সিটির ফ্রেডেরিক এস পারদি সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব দ্য লংগার-রেঞ্জ ফিউচারের অন্তর্বর্তীকালীন পরিচালক; দ্য কনভার্সেশন থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×