আন্তর্জাতিক
পাকিস্তানের আশু চ্যালেঞ্জ ও আগামী নেতৃত্ব
রহিম নেসার
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০
অক্সফোর্ড-শিক্ষিত বিলাওয়াল ভুট্টো পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান। ৩৪ বছর বয়সী এই রাজনীতিক পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর পুত্র এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টোর দৌহিত্র। রাজনৈতিক পরিবারের এই সন্তান সদ্যবিদায়ী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সংক্ষিপ্ত সময়ের দায়িত্ব পালনে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য। জটিল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং এর মাধ্যমে পাকিস্তানের স্বার্থ সুরক্ষায় সক্ষমতাই তাঁকে সামনে নিয়ে এসেছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে গত বছর এপ্রিল থেকে এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে বিলাওয়াল ভুট্টো আঞ্চলিক সহযোগিতায় গুরুত্ব দিয়েছেন। বিলাওয়াল সব সময় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক একীভূতকরণে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, যা পাকিস্তানের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক শক্তি যেমন ভারত, আফগানিস্তান ও ইরানের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রচেষ্টা প্রমাণ করেছে– তিনি সংঘাত নিরসন ও আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ। পাকিস্তান ও প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে অধিক স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া গড়া তাঁর লক্ষ্য।
চীন, সৌদি আরব, আরব আমিরাত এবং অন্যদের সঙ্গে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধিকল্পে বিলাওয়ালের উদ্যোগের ইতিবাচক দিক স্পষ্ট। এর ফলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ যেমন আসছে, তেমনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অর্থনৈতিক কূটনীতিতে তিনি যেদিকে আলোকপাত করছেন তা প্রমাণ করছে, দেশের সার্বিক উন্নয়নে সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক বিষয়টি তিনি ভালোভাবেই অনুধাবন করছেন।
পাকিস্তানে মানবাধিকার সুরক্ষা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পিপিপির রেকর্ড ভালো। মানবাধিকার রক্ষা, বালুচ ও পশতুনদের মতপ্রকাশে সহায়তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিলাওয়াল ভুট্টোর অঙ্গীকার স্পষ্ট। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার। বিশেষ করে কাশ্মীর ও ফিলিস্তিনের ঘটনায় পাকিস্তান দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। ন্যায়বিচার ও সমতা নিশ্চিতে বিলাওয়ালের দৃঢ় প্রচেষ্টায় যেমন আন্তর্জাতিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটছে, তেমনি তা মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখার প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকারও সামনে আনছে। প্রসংগত, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশির সময়ে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সে অর্থে ভালো যায়নি।
এখন পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ হলো, ভারতের সঙ্গে কাশ্মীর বিষয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য কাশ্মীর সমস্যার সমাধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সংকটের প্রভাব পড়ছে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে। আঞ্চলিক কানেকটিভিটি বা সংযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে ভারত ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের মাধ্যমে কাশ্মীর সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান বের করতে হবে।
আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ পাকিস্তানের নিজের নিরাপত্তার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। আফগান তালেবানের পুনরুত্থান জঙ্গিদের, বিশেষ করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে উৎসাহিত করেছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তে তাদের উপস্থিতি শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি। আফগান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং জঙ্গিবাদের হুমকি মোকাবিলা করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার মাধ্যমে আফগানিস্তানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা বড় বাধা হতে পারে।
পরমাণু কর্মসূচির কারণে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকায় পাকিস্তান দেশটির সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক রাখতে পারছে না। ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছাড়া পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা কঠিন হবে। সে জন্য ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতার জন্য এ সম্পর্ক বেশি জরুরি। ইরান তেলসমৃদ্ধ দেশ। ইরানের সস্তা ডিজেল ও পেট্রোল এবং জ্বালানির বাইরে অন্য পণ্য থেকেও পাকিস্তান উপকৃত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ উপেক্ষা করে ইরানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করাও বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
পাকিস্তানের অর্থনীতিতে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা এ মুহূর্তে জরুরি। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করা, বিদেশি বিনিয়োগে আকৃষ্ট করা এবং পাকিস্তানের ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় যথার্থ অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
এটাও মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক দৃশ্যপটের পরিবর্তন হতে পারে এবং নির্বাচনের ফল বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল।
রহিম নেসার: পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; এশিয়া টাইমস থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক
- রহিম নেসার