ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক পা যখন বিদেশে রাখতেই হবে

প্রতিস্বর

এক পা যখন বিদেশে রাখতেই হবে
×

ইকরাম কবীর

ইকরাম কবীর

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৪ | ০০:০৪

দেশকে আমরা কতটা ভালোবাসি, তা নিয়ে ২০ বছর বয়সের এক তরুণের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। তিনি বাংলাদেশকে ভালোবাসেন; কারণ এটা তাঁর জন্মভূমি এবং মা-বাবা এখানেই বসবাস করেন। তবে তিনি এ দেশে ভবিষ্যৎ গড়তে তেমন আগ্রহী নন। কারণ, তাঁর কাছে দেশ একটি ভৌগোলিক সত্তা এবং রাষ্ট্র সেই ভূগোলের ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। অনেক রাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের অনেক বেশি দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দিচ্ছে, এই তরুণ তেমন দেশে তাঁর ঠিকানা করে নিতে চান।

দেশ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা শুনেছি-পড়েছি। তবে এই তরুণের কথা অন্য রকম চিন্তার খোরাক জোগায়। কথাটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। শুনে রাগ করার মতোও নয়। তাই তো! এখানে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের কতটা সেবা দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করছে বা করতে পারছে– সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবলে অনেক কথা বলার আছে, যা রাষ্ট্র পরিচালকরা শুনতে না-ও চাইতে পারেন।

এক সময় আমরা ভাবতাম, ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা ছেলেমেয়েরাই বিদেশে আস্তানা গাড়তে চায়। আমরা কি সঠিক ভাবতাম? এ বিষয়ে কি আমাদের কাছে কোনো সমীক্ষা আছে? আমাদের পরিসংখ্যান ব্যুরো অনেক বিষয়ে সমীক্ষা করে। সেদিন দেখলাম ইংরেজি ভাষা নিয়েও করেছে। কত ভাগ মানুষ বিদেশে চলে যেতে চায়, তা নিয়ে সমীক্ষা চালালে বোধহয় ভিন্ন আত্মজ্ঞান তৈরি হতো। কারণগুলো বুঝতে পারলে রাষ্ট্র পরিচালকরা অন্যভাবে পরিকল্পনা সাজাতে পারতেন।

আসলে ঠিক কতজন মানুষ বিদেশে চলে যেতে চায়? আমার ধারণা, জরিপ চালালে সংখ্যাটি বেশ বড় হবে। দেশের নাগরিক সমাজকে বাদ দিয়ে সাধারণ মানুষদের যদি বলা হয়, ‘আমাদের সঙ্গে অনেক দেশের কূটনৈতিক সমঝোতা হয়ে গেছে এবং ওরা আমাদের দেশের কাজ জানা মানুষদের স্থায়ী অভিবাসন দেবে’– তাহলে কী হবে?

এ কথা জানার পর আমাদের কতজন তরুণ জন্মভূমিতে থাকতে চাইবে? অনেকেই চাইবে না। কারণ আত্মমর্যাদাটুকু সবার কাছে প্রমাণ করতে চাইবে। আমার মতো অনেক বুড়োও চলে যেতে চাইবেন। কোনো দেশ যদি কৃষিকর্মী নিয়োগ দিয়ে তাদের জন্য স্থায়ী কোনো বন্দোবস্ত করে দিতে পারে বা চায়, তাহলে আমাদের দেশ থেকে লাখ লাখ কৃষক বিদেশে চলে যাবে। এমন সুবিধা পেলে আমাদের দেশ থেকে কোটি মানুষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে চলে যেতে চাইবে।

দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার রেওয়াজ এখানে নতুন নয়; শত শত বছর ধরেই চলছে। আমরা নিজের দেশের অভাব-অনটন, ঘুষ-দুর্নীতি, হানাহানি, অন্যায় ছেড়ে অন্য কোথাও শুধু ডাল-ভাত ও শান্তির খোঁজে চলে যেতে চেয়েছি। তবে বর্তমানে শুধু গরিব মানুষ নয়, অতি ধনীরাও দেশের বাইরে একটা পা সব সময় রেখে দিতে চায়। দেশের কামাই-রোজগার দিয়ে যদি বিদেশে জমি-বাড়ি-গাড়ি কিনে ভালো থাকা যায়, তাহলে মন্দ কী? তারা ধনী। নিজের উপার্জনে বিদেশে স্থায়ী বাড়ি কিনেছে। তারা দেশেও থাকে এবং বিদেশেও থাকে। তেমন উপার্জন থাকলে হয়তো আমিও বিদেশে বাড়ি কিনতাম।

এটা যে মন্দ কাজ, তা বলছি না। নিজের রোজগার দিয়ে নিজের মতো থাকব, তাতে কার কী বলার আছে? তা ছাড়া এমন একটি আবর্জনাবহুল, নিয়ম-নীতিবর্জিত, ঠেলাঠেলির ট্রাফিক এবং পথে পথে চাঁদাবাজির দেশে কে থাকতে চায়! যার সুযোগ আছে সে-ই চলে যেতে চাইবে। অনেকে দ্বৈত নাগরিক হয়েও দেশ পরিচালনা করছেন।

আমাদের হাজার হাজার মেধাবী ছেলেমেয়ে এখানে উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিদেশে গিয়ে সেখানকার আর্থসামাজিক খাতে অবদান রাখছেন। আমাদের শত শত মেধাবী সহকর্মী আমেরিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমাচ্ছেন এবং সেখানেই স্থায়ী বাসিন্দা হচ্ছেন। দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান নেই, তা বলছি না। এসব মানুষ দেশে টাকা পাঠিয়ে আমাদের অর্থনীতি সচল রেখেছেন। এর চেয়ে বড় অবদান আর কী হতে পারে?

আমাদের বন্ধুবান্ধব যারা দেশ ছেড়েছে, অনেকেরই দেশের জন্য মন কাঁদে। ওদের বলি– ‘তো, চলে আয় দেশে; আমরা একসঙ্গে গলা ধরাধরি করে থাকি।’ ওরা বলে– ‘না রে, আসব না। কারণ আমি এতদিন যা শিখেছি, তা দেশে প্রয়োগ করার সুযোগ নেই; দেশে কোনো সিস্টেম নেই। আমরা যে সিস্টেমে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তা ছেড়ে এক নিয়মহীন ব্যবস্থায় বাস করা কঠিন হবে।’

অনেকের এক পা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিদেশেই রয়ে যাবে এবং অনেকেরই দাফন হবে বিদেশের মাটিতে।

আমরা যাদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলে আখ্যা দিই, তারা কি দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে কাজ করতে চান? না, তারা তা চান না। দেশে তাদের জন্য কাজ নেই। কাজ থাকলেও সে কাজের মজুরি দিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। রেমিট্যান্স যোদ্ধারা যেসব দেশে কাজ করতে যান, সেখানেও যে অনেক উন্নত জীবন যাপন করেন, তা কিন্তু নয়। তবে যা রোজগার করেন, তা দেশে পাঠিয়ে তাদের পরিবারকে ভালো রাখতে চেষ্টা করেন।

বিদেশে চলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা আকর্ষণকে খাটো করে দেখছি না। বরং দেশের অধিবাসীদের এই অংশকে নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা করা উচিত। প্রত্যেক মানুষকে আরও সুন্দর করে অভিবাসনযোগ্য করে তোলা যায়। এটি নিয়ে পরিকল্পনা করার আহ্বান জানাই। শুনেছিলাম, আমাদের সরকার অভিবাসন কূটনীতি চালু করেছিল। সেটা কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে করা হয়েছে এবং অর্থপূর্ণ, ভেবে দেখার সময় এসেছে।

আমাদের দেশে জনসংখ্যা বেশি এবং আয়তনে ছোট। এই জনসংখ্যাকে ভালো সেবা দিতে যে অর্থের প্রয়োজন, তা আমাদের নেই, তবে উপায় আছে। এখনই আমাদের শিক্ষা কাঠামোয় সঠিক পরিবর্তন এনে আরও এক বা দুই কোটি মানুষকে যদি অভিবাসনের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের উপকার হবে। নতুন অভিবাসী গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অভিবাসীরা উচ্চ আয়ের অভিবাসীদের মতো দেশের টাকা বিদেশে নিয়ে চলে যান না। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অভিবাসীরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

দেশের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা এবং মানচিত্র নিয়ে গবেষণাপ্রসূত পরিকল্পনা জরুরি হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের কিছু অংশ যদি সমুদ্রে তলিয়ে যায়, সেখানকার বাসিন্দাদের আমরা কোথায় স্থান দেব? দেশের ভেতরেই তাদের আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার সামর্থ্য সীমিত। তবে তাদের নতুন পেশায় দীক্ষিত করে অভিবাসী হিসেবে রূপান্তর করাই শ্রেয়।

আমাদের এক পা যে বিদেশে রাখতেই হবে– সেই বাস্তবতা মনে হয় ১০-১৫ বছরের মধ্যে আরও প্রকট হয়ে উঠবে। আসুন, বিষয়টি নিয়ে গুছিয়ে চিন্তা করি।

ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক; যোগাযোগ পেশায় নিয়োজিত
ekabir@gmail.com.

আরও পড়ুন

×