উচ্চারণের বিপরীতে
আসন্ন সংঘাত ও নির্বাচন: মৌলিক প্রশ্নের সামনে
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০
আগামী নভেম্বর মাসে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান এই তথ্য জানিয়ে বলেছেন, নির্বাচন কমিশন [ইসি] ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভোট গ্রহণের দিন নির্ধারণ হতে পারে। বিএনপি আসবে না ধরেই ইসির ‘সুষ্ঠু’ ভোটের প্রস্তুতির সংবাদ এরই মধ্যে প্রকাশিত। [সমকাল, ২১ সেপ্টেম্বর, ২৩]
নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই মুখোমুখি অবস্থানে পৌঁছে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তপশিল ঘোষণার আগেই বিএনপি চাইছে মূল দাবি আদায় করে নিতে। মূল দাবি অর্থাৎ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করতে গত সোমবার থেকে দেশজুড়ে টানা ১৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে তা পালন করছে বিএনপি। পরদিন বিএনপির কর্মসূচির অনুসরণে আওয়ামী লীগ শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশের নামে পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে হাজির থাকার ঘোষণা দিয়ে তা পালন করতে শুরু করে। দুই দলের পরিষ্কার অবস্থান– বিএনপি যেভাবেই হোক নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করে ছাড়বে, আর সরকারি দল আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করা ছাড়া কোনো কথা শুনতে রাজি নয়।
২.
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এই মুখোমুখি সংঘর্ষমুখর অবস্থানে দেশের সাধারণ মানুষের ভীত হবার কথা, এবং তারা নিশ্চিতভাবেই ভীত। এক বছর ধরেই দুই প্রতিপক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি চলছে এবং কর্মসূচির একমাত্র লক্ষ্য– কী উপায়ে নির্বাচন হবে? দেশে সমস্যার পর সমস্যা– দ্রব্যমূল্যের চাপে মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত, বিনিয়োগ স্থবির, ডেঙ্গুতে দেশে গত ২২ বছরে দেশে যত মানুষ মারা গেছে তার চেয়ে চলতি বছরের আট মাসে বেশি মানুষ মরেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণও সব রেকর্ড ভেঙেছে। না, এসবের কোনোকিছুই দুটি দলকে বিচলিত করেনি। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও রাজনীতিতে এই টানটান উত্তেজনা আমরা দেখেছি– দুই দলের যুদ্ধংদেহী মনোভাব– যেভাবেই হোক, তাদের দাবি অনুযায়ী নির্বাচন হতে হবে! ২০১৪-তে নির্বাচনের আগে আগুন সন্ত্রাসের স্মৃতি মানুষের মনে নিশ্চয়ই এখনও টাটকা; দুই দল একে অপরকে আগুন সন্ত্রাসে দায়ী করে, যদিও আগুনে পুড়ে মরেছে সাধারণ মানুষ, যাদের জীবনমান উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষায় দুটি দলই ক্ষমতায় আসবার জন্য রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে প্রাণপাত করে! বিগত দুটি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় এবারের নির্বাচন নিয়ে উত্তেজনা আরও বেশি। বিএনপি নেতারা এরই মধ্যে প্রকাশ্য সমাবেশে নেতাকর্মীর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করছেন, সরকারকে ফেলে দিতে ভবিষ্যতে হরতাল-অবরোধে তারা কর্মীদের পাশে পাবেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ রাজপথে বিএনপিকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না বলছে। ফলাফল: সেই টানটান উত্তেজনা।
মৌলিক একটি প্রশ্ন আমাদের বারবারই করতে হয়, হবে– এই নির্বাচন কার জন্য? কাদের জন্য? একজন জনপ্রতিনিধি কেন নির্বাচিত হতে আগ্রহী হন? কেন একজন প্রার্থী নির্বাচনে মনোনয়ন চান? এই সরল প্রশ্নগুলোর আনুষ্ঠানিক উত্তর আমরা যেমন জানি, বাস্তবতার সঙ্গে এর দূরত্বও আমাদের অজানা নয়। যে জোরজুলুম আমরা দেখি নির্বাচনের নামে, যে পেশিশক্তি– অস্ত্র আর অর্থের উপস্থিতি নির্বাচনে দেখা যায়– এসবের সঙ্গে জনকল্যাণের আদৌ কোনো সম্পর্ক থাকে? নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীরা স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-পরিবারের অপরাপর সদস্যসহ দলীয় নেতাকর্মীর ক্ষমতা ও অর্থের দাপট/প্রদর্শনীর ইজারা নিয়ে নেন। ক্ষমতাসীন দল রীতিমতো ‘রেজিম’ সৃষ্টি করে বসে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা তাই দেখি। আমরা তাই অবাক হই না, বাংলাদেশের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে যারা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে– তাদের ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেবার সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র যে তালিকা পাঠায়– তাতে সরকার ও বিরোধীদলীয় নেতাদের পাশাপাশি তাদের স্বজন-সন্তানদের নামও তালিকাভুক্ত করে। এ দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে আমাদের রাজনৈতিক দল দুটি এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে– ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বুধবার সরকারকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, নির্বাচন ঘিরে সংঘাত দেখছে তারা, তাই তারা পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। অন্যদিকে আগামী ৭ থেকে ১৩ অক্টোবর বাংলাদেশে আসবে মার্কিন প্রাক-পর্যবেক্ষক দল। তারা বাংলাদেশের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে কিনা, সে ব্যাপারে যাচাই করবে। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫২ বছর সময়কালে
৪০ বছরই ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। সুদীর্ঘকাল দায়িত্বে থেকেও এই দুই দল নির্বাচন বিষয়ে যুক্তিসংগত মতৈক্যে পৌঁছুতে পারেনি। এ কারণেই বারবার সংঘর্ষমুখর পরিস্থিতি, অনিশ্চয়তা, রক্তপাত এবং বিদেশিদের কাছে নিজেদের অপমানিত করবার পথ প্রশস্ত করা।
নির্বাচন নিয়ে এ দেশের সংকট নতুন নয়। একতরফা নির্বাচন না চাইলে সরকারকে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হবে। সংবিধানের বিধিনিষেধের কথা যতই বলা হোক, সেই সংবিধান মানুষের প্রয়োজনেই তৈরি– এটা মনে রেখে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণমূলক যুক্তিসংগত সমাধানের পথ বের করতে পারলে সংঘাত এড়ানো সম্ভব।

৩.
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরামর্শ নেওয়া দূরে থাক, সমস্যাকে সমস্যা বলতেও রাজি থাকেন না সরকারি নীতিনির্ধারকরা। রাজনীতির মতো বর্তমানে দেশের অর্থনীতিও কঠিন সংকটের মুখোমুখি। আশার কথা, সম্প্রতি সরকারি নীতিনির্ধারকরা অন্তত অর্থনৈতিক খাতে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনের পরামর্শ নিতে শুরু করেছেন। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বৈঠকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে পণ্যের দাম বেঁধে দিয়ে বাজারে লাগাম টানার আগে মূল্য প্রত্যাশার লাগাম টানার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, পণ্যের দাম বাড়বে– এমন প্রত্যাশা যখন স্থায়ী হয়, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পণ্যমূল্য বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে পণ্যের দাম বেঁধে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বরং মূল্য প্রত্যাশা কমাতে সমন্বিত ও বিশ্বাসযোগ্য নীতি গ্রহণ এবং তার মাধ্যমে বাজারে সংকেত দিতে হয়। ... এই মূহূর্তে টাকা ছাপিয়ে সরকার ও রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংককে কোনো ধরনের মূলধন জোগান না দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। [প্রথম আলো, ২২ সেপ্টেম্বর, ২৩]
সাম্প্রতিক সংঘাতমুখর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বদের পরামর্শ নেওয়া যায় না?
৪.
এবং বৃষ্টির রাতে নিশ্চিন্তির ঘুম
বৃহস্পতিবার রাতে টানা ৬ ঘণ্টার ১১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার ভয়াবহ রূপ দেখা গেল। জলাবদ্ধতা ও যানজটের সঙ্গে ভোর পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। কোনো কোনো সড়ক ও অলিগলিতে কোমরসমান পানি জমে। খাল খনন ও নর্দমা নির্মাণে দুই সিটি করপোরেশন শত শত কোটি টাকা ব্যয় করেছে। ফল: বৃষ্টিপরবর্তী ১৫ ঘণ্টাতেও পানি সরেনি।
সেই রাতে মিরপুর কমার্স কলেজ-সংলগ্ন ঝিলপাড় বস্তির কাছে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে রাস্তায় পড়ে। রাস্তা দিয়ে রাত সাড়ে ৯টায় দুই সন্তান লিমা [৭], হোসাইন [৭ মাস] ও স্ত্রী মুক্তাকে [২৫] নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন ঝালমুড়ি বিক্রেতা মিজান [৩৫]। হোসাইন ছিল মিজানের কাঁধে। বিদ্যুতায়িত হবার পর মিজান তাঁর ছেলেকে বাঁচাতে দূরে ছুড়ে মারেন। পানিতে ভাসতে থাকেন বাকি তিনজন। পাশের দোকানে থাকা তরুণ অনিক [১৮] শিশু হোসাইনকে বাঁচাতে ছুটে যান। তাকে পানি থেকে তুলে একজনের কাছে রেখে বোন লিমাকে তুলতে যেয়ে অনিকও বিদ্যুতায়িত হয়ে মিজান, লিমা ও মুক্তার পাশাপাশি নিহত হন।
বৃষ্টির পানিতে বিদ্যুতের ছেঁড়া তারে বিদ্যুতায়িত হয়ে এভাবেই মারা যায় চারজন মানুষ! দায়িত্বশীল রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের বৃষ্টির রাতে নিশ্চিন্তির ঘুমে অবশ্য সামান্য সংকটও দেখা যায় না।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল ও সাহিত্যিক
mahbubaziz01@gmail.com
- বিষয় :
- উচ্চারণের বিপরীতে
- মাহবুব আজীজ