তৃতীয় মেরু
ঢাকা থেকে দেখা ইম্ফলের ধোঁয়া
শেখ রোকন
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৩ | ০৬:২৬
ঢাকা থেকে ভারতের মণিপুর রাজ্যের রাজধানী ইম্ফলের দূরত্ব খুব বেশি নয়। কিন্তু ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে সেই দূরত্ব সড়কপথে দাঁড়ায় বহু গুণ। তাতে অবশ্য মণিপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নৈকট্য ম্লান হয়ে যায় না। এমনকি রাজ্যটিতে যুযুধান দুই পক্ষের অনেকে ঢাকার অনেকের ব্যক্তিগতভাবেও পরিচিত।
যেমন পরিবেশ আন্দোলন সূত্রেই বন্ধু হয়ে ওঠা মণিপুরের বাসিন্দা দুই তরুণ-তরুণীর সঙ্গে ভারতের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন সভায় দেখা হয়েছে। কর্মসূত্রে দিল্লি প্রবাসী এই দু’জন একসঙ্গে কাজ করেছেন, আড্ডা দিয়েছেন। নর্থ-ইস্টার্ন নাগরিক হিসেবে আঞ্চলিক বৈষম্য ও বঞ্চনা নিয়ে আমাদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। কিন্তু জন্মসূত্রে তারা দুই জনগোষ্ঠীর সন্তান। সংঘাত শুরুর পর তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন দাঁড়িয়েছে, জানি না। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে দেখছি, ‘মণিপুরি’ নয়, তারা কথা বলছেন নিজস্ব নৃগোষ্ঠীগত পরিচয়ে। ঢাকা থেকে আমরা সরাসরি হয়তো আগুন দেখতে পাচ্ছি না; কিন্তু কুণ্ডলী পাকিয়ে ওঠা ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে স্পষ্টতই। অঞ্চলটির অস্থিরতা কিংবা অস্থিতিশীলতা থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখার উপায় নেই। বিশেষত গত কয়েক মাস ধরে মণিপুরে মেইতি ও কুকি-নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সংঘাত চলছে, সেটা ঢাকার জন্য ভূ-রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক দিক থেকেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
দুই. ‘সেভেন সিস্টার্স’ বলে পরিচিত উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যে জাতিগত বিরোধ ও সংঘাত নতুন নয়। কিন্তু মে মাস থেকে রাজ্যটিতে যেভাবে জাতিগত সংঘাত চলছে এবং এখনও নিয়ন্ত্রণে আসার লক্ষণ নেই, তা নজিরবিহীন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, জাতিগত সংঘাত সেখানে রীতিমতো জিঘাংসায় পরিণত হয়েছে। পরস্পরকে পেলে কেবল প্রাণ নিচ্ছে না; যতটা সম্ভব নৃশংস কায়দায় হত্যা করছে। পিটিয়ে মারছে, শিরশ্ছেদ করছে; আহত প্রতিপক্ষকে জীবন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে মারছে। এমনকি স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর মধ্যেও ছড়িয়েছে জাতিগত বিদ্বেষ।
পৌরাণিক নাম, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু রাজ্যটিকে ‘দ্য জুয়েল অব ইন্ডিয়া’ আখ্যা দিয়েছিলেন। চারপাশে ঘন সবুজ পাহাড়ঘেরা প্রকৃতির মধ্যে ডিম্বাকৃতি ইম্ফল উপত্যকা ও বিস্তীর্ণ লোকতাক লেক পাখির চোখে দেখলে মণির মতোই চকচক করে। সেই ‘ভারতীয় মণি’ গত আড়াই মাসে আর্থসামাজিক দিক থেকে বলতে গেলে ভষ্মে পরিণত হয়েছে। সরকারের রক্ষণশীল হিসেবেই এ পর্যন্ত ১৪০ জনের প্রাণহানির কথা স্বীকার করা হয়েছে। পারস্পরিক হামলায় ঘরবাড়ি হারিয়ে সাময়িক উদ্বাস্তু হয়েছে ৫০ সহস্রাধিক মানুষ। মণিপুরের মোট জনসংখ্যা বিবেচনায় প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির এই হার ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদক মণিপুর ঘুরে দেখেছেন, রাজ্যটিতে রীতিমতো ‘বেসামরিক যুদ্ধাবস্থা’ চলছে। বিভিন্ন গ্রাম বা বসতির প্রান্তে সামরিক কায়দায় বাঙ্কার খুঁড়ে, চারপাশে বালুর বস্তার দেয়াল তুলে, শটগানের ট্রিগারে আঙুল দিয়ে সশস্ত্র পাহারা বসিয়েছে নেহাত সাধারণ অধিবাসী। প্রতিপক্ষের গ্রাম হয়তো মাত্র এক কিলোমিটার দূরে। সেখানেও একই পরিস্থিতি; অস্ত্র হাতে পাহারা দিচ্ছে সাধারণ গ্রামবাসী। সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ, ইন্ডিয়ার সিনিয়র ফেলো সুশান্ত সিং বলেছেন, ‘স্বাধীন ভারতে এই প্রথম কোনো রাজ্য গৃহযুদ্ধের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।’ (আলজাজিরা, ১৬ জুলাই ২০২৩)।

তিন. সংঘাতের কারণ, সংখ্যাগুরু ও সমতলবাসী মেইতি জনগোষ্ঠী দাবি করে আসছে– কুকি, নাগাসহ অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মতো তাদেরও ‘স্পেশাল স্ট্যাটাস’ বা বিশেষ মর্যাদা দিতে হবে। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কোটা রয়েছে এবং মেইতিরা চাইলে পাহাড়ে জমি কিনতে পারে না। মেইতিদের বক্তব্য হচ্ছে, সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী হলেও তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল মানুষের সংখ্যা অনেক। তাদের জন্য বিশেষ কোটা দরকার। এ ছাড়া ১৮ শতকের গোড়ার দিকে হিন্দু বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণের আগে তারাও ‘আদিবাসী’ ছিল। কুকি-নাগা জনগোষ্ঠীর বক্তব্য, মেইতি জনগোষ্ঠী সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই ‘রাজকীয়’ সুবিধা ভোগ করে আসছে। কারণ মণিপুরের রাজা ছিলেন মেইতি সম্প্রদায়ের। এ ছাড়া বর্তমান ও অতীতের মুখ্যমন্ত্রীরাও প্রায় সবাই মেইতি সম্প্রদায় থেকে নির্বাচিত। শিক্ষা, চাকরি, বাণিজ্য– সর্বক্ষেত্রে মেইতিরা এগিয়ে। এখন তারা পাহাড়িদের অধিকার ও সম্পদেও হাত দিতে চাচ্ছে।
হিসাবটি জটিল। মণিপুরের মাত্র ১০ শতাংশ এলাকা সমতল উপত্যকা। কিন্তু সেখানেই রাজ্যটির মোট জনসংখ্যার ৬৪ শতাংশের বাস। আবার ৯০ শতাংশ পাহাড়ি এলাকায় থাকে বাকি ৩৬ শতাংশ জনগোষ্ঠী। তার মানে, মাথাপিছু ভূমির হিসাবে পাহাড়িদের থেকে অনেক পিছিয়ে সমতলবাসী। পাহাড়িরা আঙুল তুলছে রাজ্য বিধানসভার দিকেও। সেখানে সমতল থেকে রয়েছে ৪০টি আসন, কিন্তু পাহাড় থেকে ২০টি। ফলে নীতি ও আইনগত দিক থেকে পাহাড়িরা ‘কাঠামোগত বঞ্চনা’র শিকার।
সংঘাতের মাত্রা গুরুতর হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে ধর্মীয় বিভাজনও। মেইতিরা হিন্দু হলেও কুকি-নাগারা খ্রিষ্টান। এত দিন রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় কংগ্রেস ও স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো পাল্টাপাল্টি করলেও ২০১৭ সাল থেকে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসেছে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি। কুকি-নাগাদের অভিযোগ, ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ প্রতিষ্ঠাতেই ‘আদিবাসী’ স্ট্যাটাস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘মিয়ানমার ফ্যাক্টর’। সেখানকার সামরিক জান্তার সঙ্গে গণতন্ত্রকামী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর লড়াই ছড়িয়ে পড়ার পর কুকি, নাগা, চিন জনগোষ্ঠীর একটি অংশ সীমান্ত পেরিয়ে মণিপুরে প্রবেশ করছে। মেইতিরা অভিযোগ করছে, এতে রাজ্যের জনমিতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন হচ্ছে। ভারতের কেউ কেউ মণিপুরে সহিংসতার নেপথ্যে ‘চীন ফ্যাক্টর’ নিয়েও কথা বলছেন।
চার. মণিপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সীমান্ত যদিও নেই; দীর্ঘায়িত এই সংঘাতের কারণ ও ব্যাপ্তি দেখে ঢাকার সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বৈকি। কারণ এ দেশে যেমন মণিপুরি সম্প্রদায় রয়েছে, তেমনই রয়েছে কুকি-নাগা সম্প্রদায়ও। দু’পক্ষের জনগোষ্ঠীর মধ্যেই রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্বিশেষে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট ‘কেএনএফ’ নামে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে ভারত ও মিয়ানমারের সামরিক যোগও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে ঢাকার সতর্ক থাকতে হবে– মণিপুরের সংঘাত যেন চুইয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ না করে। কেএনএফ যদিও শান্তি আলোচনায় আগ্রহী বলে সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে (১৬ জুলাই ২০২৩) জানা যাচ্ছে, সতর্কতার বিকল্প নেই।
এ ছাড়া মণিপুরের বাঙালি ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিষয়টিও ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে ঢাকার বিবেচ্য হওয়া উচিত। বিশেষত মুসলমানরা সেখানে হিন্দু ও খ্রিষ্টানদের পরেই তৃতীয় ধর্মীয় সম্প্রদায়। বর্তমান সংঘাত জটিলতর হয়ে এক পর্যায়ে বাঙালি বা মুসলিম সম্প্রদায় পর্যন্ত গড়ানোর আশঙ্কা খোদ মণিপুরেই রয়েছে। আলজাজিরায় প্রকাশিত এক আলোকচিত্রে দেখলাম, একটি পরিবারে ঘরের দেয়ালে লিখে রাখা হয়েছে ‘বাঙালি হাউস’, যাতে কোনো পক্ষ মেইতি বা কুকি-নাগা ভেবে হামলা না করে বসে। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় বাঙালি মুসলিম সংখ্যাগুরু রাষ্ট্র বাংলাদেশ চোখ বুজে থাকতে পারে?
শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল skrokon@gmail.com
- বিষয় :
- শেখ রোকন
- ইম্ফলের ধোঁয়া