ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমাজ

শান্ত ফরিদপুরে প্রান্তরা খুন হচ্ছে কেন?

শান্ত ফরিদপুরে প্রান্তরা খুন হচ্ছে কেন?
×

শেখ রোকন

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৩ | ০৬:৩৩

প্রান্ত যাচ্ছিল বন্ধুর বোনের জন্য রক্ত দিতে। সেই হাসপাতালে যাওয়ার রাস্তাতেই মিলল তার রক্তাক্ত লাশ। ওরা জানল না, ওরা কাকে হত্যা করল? এমন টগবগে তাজা প্রাণ, এমন পরোপকারী, সজ্জন তরুণকে হত্যা করা মানে একটা সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করা।

ফরিদপুর শহরে যতবার গেছি, সবকিছুর আগে মনোযোগ কেড়েছে এর ছিমছাম, নিরিবিলি পরিবেশ। শহরটিকে মালার মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখা কুমার নদও যেন দেশের আর দশটা নদনদীর চেয়ে শান্ত। সেই নিরিবিলি শহরের শান্ত স্রোতধারীর আলীপুর সেতুতেই কলেজছাত্র প্রান্ত মিত্রের লাশ পড়ে ছিল সোমবার দিবাগত রাত শেষে। সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীর কী ‘অপরাধ’ ছিল? নিছক সামাজিক অবক্ষয়, নাকি রাজনৈতিক বিরোধের বলি হলো এই টগবগে তরুণ?

শিক্ষক বাবা বিকাশ মিত্র ও মায়ের সঙ্গে শহরের ওয়্যারলেসপাড়ায় থাকতেন প্রান্ত। পড়াশোনার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক লীগ বা পূজা উদযাপন পরিষদ এবং নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনেও যুক্ত ছিলেন। জেলা শহরগুলোতে এখনও যেসব রাজনীতি ও সমাজমনস্ক তরুণকে দেখা যায়, যারা আশপাশে কারও বিপদে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেন না; যারা এখনও ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে পছন্দ করেন; প্রান্ত পাল যেন তাদেরই প্রতিনিধি। সোমবার মধ্যরাতেও বন্ধুর হাসপাতালে ভর্তি বোনের জন্য রক্ত দিতেই বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাকেই রক্তাক্ত হতে হলো? বুকের বামপাশে ধারালো অস্ত্রের গভীর ক্ষত নিয়ে প্রাণহীন পড়ে থাকতে হলো আলীপুর সেতুতে! আমাদের সমাজ ও রাজনীতির কী নিষ্ঠুর পরিহাস!

খুনের কারণ সম্পর্কে পুলিশ যদিও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত না হওয়ার কথা বলেছে; প্রান্তের স্বজন ও স্থানীয়রা এই অঘটনের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধের ইঙ্গিত দিয়েছেন সমকালের কাছে। নিহতের মামাতো ভাই ফরিদপুর শহরের ঈশান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাধব চন্দ্র দাস বলেছেন, সোমবার সকালে আলীপুরের রাসেল স্কয়ারে আওয়ামী লীগের কার্যালয় উদ্বোধনের সময় প্রান্তর সঙ্গে প্রতিপক্ষ গ্রুপের কয়েক যুবকের কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। প্রান্তর বন্ধুদের কাছে জেনেছি– হাতাহাতির সময় ওরা প্রান্তকে হুমকি দিয়ে বলেছিল, ‘আলীপুর গোরস্তানের পাশ দিয়ে বাড়ি যাবি না, গেলে লাশ ফেলে দিব।’ (সমকাল অনলাইন, ২৬ জুলাই ২০২৩)।

কেবল সমকাল নয়, অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরেও প্রতিভাত, প্রান্ত খুনের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ থাকতে পারে। ওদিকে যাদের প্রতি অভিযোগের তীর, ঘটনার পর থেকে তারা গা-ঢাকা দিয়েছে। অপরাধ না করলে গা-ঢাকা দেওয়ার প্রয়োজন কী?

প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিরোধ কিংবা একই দলের উপদলীয় কোন্দলও আমাদের দেশে নতুন নয়। তাই বলে কাউকে খুন করা দূরের কথা, শারীরিকভাবে আঘাতও কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে পারে না। এটা সন্দেহাতীতভাবেই ফৌজদারি অপরাধ।

প্রান্তকে যেভাবে খুন করা হয়েছে, সেটা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ এবং ঘাতকদের অপরাধী মনোবৃত্তিরই পরিচায়ক। যদি তারা শনাক্ত ও আটক না হয়, তাহলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড আরও দেখার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সার্বিক আইনশৃঙ্খলার স্বার্থেই প্রান্তের খুনিদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে।

প্রান্ত মিত্র হত্যার সঙ্গে জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের যে দাবি বুধবার সকালে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের মানববন্ধন থেকে উঠেছে, সেটা সংগত। ফরিদপুরের অন্যান্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন থেকেও প্রান্ত হত্যার বিচারের দাবি জোরালোভাবে ওঠা উচিত। আজকে প্রান্তকে খুন করে যদি ঘাতকরা পার পেয়ে যায়, তাহলে আগামীকাল নিছক রাজনৈতিক বিরোধের কারণে আরেকজন প্রান্ত যে প্রাণ হারাবে না– তার নিশ্চয়তা কী?

এটা ঠিক, প্রান্ত খুনের ঘটনায় পুলিশি তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টি প্রধানত বিবেচনায় রাখা উচিত হলেও অন্যান্য কারণও অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না। কিন্তু সে জন্য যা জরুরি, তা হচ্ছে জেলার আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সক্রিয়তা ও আন্তরিকতা। আমাদের দেশে দেখা যায়, খুনের শিকার ব্যক্তি কিংবা তাঁর পরিবার রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী না হলে পুলিশের দিক থেকে স্বাভাবিক সক্রিয়তার দেখা পাওয়া ভার। প্রান্ত খুনের ঘটনায় এর পুনরাবৃত্তি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কেউ দেখতে চাইবে না।

আড়াই শতাব্দীপ্রাচীন শহর ফরিদপুরে অনেকেই চাকরি বা ব্যবসা করতে এসে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছেন। বছরভর তাজা শাকসবজি, তাজা মাছ, বাগাটের দই, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রমত্ত পদ্মার ইলিশ, সর্বোপরি এখানকার শান্তিপ্রিয় মানুষের আকর্ষণে বাঁধা পড়ে গেছেন। এই ফরিদপুরেরই সন্তান কবি জসীম উদ্‌দীন তাঁর ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতায় নিজের জন্মভূমি সম্পর্কে লিখেছিলেন– ‘তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়/ গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;/ মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি/ মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,/ মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভায়ের স্নেহের ছায়,/ তুমি যাবে ভাই– যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়।’

প্রান্ত মিত্রের পিতাও যেন কবি জসীম উদ্‌দীনের সেই আহ্বানে শিক্ষকতা করতে রাজবাড়ী থেকে ফরিদপুরে এসে মায়ায় বাঁধা পড়ে গেছেন। একমাত্র পুত্র হারানো বিকাশ মিত্র বা তাঁর স্ত্রীকে কী জবাব দেবে ফরিদপুর? প্রান্ত হত্যাকারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয় বা রং যা-ই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনতেই হবে। কেবল ফরিদপুরের ঐতিহ্য রক্ষায় নয়; আইনের শাসনের স্বার্থেও। প্রান্ত ও তাঁর পরিবারের ক্ষেত্রে বিচারের বাণী যেন নিভৃতে না কেঁদে ফেরে।

এই দেশ বিভিন্ন সময়ই সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও দাঙ্গায় রক্তাক্ত হয়েছে। কিন্তু ফরিদপুর সেই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ফাঁদে কখনও পা দেয়নি। ১৯৪৬ সালে কলকাতার দাঙ্গার রেশ পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন শহরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু ফরিদপুরে তখন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়ে শান্তি সমাবেশ করেছে। বিভিন্ন সম্প্রদায় এখানে মিলেমিশে পাশাপাশি থেকেছে। সেই ফরিদপুরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক সংঘাত ও খুন-জখম কেন বাড়ছে? দেখা যাচ্ছে, মঙ্গলবার ভোরেই শহরের কমলাপুর তেঁতুলতলা এলাকায় ফরিদপুর জেলা জাকের পার্টির সভাপতি মশিউর রহমান জাদু মিয়াকে কুপিয়ে জখম করেছে দুর্বৃত্তরা। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে নগরকান্দায় হিয়াবলদি-কাজিকান্দা গ্রামে তুচ্ছ ঘটনায় ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন রুবেল শেখ নামে এক তরুণ। এসব খুন-খারাবি সামাজিক, না রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রমাণ? সামাজিক অস্থিরতাও তো আসে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থেকে। শান্ত শহরে প্রান্তরা কেন খুন হচ্ছে– পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বকেও গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।

পুলিশ বলছে, প্রান্ত হত্যার ঘটনাস্থল আলীপুর সেতুতে রক্তের দাগ ছিল না। হতে পারে, বাইরে হত্যা করে এখানে ফেলে রাখা হয়েছিল। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যেন অদৃশ্য রক্তের ছোপ ছোপ দাগ লেগে গেছে ফরিপুর শহর ও এর রাজনৈতিক অঙ্গনে। প্রান্ত হত্যাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সবাই মিলে ধ্বংসাত্মক ও ঘাতক অপরাজনীতি উচ্ছেদের মাধ্যমে সেই দাগ তুলে ফেলতে হবে।

শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল

 skrokon@gmail.com

আরও পড়ুন

×