মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালার দায় কে নেবে?

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই ভূঁইয়া কানুকে হেনস্তা করা হয়
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ | ২০:৩৬ | আপডেট: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ | ২৩:০১
গত শনিবার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই কানুর প্রতি যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। উপজেলার কুলিয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এই মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়ার ঘটনার দেড় মিনিটের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বিশ-পঁচিশজন লোক তাঁকে ঘিরে আছেন এবং কয়েকজন লোক তাঁকে পুরো গ্রামবাসীর কাছে মাফ চেয়ে এলাকা ছাড়ার দাবি তোলেন। কয়েকজন তরুণকে ‘এলাকা আউট’ বলে চিৎকার করতেও শোনা যায়। এ সময় কোট পরিহিত এক ব্যক্তি তাঁকে মামলায় তালিকাবদ্ধ করার কথাও বলেন। একাত্তরে যারা জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, স্বাধীন দেশে তাদের এমন অপমান ও নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এর দায় কে নেবে?
প্রশ্নটি কেবল মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বা না নেওয়ারও নয়। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, এমনকি রাষ্ট্রও যে কোনো নাগরিকের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার এখতিয়ার রাখে না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর মধ্যে একটি হলো ব্যক্তির মর্যাদার যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এখন যখন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা এভাবে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত হতে পারেন, তখন সাধারণ নাগরিকের মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত, বলাই বাহুল্য।
অবশ্য আবদুল হাই কানুর রাজনৈতিক পরিচয়ও স্পষ্ট। তিনি উপজেলা কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সদস্য। কিন্তু আওয়ামী লীগের আমলেও তিনি বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে তখন হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ছয়-সাত বছর গ্রামছাড়া ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি গ্রামে ফিরে আসেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে এবং আওয়ামী লীগের পতনের পর– দুই আমলেই তিনি যেভাবে নির্যাতনের শিকার হলেন, সেটা দুর্ভাগ্যজনকই বটে।
পাশাপাশি আবদুল হাই কানুর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আমলে এলাকার অনেকের ওপর নির্যাতন ও জবরদস্তি চালানোর অভিযোগ রয়েছে। লুধিয়ারা, কুলিয়ারা, পাতড্ডা, শনপুর গ্রামের অনেকেই তাঁর দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এগুলো যদি সত্যও হয়, সেজন্য আইন ও আদালত রয়েছে। ভুক্তভোগীরা সেসব নির্যাতন ও জবরদস্তির বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকারের জন্য পুলিশের কাছে বা আদালতে যেতে পারতেন। কিন্তু তার বদলে কেউ অপরাধ করলে তার বিচারের দায়িত্ব কোনো সাধারণ ব্যক্তি বা জনতা নিতে পারে না। রাষ্ট্র এ এখতিয়ার তাদের দেয়নি। একজন নাগরিক যাতে কোনোভাবে অবিচার ও জুলুমের শিকার না হন, সেজন্য রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে।
স্বীকার করতে হবে, আওয়ামী লীগ আমলেও অনেকে, এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদেরও কেউ কেউ বিভিন্ন পর্যায়ে অত্যচার ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা আওয়ামী লীগের পতনের পরও অব্যাহত থাকবে কেন? যে গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম উদ্দেশ্য ইনসাফ কায়েম করা, সেখানে এ ধরনের ঘটনা বেইনসাফের নজির তুলে ধরে। যে কোনো সচেতন নাগরিকের এ ধরনের ঘটনার প্রতিবাদ জানানো উচিত।
সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় জামায়াত সমর্থক আবুল হাসেমের নেতৃত্বে কয়েকজন আবদুল হাই কানুকে ঘিরে রেখে জুতার মালা পরিয়ে দেয়। ঘটনার রাতে চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি এ টি এম আক্তারুজ্জামান ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি অভিযোগ করবেন না বলে জানিয়েছেন। এখানেই কি প্রশাসনের দায় শেষ? সমকাল অনলাইনের খবরে বলা হয়েছে, নির্যাতনকারীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। আমরা দেখতে চাই, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি বিধান করা হয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসন আন্তরিক হলে, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সদিচ্ছা থাকলে অপরাধীদের পালিয়ে বাঁচার সুযোগ নেই।
মনে রাখতে হবে, ভুক্তভোগী যে কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের কারও দ্বারা অপদস্থ হলে তিনি অভিযোগ নাও করতে পারেন। কিন্তু কোনো নাগরিকের এ ধরনের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা ঘটলে এবং তার সাক্ষাৎ প্রমাণ থাকলে রাষ্ট্রের উচিত স্বেচ্ছায় তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। কেননা, আমাদের সমাজে প্রভাবশালীদের তৎপরতায় দুর্বলরা অনেক সময় চুপ থাকতে বাধ্য হন। এ ধরনের পরিস্থিতি নিরসনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনকে আরও বেশি তৎপর হতে হবে।
আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি এমনভাবে গৃহীত হওয়া দরকার, কোনোভাবে যেন নাগরিকের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ঘটনায় জড়িতদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করে বিচার নিশ্চিত করার জন্য দাবি জানাই। যে কোনো নাগরিকের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
Iftekarulbd@gmail.com
- বিষয় :
- বীর মুক্তিযোদ্ধা
- কুমিল্লা
- জুতার মালা