ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কক্সবাজারের মহেশখালী

সংরক্ষিত বনে পাকা সড়ক অবৈধ বসতি গড়ার শঙ্কা

সংরক্ষিত বনে পাকা সড়ক অবৈধ বসতি গড়ার শঙ্কা
×

কক্সবাজারের মহেশখালীতে সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ করছে এলজিইডি। বন বিভাগের আশঙ্কা, সড়ক নির্মাণ করতে পাহাড় ও বনভূমি কাটতে হবে। ছবি: সমকাল

নাসির উদ্দিন হায়দার, মহেশখালী থেকে ফিরে

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:২৭

সড়কের দুই পাশে সংরক্ষিত বন। কোথাও পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে বসতি। এতদিন এলাকাটি ছিল দুর্গম। এ কারণে বনের ভেতরের অংশে দখলদারদের প্রবেশ ছিল সীমিত। এবার সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে পাকা সড়ক নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজারের মহেশখালীর ১২ নম্বর পাহাড় মৌজায় ৪ দশমিক ৮৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক নির্মাণে অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, সড়কটি নির্মাণে সংরক্ষিত বনের পাহাড় ও বনভূমি কাটতে হবে। এতে বনের ভেতরের দুর্গম এলাকা উন্মুক্ত হয়ে পড়বে। দুই প্রান্ত থেকে এগিয়ে আসা অবৈধ বসতি আরও ভেতরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। বাড়তে পারে পাহাড় কাটা, বন দখল ও গাছপালা নিধন। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও।

এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, একদিকে বন বিভাগ যেখানে সংরক্ষিত বনের অবৈধ দখল ঠেকাতে মামলা করছে, অন্যদিকে সরকারি আরেক সংস্থা কেন সেই বনের ভেতর স্থায়ী সড়ক নির্মাণ করছে? স্থানীয় সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে এই সড়ক নির্মাণের পক্ষে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

সড়ক নির্মাণ বন্ধ চেয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা) রিট করলে গত ৬ আগস্ট হাইকোর্ট পাহাড় মৌজায় প্রস্তাবিত সড়কের ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দেন। তবে ৯ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট ওই নিষেধাজ্ঞার ওপর স্থগিতাদেশ দেন। একই সঙ্গে সড়কের প্রস্থ ৫ দশমিক ৫ মিটারের বেশি না করার শর্তে নির্মাণকাজ চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়। অবকাশ শেষে দুই সপ্তাহের মধ্যে মূল রিটের শুনানি করতে হাইকোর্টকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ অবস্থায় চূড়ান্ত শুনানির আগেই সড়কের বড় অংশ নির্মিত হয়ে গেলে আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক হলে এর দায় কে নেবে– এমন প্রশ্নও উঠেছে।

এক কিলোমিটার ভেতরে বসতি

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং অবৈধ দখল ঠেকাতে ১৯৫৭ সালে ১২ নম্বর পাহাড় মৌজার ১৮ হাজার ২৮৬ একর জমিকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। ১৭ কিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বনের সর্বোচ্চ প্রস্থ প্রায় ৬ কিলোমিটার। এখানে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালার পাশাপাশি হরিণ, অজগর, হনুমান ও বানরসহ নানা বন্যপ্রাণী রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মহেশখালী ইউনিটের সম্পাদক আবু বক্কর বলেন, সংরক্ষিত বনের দুই প্রান্তে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ ইটের সড়ক রয়েছে। ওই সড়ক যতদূর 
গেছে, ততদূর পর্যন্ত প্রায় এক হাজার অবৈধ বাড়িঘর তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সংরক্ষিত বনের ভেতরে এত দিন পাকা সড়ক না থাকায় অভ্যন্তরীণ অংশ তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল। সড়ক নির্মাণ হলে সেখানেও বসতি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মহেশখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, সড়ক প্রকল্পটি অবৈধ দখলদারদের উৎসাহিত করেছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ বিদ্যমান ট্রেইলের পাশে ঘর নির্মাণ শুরু করেছেন। গত কয়েক 
মাসে অবৈধ দখলের ঘটনায় বন বিভাগ ছয়টি মামলা করেছে।

হুমায়ুন কবির বলেন, সড়ক নির্মাণ শুরুর আগেই যেখানে অবৈধ বসতি বনভূমির দিকে এগোচ্ছে, সেখানে পাকা সড়ক হলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে– সেটা সহজেই অনুমেয়।

সরু পথ হচ্ছে পাকা সড়ক

এলজিইডির দাবি, সড়কটি সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত। জে এম ঘাট থেকে কালারমারছড়াকে যুক্ত করতে দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এটি নির্মাণ করা হচ্ছে। জাইকার অর্থায়নে গত বছরের সেপ্টেম্বরে কাজ শুরু হয়। জে এম ঘাট প্রান্তে, যেখানে জবরদখলকারীদের বসতি রয়েছে, সেখানে কংক্রিটের পেভমেন্টের কাজ শেষ হয়েছে। কয়েকটি কালভার্টের কাজও চলছে।

রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে বলেছে, বনের ভেতর আগে থেকেই একটি সড়ক রয়েছে এবং চলমান প্রকল্পে মূলত সেই পথই পাকা করা হচ্ছে। 

তবে শাপলাপুর বিট কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র সরকার বলেন, বিদ্যমান পথটি গড়ে মাত্র ২ মিটার প্রশস্ত। এটি একটি সরু হাঁটা পথ। দুই প্রান্তের সীমিত অংশে ইটের সলিং রয়েছে। এখন সেটিকে ৫ দশমিক ৫ মিটার বা প্রায় ১৮ ফুট প্রশস্ত করে পাকা সড়কে রূপ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, এ জন্য হাঁটা পথটির দুই পাশে প্রায় ১৪ ফুট করে পাহাড় ও বনভূমি কাটতে হতে পারে।

স্থানীয় পানচাষি সাইফুল ইসলাম বলেন, সড়কের অভাবে এলাকার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জে এম ঘাট থেকে কালারমারছড়া যেতে বনের ভেতরের সরু পথ দিয়ে অন্তত তিন কিলোমিটার হাঁটতে হয়। পাকা সড়ক হলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে।

বন বিভাগের আপত্তি উপেক্ষার অভিযোগ

প্রকল্পের শুরু থেকেই সড়ক নির্মাণে আপত্তি জানিয়ে আসছে বন বিভাগ। গত ৩০ জুলাই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধে উদ্যোগ নিতে বলে।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর সড়ক বা অন্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে বৃক্ষ নিধন, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস এবং প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জনি বলেন, জে এম ঘাট-কালারমারছড়া সড়কটি সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত। সড়কটি নির্মিত হলে পাশের ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে শাপলাপুর ইউনিয়নের ২০ কিলোমিটার দূরত্ব কমে সাড়ে চার কিলোমিটারে নেমে আসবে।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ ফয়সাল বলেন, সড়কটি পাকা হলে বনের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। এতে পাহাড়, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এখন যেখানে হাঁটা পথ ধরে অবৈধ বসতি পৌঁছেছে, সেখানে পাকা সড়ক হলে যাতায়াত, নির্মাণসামগ্রী পরিবহন ও নতুন স্থাপনা নির্মাণ সহজ হবে।

কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ বলেন, শাপলাপুর ও কালারমারছড়ার মাঝখানে প্রায় ৬ কিলোমিটার প্রশস্ত পাহাড় রয়েছে। এই পাহাড় অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় বাধা। জে এম ঘাট থেকে কালারমারছড়া পর্যন্ত সড়কটি হলে এলাকার চেহারা পাল্টে যাবে। এ কারণেই সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×