রাজনীতি
সংকট সমাধানের তৃতীয় পথটাই খুলে দিন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২৩ | ০৬:০২
বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক করার কথা যারা দেশের বাইরে থেকে বলছে, তাদের বাইরে আরও পক্ষ আছে। আরেকটি পক্ষ দুটি কথা বলছে। এক. এটা ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়’। দুই. তারা এমনও বলেছিল, আমরা ‘বর্তমান সরকারের পাশে আছি’। কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে– সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ কিনা? এ প্রশ্নও তোলা যেতে পারে, যেসব দেশ ইস্যুটিকে বাংলাদেশের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে দূরে থাকতে চাইছে, তারা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষেই আছে কিনা? যারা কিছুদিন আগেও বলেছিল, বর্তমান সরকারের পাশে আছি– প্রশ্ন উঠতে পারে, তারা কি এ দেশের জনগণের পাশে ও তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে নেই?
২০১৪ ও ২০১৮ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ছিল না, যদিও এর মাধ্যমে একটি সরকার দুই মেয়াদে দেশ পরিচালনা করে এখন আরেকটি নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতেও এমনি ধারার একটি নির্বাচন অবশ্য আয়োজিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। তার ভিত্তিতে সরকার দেশ পরিচালনার বদলে একটি সাংবিধানিক সংশোধনী এনে তখনকার রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ভূমিকা রেখেছিল। আমরা পেয়েছিলাম একটি সংবিধানসম্মত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার লক্ষ্য হবে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। তার মানে, ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একতরফা বা অগ্রহণযোগ্য হলেও তা জাতির জন্য ইতিবাচক কিছু বয়ে এনেছিল। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক সংকট উল্টো আরও ঘনীভূত হয়। এ প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন দলকেও ওই দুই নির্বাচনের পক্ষে জোরালো সাফাই না গেয়ে বলতে হচ্ছে, আগের দুটি নির্বাচনের মতো হবে না। এভাবেও এখন বলতে হচ্ছে, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। এ অবস্থায় বাইরের কোনো মহল থেকে কি বলার সুযোগ আছে যে, আমরা ‘অমুকের পাশে আছি’?
২০১৪ আর ২০১৮ নির্বাচনে কে কার ‘পাশে’ কীভাবে ছিল, তা জাতি দেখেছে। এতে করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের অবস্থানের যে অবনমন হয়েছে, এর দায় কি তাদেরও নিতে হবে না? অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও যে ধারায় সরকার এগিয়েছে– যার বিষময় ফল আমরা দেখছি বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে, তার পেছনেও কি অবদান রাখেনি ওই দুটি নির্বাচনে বিশেষ দলের প্রতি তাদের সমর্থনমূলক ভূমিকা? অবশ্য আজ যারা ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের’ আওয়াজ তুলছে সুবিধামতো, তাদের কাছে তখনকার ওই ভূমিকাগুলোকে হয়তো মনে হয়েছিল প্রত্যাশিত আর ইতিবাচক!
কোনো দেশের মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার ভোটাধিকার বিনষ্ট হওয়া, সেখানে বিরোধী পক্ষ ও মত কোণঠাসা করে ফেলা আজকের দুনিয়ায় ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বিবেচিত হতে পারে না। আজ যে দল এ নিয়ে তীব্র আপত্তি জানাচ্ছে, তারাও অতীতে এমনকি নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মহলের সহায়তা চেয়েছিল। সে দাবি অবশ্য আদায় হয়েছিল আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে কাবু করেই এবং সেটি কোনোমতেই অহিংস আন্দোলন ছিল না। এখন তাদের তরফ থেকেই বেশ আশ্বস্ত হয়ে বারবার বলা হচ্ছে, ‘পশ্চিমারা কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা বা সরকারের পদত্যাগের কথা তুলছে না।’ তারা নাকি শুধু সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ওপর জোর দিচ্ছে। এখন ক্ষমতাসীনদের কাছে জানতে চাওয়া যেতে পারে– যারা গোপনে এসে দেখা-সাক্ষাৎ করে, সেটা আবার গোপন রাখতে চাইছে, তারা জোর দিচ্ছে কীসের ওপর?
বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ তথা গ্রহণযোগ্য করতেই হবে। এটা হলো বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনের প্রশ্ন, গোটা জাতির প্রত্যাশার বিষয়। এর পক্ষে যারাই অবস্থান নেবে, তারা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পক্ষে থাকবে। বাইরের কোনো মহল যদি বলে, আমরা এর পক্ষে বা ওর বিপক্ষে আছি, তাহলেই বুঝতে হবে, তারা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় না; বরং ২০১৪ বা ২০১৮-এর মতো কিংবা এর গড় করলে যা দাঁড়ায়, তেমন একটা নির্বাচন এখানে চায়। এতে হয়তো নিহিত আছে তাদের স্বার্থ। জনগণের স্বার্থ এখানে নিহিত নেই।
আমরা এতই হতভাগা যে, স্বাধীনতার এত বছর পরও একটা জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তর্ক করতে হচ্ছে। কেননা দলীয় সরকারের অধীনে এ দেশে কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। এমন একটি নির্বাচনেও শাসক পরিবর্তনের সুযোগ পায়নি জনগণ। সে কারণেই বোধ হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যখনই নির্বাচন হয়েছে, তখনই তারা উপযুক্ত বার্তা দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দিয়েছে শাসক দলকে। আবার জনগণের এ মনোভাব বুঝতে পেরেই বোধ হয় প্রতিটি শাসক দল পাল্লা দিয়ে বিদ্যমান নির্বাচন ব্যবস্থাকে শক্তিশালীর বদলে দুর্বল করতে চেয়েছে। নির্বাচনে সুবিধা নিতে তালিকায় এক কোটির মতো ভুয়া ভোটার ঢোকানোর অভিযোগও রয়েছে এদের একটির বিরুদ্ধে; যাদের কৌশলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একেবারে বাইরে রেখে শুকিয়ে মারার চেষ্টা চলছিল।
যা হোক, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে সংকটের সৃষ্টি করেছে ক্ষমতালিপ্সু দুই শাসকগোষ্ঠী, সেখান থেকে আমাদের বেরোতে হবে। আর সেটা আগামী নির্বাচনেই। আগের ধারায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করেই যে এগোতে হবে, তা নয়। তবে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে এর কোনো সমাধান নেই। সমাধান কোথায় রয়েছে, সেটা নিশ্চয়ই আমরা নিজেরা বের করতে পারব। অভিজ্ঞতা আর সৃজনশীলতা নিশ্চয়ই পথ দেখাবে আমাদের। ক্ষমতাসীনদের সদিচ্ছা এ ক্ষেত্রে জরুরি, যদিও তাদের পক্ষে এটা দেখানো সহজ নয়। টানা তিন মেয়াদে যত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই পরিচালিত হোক– মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। তবে তাদের এখন ‘কঠিন’কেই ভালোবাসতে হবে। এর বিকল্প নেই।
নাগরিক সমাজের ভেতর থেকে প্রস্তাব আসুক। দেশের বাইরে যেসব বিশিষ্ট নাগরিক আছেন, তারাও এতে অংশ নিন। দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে অন্ধভাবে জিন্দাবাদ-মুর্দাবাদ দিয়ে চলেছে যারা, তাদের ভেতর থেকে সংকট উত্তরণে অর্থবহ কোনো প্রস্তাব আসার কথা নয়। তাদের আওয়াজ কিংবা ভূমিকা জাতির কাছে কোনো আবেদনও রাখবে না। সম্পূর্ণ নতুন একদল নাগরিককে তাই এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের উদ্যোগে যেসব রাজনৈতিক দল শামিল হবে না, জাতির সংকট মোচনের পথে তারা বাধা বলেই হবে বিবেচিত।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, বিশ্লেষক
- বিষয় :
- রাজনীতি
- হাসান মামুন